শনিবার, ২৭-ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন

করোনা ভ্যাকসিন যুগে পৃথিবী!

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৯:০৫ অপরাহ্ন

সৈয়দ আবদাল আহমদ: মহামারী অতিমারী আক্রান্ত পৃথিবী করোনার ভ্যাকসিন যুগে প্রবেশ করেছে। বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টার মাত্র ১০ মাসের মধ্যে দৃশ্যত পৃথিবী পেয়েছে করোনার ভ্যাকসিন বা টিকা। রাশিয়া শনিবার রাজধানী মস্কোতে মানবদেহে প্রথম স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যে মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে মানবদেহে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করার কথা। এরই মধ্যে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্য, পরে বাহরাইন ফাইজার ও বায়োএনটেকের তৈরি করা ভ্যাকসিনের অনুমোদন দিয়েছে।

করোনার টিকা নিয়েই এখন দুনিয়াব্যাপী আলোড়ন। প্রাণঘাতী অদৃশ্য করোনাভাইরাস এবার কাবু হবে, পৃথিবী স্বাভাবিক হবে, মানুষ আবার নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারবে- নতুন করে এই আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য, করোনা মহামারীতে এরই মধ্যে বিশ্বে ১৫ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি ৯ সেকেন্ডে একজন করে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। এই ক্ষুদ্র ভাইরাস এরই মধ্যে পৌনে সাত কোটি মানুষের দেহে সংক্রমণ ঘটিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক তিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ (জুনিয়র) ও বারাক ওবামা ঘোষণা করেছেন তারা প্রকাশ্যে ক্যামেরার সামনে করোনা টিকা নেবেন। ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথও প্রকাশ্যে ফাইজারের টিকা নেবেন। যুক্তরাষ্ট্রে করোনার টিকার অনুমোদন দেয়ামাত্রই সচেতনতা কর্মসূচি শুরু করবেন সাবেক এই তিন প্রেসিডেন্ট। সরকার যে টিকার অনুমোদন দেবে, সে টিকাটি যে নিরাপদ ও কার্যকর তা প্রমাণেই তারা ক্যামেরার সামনে টিকা নেবেন। নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও প্রকাশ্যে টিকা নেবেন। এর ফলে জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে এবং টিকা নেয়ার ভয় অনেকটা কাটবে।

যুক্তরাষ্ট্রে ১০ ডিসেম্বর ফাইজার বায়োএনটেক এবং মডার্নার টিকার অনুমোদনের জন্য বিশেষজ্ঞরা এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করবেন। করোনা মহামারী যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মহাবিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। দেশটির প্রায় তিন লাখ মানুষ করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন। ফেব্রুয়ারি নাগাদ মৃত্যুর এই মিছিল সাড়ে চার লাখ হতে পারে বলে সে দেশের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সিডিসির পরিচালক আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে প্রায় দেড় কোটি মানুষ।

করোনাভাইরাস আক্রমণের এই কঠিন সময়ে পৃথিবীকে আশার আলো দেখিয়ে সর্বপ্রথম এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ কোম্পানি ফাইজার ও জার্মান কোম্পানি বায়োএনটেকের করোনা ভ্যাকসিন। তুর্কি বংশোদ্ভূত জার্মান দম্পতি অধ্যাপক উগর শাহিন ও ডা: ওজলেম তুরেসি এই টিকা বা ভ্যাকসিনের আবিষ্কারক। দু’জনই তুরস্কের দুই অভিবাসী পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন। তাদের আবিষ্কৃত এই টিকা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ৯৫ শতাংশ সুরক্ষা দিতে সক্ষম বলে ট্রায়ালে প্রমাণিত হয়েছে। টিকা আবিষ্কারক অধ্যাপক উগর শাহিন বলেছেন, এই শীতেই আশা করি পৃথিবী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

করোনা ভ্যাকসিন এসে যাওয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস গেব্রেয়েসাসও শুক্রবার জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের এক সভায় বিশ্ববাসীকে আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, ভ্যাকসিনের ফলাফল ইতিবাচক হওয়া পৃথিবীর মানুষের জন্য একটি দারুণ সুখবর। বিশ্ববাসী এখন মহামারী সমাপ্তির স্বপ্ন দেখতে পারে। তবে টিকা এলেই করোনা শেষ নয়। তিনি ভ্যাকসিন পাওয়ার ক্ষেত্রে ধনী ও শক্তিধর দেশগুলো যাতে দরিদ্র দেশগুলোকে অগ্রাহ্য না করে সে দিকে খেয়াল রাখার অনুরোধ করেন।

যুক্তরাজ্য গত ২ ডিসেম্বর ফাইজার-বায়োএনটেকের কোভিড-১৯ টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। যুক্তরাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এমএইচআরএ টিকাটি ‘মানবদেহের জন্য নিরাপদ’ বলে ঘোষণা করার পরপরই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সংবাদ ব্রিফিংয়ে জনগণকে এ খুশির খবরটি জানিয়ে প্রত্যেক নাগরিককে টিকা নেয়ার প্রস্তুতির আহ্বান জানান। এর মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্য করোনা টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দিলো।

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যান্থনি ফাউসি অতি দ্রুততার সাথে করোনার টিকা অনুমোদন দেয়ায় যুক্তরাজ্যের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ভ্যাকসিনটিকে ‘সাবধানতার সাথে পর্যালোচনা’ করেনি, যেমনটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা করছে। এ ক্ষেত্রে ‘তাড়াহুড়া’ করা হয়েছে। তবে যুক্তরাজ্য এমএইচআরের প্রধান চিকিৎসক জুন রেইন ব্রিফিংয়ে বলেন, দ্রুততার সাথে টিকার অনুমোদন দেয়া হলেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়া হয়নি।
ফাইজার-বায়োএনটেকের করোনা ভ্যাকসিনের প্রথম চালান ৩ ডিসেম্বর বেলজিয়াম থেকে লন্ডনে পৌঁছেছে। ভ্যাকসিন ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত একটি অজ্ঞাত স্থানে তা রাখা হয়েছে বলে বিবিসির খবরে জানানো হয়।

ফাইজার-বায়োএনটেকের এই টিকা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। যুক্তরাজ্য এরই মধ্যে ৫০টি হাসপাতালকে এ টিকার সংরক্ষণ ও প্রয়োগের জন্য প্রস্তুত করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কনফারেন্স সেন্টার এবং স্টেডিয়ামকেও টিকাদান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। টিকাদান কর্মসূচি নির্বিঘ্ন করার জন্য যুক্তরাজ্যে নাদিম জাহাবিকে কোভিড-১৯ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই ৮০ লাখ ডোজ টিকা দেশটিতে এসে পৌঁছাবে। এতে ৪০ লাখ নাগরিকের টিকা দেয়া সম্ভব হবে। যুক্তরাজ্য ফাইজার-বায়োএনটেকের চার কোটি ডোজ টিকার ক্রয়াদেশ আগেই দিয়ে রেখেছে। বেলজিয়ামে অবস্থিত ফাইজারের কারখানায় টিকা উৎপাদিত হচ্ছে। চলতি ডিসেম্বরের মধ্যে ফাইজার পাঁচ কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন করবে। এর অর্ধেক যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ব্যবহৃত হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে, ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) ১০ ডিসেম্বর ফাইজার-বায়োএনটেক এবং মডার্নার টিকার অনুমোদনের জন্য ডাটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। টিকা অনুমোদনের পরপরই চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হবে। আগামী মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তার ১০ কোটি নাগরিককে টিকাদান সম্পন্ন করবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ঘোষণা করেছে, করোনা টিকার বিষয়ে ফাইজার ও বায়োএনটেকের কাছ থেকে তারা তথ্য পেয়েছেন। এ টিকা জরুরি ব্যবহারে সম্ভাব্য তালিকাভুক্তির জন্য তারা প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করছেন। মডার্না জানিয়েছে, ডিসেম্বরের মধ্যেই তারা দুই কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন করবেন। তাদের টিকা ৯৪ শতাংশ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। ২০২১ সাল নাগাদ মডার্না ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন করবে।

এ দু’টি টিকার পরপরই আসছে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা, চীনের করোনা টিকা সিনোভ্যাক এবং রাশিয়ার করোনা টিকা স্পুটনিক-৫ ও আরো একটি টিকা। চীনের পাঁচটি করোনা টিকার তৃতীয় ট্রায়াল সম্পন্ন হওয়ার পথে। জানুয়ারি মাসে এসব টিকার উৎপাদন শুরু হবে। রাশিয়ার স্পুটনিক-৫ করোনা টিকার তৃতীয় ট্রায়াল হওয়ার পর দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন টিকাদান কর্মসূচি ব্যাপকভাবে শুরু করার নির্দেশ দেয়ার পর মস্কোতে শনিবার অধিক ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের মধ্যে টিকা দেয়া শুরু হয়। সর্বপ্রথম এই টিকা রাশিয়ার করোনা চিকিৎসায় জড়িত স্বাস্থ্যকর্মী ও শিক্ষকদের দেয়া হবে। রুশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের স্পুটনিক-৫ বা স্পুটনিক-ভি টিকার ৯২ শতাংশ কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে গ্যামেলিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি এ মাইক্রোবায়োলজি টিকাটি তৈরি করেছে। এই টিকার ব্যাপারে রাশিয়া বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।

গত আগস্টে বিশ্বে প্রথম করোনার টিকা আবিষ্কারের ঘোষণা দেয় রাশিয়া। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, স্পুটনিক-৫ টিকা খুবই নিরাপদ। এটি তার মেয়ের দেহেও পুশ করা হয়েছে বলে জানান। এতে ‘ইতিবাচক’ ফল পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ২০ লাখ ডোজ টিকা উৎপাদন করছে রাশিয়া। রাশিয়া ঘোষণা করেছে, সৌদি আরবসহ ২০টি দেশ তাদের এই টিকার ১০০ কোটিরও বেশি ডোজের অর্ডার দিয়েছে। এই টিকা চীন ও ভারতেও উৎপাদিত হচ্ছে।

দেশে দেশে করোনার টিকার ব্যাপক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে টিকা নিয়ে অপরাধী চক্রও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারপোল’ করোনার নকল টিকা বাজারে বিক্রি অথবা আসল টিকা চুরি হতে পারে বলে বিশ্বব্যাপী সতর্কতা জারি করেছে। এতে বলা হয়, সঙ্ঘবদ্ধ একটি চক্র নকল টিকা বাজারে ও অনলাইনে বিক্রির চেষ্টা করতে পারে।

করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা গুজবও প্রচার করা হয়েছে। এসব গুজবে বলা হয়েছে- টিকার মাধ্যমে মানুষের জেনেটিক কোড পরিবর্তন করে দেয়া হতে পারে। মানুষের শরীরে মাইক্রোচিপ ঢুকিয়ে দেয়া হতে পারে। এ বিষয়ে স্বতন্ত্র তিনজন বিজ্ঞানী বিবিসিকে বলেছেন, করোনাভাইরাসের টিকা মানবদেহের ডিএনএতে পরিবর্তন ঘটায় না। এটি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। করোনার টিকা বা ভ্যাকসিন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষার মাধ্যমে করা হয়েছে। টিকার পরীক্ষা চালানো হয়েছে হাজার হাজার মানুষের ওপর। অনুমোদনের জন্য এই টিকাকে খুবই কঠোর এক যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞরা এর চূড়ান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। এ দিকে ফেসবুকও ঘোষণা করেছে, তারা করোনা টিকা নিয়ে গুজব ছড়ানো পোস্ট আটকে দেবেন।

চলতি মাসে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া করোনার টিকাদান শুরু করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সিএনএনের সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি আগামী ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব নিয়ে মাস্ক পরা সর্বজনীন টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করবেন। নাগরিকদের বলবেন, আগামী ১০০ দিন তারা যেন অবশ্যই মাস্ক পরেন। অফিস ভবনে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দেবেন। মাস্ক ও টিকা মিলে করোনার বিস্তার ঠেকিয়ে দেবে। তবে তিনি উইলিংটনে এক বক্তব্যে বলেছেন, করোনা টিকা নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে না।

বাংলাদেশে করোনা টিকাদান
বাংলাদেশ করোনার টিকাদানের ব্যাপারে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয়ভাবে দেশে করোনার টিকা আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকার শুরুতে প্রায় ৫২ লাখ মানুষকে করোনার টিকা দেয়ার কথা ভাবছে। এ ছাড়া তিনটি পর্যায়ে পাঁচ ধাপে ১৩ কোটির বেশি মানুষকে বিনামূল্যে টিকা দেয়ার কথা বলা হয়েছে টিকা দেয়ার খসড়া জাতীয় পরিকল্পনায়। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের স্থায়ী সমাধান টিকার মাধ্যমেই সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কোভ্যাক্সের সাথে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। কোভ্যাক্স থেকে ২০ শতাংশ টিকা পাবে বাংলাদেশ। এ ছাড়া টিকা উৎপাদনকারী দেশ ও কোম্পানির কাছ থেকে টিকা কেনারও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশীয় ওষুধ কোম্পানি বেক্সিমকো ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে তিন কোটি ডোজ টিকা সংগ্রহ করবে। এ ছাড়া চীনের সিনোভ্যাক এবং রাশিয়ার স্পুটনিক-৫ টিকা আনার ব্যাপারেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা বেসরকারিভাবে দেশে আমদানিরও উদ্যোগ শুরু হয়েছে। সরকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণসাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ টিকা আমদানির অনুমতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ও জনতা ট্রেডার্স ফাইজারের টিকা আমদানির প্রস্তুতি শুরু করেছে। দেশীয় ওষুধ কোম্পানি রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস ক্যান্সারসহ দুরারোগ্য ব্যাধির গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ উৎপাদন, বিপণন ও সরবরাহে এরই মধ্যে খ্যাতি লাভ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি সুইজারল্যান্ডের ওষুধ কোম্পানি হফম্যান ল্যা রশের গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ বাংলাদেশে বিপণন করে থাকে। রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান নাসের শাহরিয়ার জাহেদি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, করোনার টিকা আমদানির জন্য তারা ফাইজারের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করছেন।

টিকা আবিষ্কারক উগর দম্পতি
তুর্কি বংশোদ্ভূত জার্মান দম্পতি আবিষ্কার করেছেন ফাইজার নামে করোনাভাইরাসের টিকা। তারা হলেন অধ্যাপক উগর শাহিন ও তার স্ত্রী ডা: ওজলেম ভুরেসি। তারা জার্মানির মেইনজ শহরে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বায়োএনটেক কোম্পানি, মূলত ক্যান্সার গবেষণার জন্য। গত জানুয়ারিতে ‘ল্যানসেট’ পত্রিকায় করোনাভাইরাস সম্পর্কে জানার পর এই দম্পতি এর প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ কোম্পানি ফাইজারের সাথে মিলে তৈরি করেন করোনার ভ্যাকসিন। কোলন শহরে ফোর্ডের কারখানায় কাজ করতেন উগর শাহিনের বাবা। সেই সূত্রে মাত্র চার বছর বয়সে মায়ের সাথে তুরস্ক ছেড়ে জার্মানিতে আসেন তারা। কোলন বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিসিন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফেরার আগে ল্যাবে গভীর রাত পর্যন্ত গবেষণায় ব্যস্ত থাকতেন। ২০০২ সালে উগর শাহিন ওজলেম ভুরেসিকে বিয়ে করেন। বাবার মতো ভুরেসিও একজন চিকিৎসক। বিয়ের সময় উগর শাহিন মেইনজ শহরের ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টারে কাজ করতেন। এখন তিনি বায়োএনটেকের প্রধান নির্বাহী এবং ডা: ভুরেসি এর প্রধান মেডিক্যাল অফিসার। উগর শাহিন মেইনজ শহরের ওই মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাও করেন। বিয়ের দিনেও এই দম্পতি ল্যাবে কাজ করেছেন। তাদের প্রতিষ্ঠান বায়োএনটেকের বাজারমূল্য এখন ২১ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগেও এর মূল্য ছিল ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। উগর শাহিন এখন জার্মানির শীর্ষ ১০ ধনীর একজন তিনি। তবে চলাফেরায় একজন সাধারণ মানুষের মতোই। এখনো তিনি সাইকেল চড়েই অফিস করেন, বাড়ি ফেরেন। বিবিসির অ্যান্ড্রুমার শোতে দেয়া সাক্ষাৎকারে উগর শাহিন বলেছেন, শীতের মধ্যেই আশা করা যায় জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হবে। টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি না প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের আবিষ্কৃত টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বড়জোর টিকা দেয়ার স্থানে হালকা ও মাঝারি মাত্রার ব্যথা এবং হালকা জ্বর হতে পারে। এর বেশি কিছু নয়। আগামী বছরের এপ্রিলের মধ্যে ৩০ কোটি মানুষকে টিকা দেয়া সম্ভব বলে মনে করেন উগর শাহিন।

এই মুসলিম দম্পতির প্রতিষ্ঠিত বায়োএনটেক ক্যান্সারের ওষুধ তৈরির জন্য নিয়োজিত ছিল। অবশ্য কোনো ওষুধ এখন পর্যন্ত অনুমোদন পায়নি। সেই বায়োএনটেকই এখন বিশ্বে করোনাভাইরাস মোকাবেলার দিশারি। এর আগে তাদের আরেকটি কোম্পানি ছিল। সেটি ৪২২ মিলিয়ন পাউন্ডে বিক্রি করে দেন। বর্তমানে আলোচিত হচ্ছে, করোনা মোকাবেলায় এই ভ্যাকসিনের জন্য আগামীতে উগর দম্পতি হয়তো নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হতে পারেন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক