মঙ্গলবার, ২০-আগস্ট ২০১৯, ০১:১২ পূর্বাহ্ন
  • অফিস-আদালত
  • »
  • সাবেক ৩৭০ সেনা, নৌ ও পুলিশে বিরুদ্ধে দুদকের অভিযোগপত্র অনুমোদন
অস্ত্রের ভুয়া লাইসেন্স

সাবেক ৩৭০ সেনা, নৌ ও পুলিশে বিরুদ্ধে দুদকের অভিযোগপত্র অনুমোদন

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৫ মে, ২০১৯ ০৭:৩১ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজ, ঢাকা : রংপুরে জালিয়াতির মাধ্যমে আগ্নেয়াস্ত্রের ভুয়া লাইসেন্স দেওয়া-নেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় ৩৯১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আজ বুধবার কমিশন এ অনুমোদন দেয়।

দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, শিগগিরই বিচারিক আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে।

অভিযোগপত্রে প্রধান আসামি করা হচ্ছে রংপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়ের সাবেক অফিস সহকারী শামসুল ইসলাম ও দালাল আবদুল মজিদকে। এর বাইরে ভুয়া লাইসেন্স গ্রহণকারী ৩৮৯ জনও আসামি হচ্ছেন। জাল লাইসেন্স গ্রহণকারীদের অন্তত ৩৭০ জন সেনা, নৌ, পুলিশ, বিডিআর ও আনসার বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। বাকিরা সাধারণ মানুষ। ওই সব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে শটগান ও একনলা বন্দুক।

দুদক সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ১৮ মে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ওই সময়ের অফিস সহকারী শামসুলকে আসামি করে রংপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন ডিসি অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা অমূল্য চন্দ্র রায়। ডিসির সই জাল করে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। মামলাটি দুদকের তফসিলভুক্ত হওয়ায় এর তদন্তের দায়িত্ব আসে দুদকের ওপর।

দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটির তদন্ত করেন দুদকের রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আতিকুর রহমান। তদন্ত তদারক করেন উপপরিচালক মোজাহার আলী সরদার।

দুদক বলছে, প্রধান আসামি শামসুল ২০১১ সালের ১৭ মে থেকে ২০১৭ সালের ১৬ মে পর্যন্ত ডিসির কার্যালয়ের কার্যালয়ের জুডিশিয়াল মুনশিখানা (জেএম) শাখায় অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে কর্মরত ছিলেন। এ সময় তাঁর দায়িত্ব ছিল লাইসেন্স শাখায়। তিনি আগ্নেয়াস্ত্রের ভলিউম নিজ হেফাজতে সংরক্ষণ করতেন। 

জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর লাইসেন্স প্রত্যাশীদের করা আবেদন গ্রহণ করে নোটশিটের মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনারের কাছে উপস্থাপন, পুলিশ প্রতিবেদন গ্রহণ, প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার অনুমোদিত হলে ফরমে এবং ভলিউমের পাতায় প্রয়োজনীয় তথ্যসহ প্রস্তুত করে জেএম শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষর করে ভলিউমের পাতায় প্রাপ্তি স্বীকার করে লাইসেন্স প্রদান এবং নবায়ন করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন তিনি।

ওই দায়িত্ব পালনকালে শামসুল অবৈধভাবে আর্থিক লাভবান হয়ে আগ্নেয়াস্ত্রের ২১ টি ভলিউমের ৩৯০ টি লাইসেন্সের পুরোনো পাতা ছিঁড়ে নতুন পাতা সংযোজন করেন। জালিয়াতি করে তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আরেক অফিস সহকারী অনুকূল চন্দ্রের স্বাক্ষর জাল করে ৩৯০ জন ব্যক্তির নামে ভুয়া বা জাল লাইসেন্স ইস্যু করেন তিনি।

ঘটনাটি ফাঁস হওয়ার পর শামসুল ইসলাম ২০১৭ সালের ১৬ মে থেকে অফিসে যাওয়া বন্ধ করে গা ঢাকা দেন। ২০১৭ সালের ১৭ মে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতিতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান অভিযুক্ত ওই কর্মচারীর কক্ষের আলমারির তালা ভাঙেন। এতে ওই আলমারিতে নগদ ৭ লাখ ১০০ টাকা, শামসুলের নিজের নামে ১১ লাখ (একটি পাঁচ লাখ ও অপরটি ছয় লাখ) টাকার দুটি এফডিআর এবং দুই লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ইস্যুকৃত অবৈধ লাইসেন্স জব্দ করা হয়। ওই দিনই মামলা করে জেলা প্রশাসন।

তদন্তকালে দুদকের কর্মকর্তা ৩৫৭টি লাইসেন্স, ৩৫৪টি অস্ত্র এবং ৪ হাজার ৩৮টি কার্তুজ জব্দ করেন। শামসুল ইসলাম অপরাধ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন।
দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, জেলা প্রশাসকের চোখ ফাঁকি দিয়ে তাঁর সই জাল করেছে ওই প্রতারক চক্র। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে চক্রটি গোপনে দেশের বিভিন্ন স্থানের ৩৮৯ জনকে আগ্নেয়াস্ত্রের জাল লাইসেন্স দিয়েছে। বেআইনিভাবে দেওয়া এসব ভুয়া লাইসেন্সের আবেদনপত্রে সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, আয়কর সনদ, পুলিশ ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। একেকটি লাইসেন্স দিতে চক্রটি নিয়েছে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা।

সূত্র জানায়, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক, সার্জেন্ট, করপোরালসহ অন্যান্য পদের ব্যক্তিদের জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া ২০১২ সাল থেকে বন্ধ আছে। তাই কৌশলে ১৯৮৬ থেকে ২০০৯ সাল উল্লেখ করে লাইসেন্সগুলো দেওয়া হয়েছে মূলত ২০১৪ সাল ও ২০১৭ সময়কালে। চাকরি করার সময় সেনা, পুলিশসহ সব বাহিনীর প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স গ্রহণ করতে পারেন। ওই সময় তাদের অধস্তনদের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে। এ কারণে অবসরে যাওয়ার পর অবৈধভাবে অস্ত্রের লাইসেন্স নেওয়ার ওই পথ বেছে নিয়েছিলেন তাঁরা।

এই ঘটনায় ২০১৭ সালের মে মাসে কোতোয়ালি থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক মামুনুর রশীদ বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা করেন। মামলার পর র্যাব-১৩-এর সদস্যরা ২০১৭ সালের জুলাই মাসে শামসুলকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করেন। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন শামসুল। ২৮১ জনকে আসামি করে ২০১৮ সালে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন কোতোয়ালি থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) মোখতারুল আলম।
শীর্ষকাগজ/এসএসআই