শনিবার, ২৭-ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৩:০৬ পূর্বাহ্ন

সৌদি আরবের কাতার–অবরোধ প্রত্যাহার : নেপথ্যের সমীকরণ

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারী, ২০২১ ০৭:২১ অপরাহ্ন

জুবায়ের আহসান হক: একেবারে বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো ২০১৭ সালের জুন মাসে অবরোধের সংবাদ কাতারের নাগরিকদেরকে বিমূঢ় করে দেয়। মাত্র কয়েক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রিয়াদ সফর করেছেন। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্রদের মাঝে কাতারের আমিরও উপস্থিত ছিলেন। তিনি হয়তো ঘূর্ণাক্ষরেও ধারণা করতে পারেননি এত তাড়াতাড়ি এমন ভয়াবহ আঘাত তার ওপর নেমে আসবে : সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও মিসর একযোগে কাতারের বিরুদ্ধে নৌ-স্থল ও আকাশ অবরোধ আরোপ করবে। অবরোধের ফলে উপদ্বীপ কাতার আক্ষরিক অর্থে দ্বীপে পরিণত হয়।

সাথে সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টুইট ভেসে আসে : দেখো আমার শক্তি। কিছুটা হতচকিয়ে গেল সবাই; মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি কাতারে, সেই আমেরিকার উস্কানিতে কিনা কাতার অবরুদ্ধ হলো! অবশ্য, অচিরেই গলার ফাঁস আলগা করতে সক্ষম হলো কাতার। কাতারের ভাগ্যই বলতে হবে, ইরান ও তুরস্কের মতো দু’টি শক্তিশালী রাষ্ট্র তার সাহায্যে এগিয়ে এলো পণ্য ও সৈন্য নিয়ে। তুরস্কের পার্লামেন্টে এত দ্রুত কাতারে সৈন্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে সৌদির যদি আক্রমণের ইচ্ছাও থাকত তবুও তারা সময় পেত না।

এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, কাতারের সক্ষমতা মূল্যায়নে আমিরাত ও সৌদি আরব দু’দেশই মারাত্মক ভুল করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে কাতারের প্রধান লবিস্ট হলো পেন্টাগন (রূপকার্থে)। মধ্যপ্রাচ্যের যে দেশে পেন্টাগনের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি আছে সে দেশের নিরাপত্তার কথা তারা চিন্তা না করে পারে না। তাছাড়া সৌদির মতো সফট পাওয়ারেরও কোনো ঘাটতি ছিল না কাতারের।

কাতার এতটা স্মার্টলি অবরোধ ঠেকাতে পেরেছে যে প্রথম দিকে অবরোধ তুলে নিতে কিছু অনুরোধমূলক বক্তব্য রাখলেও শেষের দিকে কাতার নির্বিকার হয়ে যায়। কুয়েতের পরলোকগত আমির ইরাকের দখল হতে মুক্তি পাওয়ার পর থেকে নিরপেক্ষতার সোজা দণ্ডের ওপর দিয়ে চলাচল করেন। একেবারে প্রথম দিন থেকে তিনি দূতিয়ালির চেষ্টা করেছেন।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট না হলে এত তাড়াতাড়ি নিষ্ফল অবরোধের সমাপ্তি ঘটত না। বাইডেন সৌদি যুবরাজের ব্যাপারে কড়া মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। শুধু বাইডেন নয়; সৌদি আরবের জন্য একটি অশনি সঙ্কেত হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রায় পৌনে এক শ' বছরের সম্পর্ক রাষ্ট্রের পরিবর্তে দলীয় সম্পর্কে পর্যবসিত হয়ে গেছে। ডেমোক্র্যাটিক দলে সৌদি-বিরোধী এত বেশি কংগ্রেসম্যান আছে যে নতুন প্রশাসনের সাথে কাজ করতে সৌদি আরবের বেগ পেতে হবে।

ইতোপূর্বে ডেমোক্রেট-রিপাবলিকান নির্বিশেষে সকল দলের সরকারের সাথে সৌদির ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সৌদি আরবের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রথম শৈথিল্য দেখা যায় ওবামা প্রশাসনের সময়, যখন সৌদি জোরাল আপত্তি উপেক্ষা করে ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি করে যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরবের ভাগ্যই বলতে হবে, অব্যবহিত পরে যুক্তরাষ্ট্রে এমন একজন প্রেসিডেন্ট এলো যে কিনা সৌদি যুবরাজকে ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে বসেছেন। অবশ্য পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন ট্রাম্প-জামাতা কুশনার, যিনি ডি ফ্যাক্টো সৌদি শাসক এমবিএসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

ওই কুশনার আবারো যুবরাজের সাহায্যে এগিয়ে এলেন। উপসাগর-সঙ্কট অবসানে কুয়েতের আমিরের পর সবাই তার অবদান স্বীকার করেছে। সৌদি আরব বাইডেনের অস্বস্তির বিষয়গুলো দূর করতে চাইছে। কাতার অবরোধের ১৩ দফার একটি দফাও বাস্তবায়িত হয়নি; তবুও কাতার-অবরোধ তুলে নেয়া হয়েছে। নেপথ্যের চাপ হলো যুক্তরাষ্ট্রে কম বন্ধুভাবাপন্ন প্রেসিডেন্ট। কয়েক দিন আগে ইয়েমেনের ব্যাপারেও সৌদি আরব কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সেখানে দক্ষিণের ১২ জন ও উত্তরের ১২ জন মন্ত্রী নিয়ে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। সৌদি দেখাতে চাইবে, এই সরকারের প্রতি ইয়েমেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সমর্থন রয়েছে। এভাবে আঞ্চলিক ঝামেলা কমিয়ে বাইডেনের মুখোমুখি হওয়া এমবিএসের জন্য কিছুটা সহজতর।

সৌদি আরবের কিছু অদৃশ্য শক্তি আছে, সফট পাওয়ার আছে; যা ব্যবহার করে দেশটি সবসময় সঙ্কট এড়িয়েছে। এবারো নিশ্চয়ই তা প্রয়োগ করবে। তবুও দেশটিকে এবার অতিরিক্ত সতর্ক দেখা যাচ্ছে, তাই সৌদি আরবকে এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে, অন্য সময় হলে সে হয়তো তা বিবেচনাই করত না। দেখা যাক, নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্টের আমলে সৌদি আরব আবারো দু’দেশের সম্পর্ক দলীয় গণ্ডির বাইরে নিয়ে যেতে পারে কিনা।