শুক্রবার, ২৬-ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৮:০৭ পূর্বাহ্ন

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এক অমর কিংবদন্তি শিল্পী

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর, ২০২০ ০৯:০৮ অপরাহ্ন

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বাংলার এক কিংবদন্তি ও কীর্তিমান পুরুষ। ১৯৩৫ সালের ১৯ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় সৌমিত্রর জন্ম। তবে পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার গড়াইতীরের কয়া গ্রামে। বাবা নাটকের দলে অভিনয় করতেন, পারিবারিক সূত্রে ছেলেবেলাতেই নাটকে সৌমিত্রর অভিনয়ে অভিষেক। কলকাতা সিটি কলেজে বাংলা সাহিত্যে পড়াশোনা শেষে সৌমিত্র ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেই স্নাতকোত্তর। কলেজের শেষ বর্ষে মঞ্চে শিশির ভাদুড়ীর নাটক দেখার অভিজ্ঞতা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় তাঁর। শিশির ভাদুড়ীকেই গুরু মানতেন সৌমিত্র। একসময় পরিচয় হয় সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে। বাংলা চলচ্চিত্রে সেই এক কিংবদন্তির জন্মলগ্ন। সত্যজিতের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের হাতেখড়ি হয় সৌমিত্রর। ‘অপুর সংসার’ ছবিতে অপু হন তিনি। ৬ ফুট লম্বা, ছিপছিপে চেহারার নাটকপাগল তরুণকে নিজের অপু হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সত্যজিৎ। ১৯৫৯ সালে মুক্তি পায় ‘অপুর সংসার’। প্রথম ছবিতেই সহজ অভিনয়ের সৌন্দর্যে উঠে আসেন আলোচনায়। সত্যজিতের হাত ধরে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে চলচ্চিত্র বৈচিএ্য লাভ করে এবং এক নতুন মাত্রা লাভ করে।
সৌমিত্রের মাতা আশালতা চট্টোপাধ্যায় ছিলেন গৃহিণী। পিতা মোহিতকুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী। সৌমিত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন কৃষ্ণনগরের সেন্ট জনস বিদ্যালয়ে। তারপর পিতার চাকরি বদলের কারণে তাঁর বিদ্যালয়ও বদল হতে থাকে এবং তিনি বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেন হাওড়া জেলা স্কুল থেকে। কলকাতার সিটি কলেজ থেকে প্রথমে আইএসসি ও পরে বিএ অনার্স (বাংলা) পাসের পর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ অব আর্টসে পড়াশোনা করেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী দীপা চট্টোপাধ্যায়। পুত্র সৌগত চট্টোপাধ্যায় ও কন্যা পৌলমী বসু। ‘পারিবারিক স্মৃতি’ নামের একটি গ্রন্থ থেকে জানা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সৌমিত্র পরিবারের গভীরতম সম্পর্কের কথা। সৌমিত্রের পিতামহ মধুসূদন ভালো অভিনয় জানতেন। বাবার কাছ থেকে এটা পেয়েছিলেন পুত্র মোহিতকুমার চ্যাটার্জি। তিনিও বাবার মতো অভিনয় করতে ভালোবাসতেন এবং অসাধারণ কবিতা আবৃত্তি করতেন। পুত্র সৌমিত্র পিতার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন এসবের হাতেখড়ি। ভারতবর্ষের এক অসাধারণ মাপের অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন তার অভিনয়শৈলী দিয়ে।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সর্বপ্রথম কাজ ১৯৫৯ সালে সত্যজিৎ’র অপুর সংসার। পরবর্তীকালে তিনি মৃণাল সেন, তপন সিংহ, অজয় করের মতো বিখ্যাত পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। তিনি এর আগে রেডিওর ঘোষক ছিলেন। তার অভিনীত চরিত্রগুলোর ভিতরে সব থেকে জনপ্রিয় ফেলুদা। তার বিপরীতে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সুচিত্রা সেন, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মাধবী চক্রবর্তী, শর্মিলা ঠাকুর, অপর্ণা সেন, সুমিত্রা মুখার্জি, ওয়াহিদা রহমান তনুজাসহ বিশিষ্ট অভিনেত্রীরা। বেশ কয়েকটি ছবিতে তিনি উত্তম কুমারের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। সিনেমা ছাড়াও তিনি বহু নাটক, যাত্রা এবং টিভি ধারাবাহিক অভিনয় করেছেন। অভিনয় ছাড়া তিনি নাটক ও কবিতা লিখেছেন। নাটক পরিচালনা করেছেন। তার মঞ্চনাটক দলের নাম ‘সংস্তব’। তিনি ‘এক্ষণ’ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন। ২০১৫ সালে তিনি তার দলের হয়ে বাংলাদেশে গঙ্গা যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিবেশন করেন ‘গঙ্গাছড়ি’। তাঁর বিশ্বাস ছিল ক্রিয়েটিভ জীবনই হচ্ছে জীবন। থেমে যাওয়াকে তিনি মনে করতেন শারীরিকভাবে বেঁচে থাকা কোন বাঁচা নয়। বাঁচতে হলে মানুষকে তাঁর নিজের জায়গায় সচল থাকতে হয় আজীবন। আজ আমরা যদি কিং লিয়রের সৌমিত্রকে দেখি মনে করব মঞ্চনাটকের উৎকর্ষ কোথায় পৌঁছে গিয়েছিল সে সময়। সত্যজিতের অপু, হীরকরাজার সেই মাস্টার মশাই, জনারণ্যের পাগল ভাইটিকে আমরা আর কোথাও পাব না। বসু পরিবার মনে গেঁথে থাকবে আমাদের। শেষবেলায় ময়ূরাক্ষীতে আলঝাইমার রোগী পিতাকে বাঙালী কোনদিন ভুলতে পারবে না। কি অসাধারণ মনোবল আর সাবলীল অভিনয় তাঁর। তিনি ২০০৪ সালে পদ্মভূষণ, ২০১২ সালে দাদাসাহেব ফালকে পান। ২০১৭ সালে তাকে ফ্রান্স সরকার লিজিয়ন অব অনার দিয়েছেন। বলা যেতে পারে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি অভিনয়ের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।
শেকড়ের টানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বেশ কয়েক বছর আগে ঢাকায় এসেছিলেন। একটা নামি দৈনিকে তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছিল। সেখানে একটা প্রশ্ন ছিল এরকম- আপনাকে যদি লালন সাঁই চরিত্রে অভিনয় করার প্রস্তাব দেওয়া হয়, আপনি কি তা গ্রহণ করবেন? উত্তরে তিনি কয়া গ্রামকে নিজের গ্রাম উল্লেখ করে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। উত্তরটা এরকম ছিল ‘প্রস্তাব পেলে সেটা তো আমার জন্য সম্মানের। আমার শরীরে তো কয়া গ্রামের মাটি। আমার পূর্বপুরুষরা কয়া গ্রামের মানুষ। কয়া আর ছেঁউড়িয়া তো পাশাপাশিই। তাই আমাকে বাংলাদেশের মানুষ ভাবতে ভালোবাসি। আমি তো লালন চরিত্র সবচেয়ে ভালো আত্মস্থ করতে পারব। কিন্তু আমার যে বয়স, সেটাও তো ভাবতে হবে আমাকে।’ এতেই অনুভূত হয় কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চেতনে মননে কয়া গ্রামের সন্তান, তাঁর শেকড় তো গ্রোথিত কয়ার মাটিতেই। কারণ মাটির টান যে বড় টান।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ৩৪টি সিনেমার মধ্যে ১৪টিতে অভিনয় করেন। ১৯৫৯ সালে তিনি প্রথম সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘অপুর সংসার’ ছবিতে অভিনয় করেন। সত্যজিৎ রায় যেমন সৌমিত্রকে গড়ে তুলেছেন, তেমনি সৌমিত্রও সত্যজিৎকে প্রকাশিত হতে সাহায্য করেছেন। তিনি সত্যজিৎ রায় নির্মিত বিভিন্ন ছবিতে বিভিন্ন চরিত্রে আবির্ভূত হন। তার অভিনীত কিছু কিছু চরিত্র দেখে ধারণা করা হয় তাঁকে মাথায় রেখেই গল্প বা চিত্রনাট্যগুলো লেখা হয়। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোর ভিতরে সব থেকে জনপ্রিয় হলো ফেলুদা। তিনি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় সোনার কেল্লা এবং জয় বাবা ফেলুনাথ ছবিতে ফেলুদার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। প্রথমে ফেলুদা চরিত্রে তার চেয়েও ভালো কাউকে নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও তাঁর অভিনীত ফেলুদার প্রথম ছবি ‘সোনার কেল্লা’ মুক্তি পাওয়ার পর সত্যজিৎ রায় স্বীকার করেন যে তাঁর চেয়ে ভালো আর কেউ ছবিটি করতে পারত না। তিনি সত্যজিৎ রায় ছাড়াও বাংলা ছবির প্রায় সব মননশীল পরিচালক- সেই সময় থেকে এই সময়ের, সবার ছবিতেই অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্র ছাড়াও তিনি নাটক, যাত্রা এবং টিভি ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন। অভিনয় ছাড়া তিনি নাটক ও কবিতা লিখেছেন, পরিচালনা করেছেন। একজন খুব উঁচুদরের আবৃত্তিকারও ছিলেন। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবি জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলা কবিতাটি আবৃত্তি করতেন।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় রাজনীতি সচেতন ছিলেন। বাম রাজনীতির প্রতি তার অনুরাগ ও আগ্রহ ছিল প্রবল। ধর্মের নামে গোঁড়ামি ও বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ভারতের প্রাচীন রাজনৈতিক দল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (মার্কসবাদী) সমর্থক ছিলেন। তিনি ছিলেন বিজেপি সরকারের কড়া সমালোচকদের একজন। দুর্গা পূজার সময় তিনি হাসপাতালে থাকা অবস্থায় সিপিএম-এর মুখপত্রের শারদ সংখ্যায় তাঁর শেষ লেখাটি প্রকাশিত হয়। সেখানে সৌমিত্র লেখেন, বামপন্থীদের নিয়ে সংশয় থাকলেও এখনও বামপন্থাকেই বিকল্প হিসেবে দেখেন তিনি। সিপিআইএম-এর নেতা, ভারতের ইতিহাসের দীর্ঘমেয়াদে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলানো জ্যোতি বসুর সঙ্গেও সখ্য ছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। ছেলেবেলায় কাকার হাত ধরে জ্যোতি বসুর বিভিন্ন সভায় হাজির হওয়ার স্মৃতি তুলে ধরেছেন বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে।
সৌমিত্র শুধু চলচ্চিত্রাভিনেতা নন, তিনি বাংলার সংস্কৃতির সব ক্ষেত্রে নিজের অবদানের ছাপ রেখে গিয়েছিলেন। নাট্যশিল্পী হিসেবে দেশজোড়া কদর। তিনি শুধু নাটকে অভিনয় করেননি, নাটক লিখেছেন, পরিচালনা করেছেন। অভিনেতার কর্মজীবন শুরু আকাশবাণীর ঘোষক হিসেবে। তার আবৃত্তি দশকের পর দশক ধরে মন ভরিয়েছে আপামর বাঙালির। তিনি রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সুনীল, শক্তি এদের পাশাপাশি নবীনদের কবিতাও মঞ্চে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করেছেন, এমন দৃষ্টান্ত আছে। কবিতা লেখার কাজ, পত্রিকা সম্পাদনার কাজ করেছেন। অবসর সময়ে ছবি আঁকতেও ভালোবাসতেন। এক অন্তরঙ্গ মুহূর্তে নিজেই বলেছেন, তিনি ‘কবিতা দিয়ে ভিজিয়ে দিতে চেয়েছেন’ তার অভিনয়। কবিতার বই লিখেছেন ১৪টি। একজন অভিনেতার কী অপরূপ বহুমাত্রিক তুলনাহীন পদচারণ সর্বক্ষেত্রে! বাংলার চলচ্চিত্র অভিনেতাদের মধ্যে এমন কোনো শিল্পী নেই, যার একই সঙ্গে কবিতাসমগ্র, গদ্যসমগ্র এবং নাটকসমগ্র প্রকাশিত হয়েছে। শিল্পক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ফ্রান্স সরকার তাকে দিয়েছে সে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার। ভারতে তিনি সম্মানিত হয়েছেন পদ্মভূষণ, দাদাসাহেব ফালকেসহ বহু পুরস্কারে। এই গুণী মানুষ তার সৃষ্টিশীল কর্মের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই গুণী মানুষ যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন এবং সমৃদ্ধ করবেন সমাজ ও সভ্যতাকে।
তাই তো বাঙালি সৌমিত্র ছাড়া ফেলুদা হিসেবে কাউকেই মানিয়ে নিতে পারে না। সিনেমাটা বড্ড ভালোবাসতেন তিনি। তাই হয়তো করোনাকালেও শুটিং ফ্লোরে যাওয়ার জন্য ছটফট করতেন। এই বয়সেও ভালো ছবিতে অভিনয় করার জন্য খিদে ছিল ষোলোয়ানা। তাই তো এই বয়সেও একের পর এক বক্স অফিসে সুপারহিট সব ছবি। ‘বেলাশেষে’, ‘ময়ূরাক্ষী’, ‘বসু পরিবার’, ‘সাঁঝবাতি’, তার প্রমাণ। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় সিনেমার এই অধ্যায়ের শেষ। বাংলা সিনেমার অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। ৪০ দিনের লড়াই শেষে ৮৬ বছরে শেষ হলো সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কর্মময় পথচলা। মৃত্যুর কাছে পরাজিত হলেন এই ডাকসাইটের অভিনেতা। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্রের একটা যুগ শেষ হয়ে গেল। করোনাই যেন অনুঘটকের মতো সৌমিত্রকে এগিয়ে নিয়ে গেল না ফেরার দেশে। গত ১৫ নভেম্বর, ২০২০ তারিখে দক্ষিণ কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা সিনেমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই অভিনেতা।
“হে ঐশ্বর্যবান,
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান;
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।”
পরিশেষে রবি ঠাকুরের এই উক্তির মাধ্যমে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
(সাবেক উপ-মহাপরিচালক
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী
লেখক, কলামিস্ট ও গবেষক)