সোমবার, ১২-এপ্রিল ২০২১, ০৬:২৩ অপরাহ্ন

‘মদিনা সনদ’ যে কারণে বিশ্বের একটি শ্রেষ্ঠ সংবিধান: বিশ্লেষণ

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ০৭:৩৮ অপরাহ্ন

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ: হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের মুসলমান, ইহুদি ও পৌত্তলিকদের নিয়ে একটি সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তদনুসারে এ তিন সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক সনদ স্বাক্ষরিত হয়। এটা 'মদিনা সনদ' নামে পরিচিত। এ সনদে ৪৭টি শর্ত ছিল। এর প্রধান শর্তগুলো তুলে ধরা হলো। মদিনার সনদে স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়সমূহ একটি সাধারণ জাতি গঠন করবে। যদি চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কোনো সম্প্রদায় বাইরের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়, তাহলে তাদের মিলিত শক্তি দিয়ে সে আক্রমণকে প্রতিহত করবে। কেউ কুরাইশদের সঙ্গে কোনো প্রকার গোপন সন্ধি করতে পারবে না, কিংবা মদিনাবাসীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে কুরাইশদের সাহায্য করবে না। মুসলমান, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায় নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে, কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তা ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবেই বিচার করা হবে। তজ্জন্য অপরাধীর সম্প্রদায়কে দায়ী করা যাবে না। সর্বপ্রকার পাপ ও অপরাধকে ঘৃণা করতে হবে। কোনোক্রমেই পাপী ও অপরাধী ব্যক্তিকে রেহাই দেওয়া যাবে না। দুর্বল ও অসহায়কে রক্ষা ও সাহায্য করতে হবে। এখন থেকে মদিনায় রক্তক্ষয়, হত্যা ও বলাৎকার নিষিদ্ধ করা হলো। আল্লাহর রসুল মুহাম্মদ (সা.) প্রজাতন্ত্রের সভাপতি হবেন এবং পদাধিকার বলে তিনি সর্বোচ্চ বিচারালয়ের সর্বময় কর্তা হবেন। মদিনায় কোনো মুসলমান, অমুসলমান কিংবা ইহুদি হজরতের বিনানুমতিতে যুদ্ধ ঘোষণা করতে অথবা সামরিক অভিযানে যেতে পারবে না। কোনো মতানৈক্য ও বিরোধ দেখা দিলে তা বিচারের জন্য আল্লাহর রসুলের কাছে পেশ করতে হবে।
মদিনার সনদ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় বহন করে। তার প্রণীত সনদ 'দুনিয়ার ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র'। এটা নাগরিক সাম্যের মহান নীতি, আইনের শাসন, ধর্মের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ঘোষণা করে। তাই এটাকে ইসলামের 'মহাসনদ' বলা হয়। মদিনার সনদে সব সম্প্রদায়ের শুভেচ্ছা ও সহযোগিতার প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। গোত্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিলুপ্ত না করে প্রত্যেকের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ন রেখে এ সনদ উদারতার ভিত্তিতে একটি বৃহত্তর জাতি গঠনের পথ উন্মুক্ত করে। এ সনদের দ্বারা আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করা হয়। রাষ্ট্র ও ধর্মের সহাবস্থানের ফলে ঐশীতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। বস্তুত, মদিনার সনদ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বীজ বপন করে। ঐতিহাসিক বার্নার্ড লুইসের মতে, এ দ্বৈত সনদ (ধর্ম ও রাজনীতি) তখন আরবে অপরিহার্য ছিল। সে সময়ে রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যম ছাড়া ধর্ম সংগঠিত হওয়ার উপায় ছিল না। রাজনৈতিক দিক থেকে পশ্চাৎপদ আরবদের কাছে ধর্ম ছাড়া রাষ্ট্রের মূলভিত্তি গ্রহণীয়ও হতো না। অধ্যাপক হিট্টি বলেন, 'পরবর্তীকালের বৃহত্তর ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল ছিল মদিনার প্রজাতন্ত্র।'
মদিনার সনদের দ্বারা হজরতের ওপর মদিনার শাসনতান্ত্রিক কর্তৃত্ব অর্পিত হয়। কুরাইশদের বিরুদ্ধে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে এটা তার ক্ষমতা ও মর্যাদাকে যথেষ্ট বৃদ্ধি করে। সনদের শর্ত ভঙ্গ করার অপরাধে নবী কারিম (সা.) ইহুদিদের মদিনা থেকে বহিষ্কৃত করেন। এ সনদে সংঘর্ষ বিক্ষুব্ধ মদিনার পুনর্গঠনে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত আরব জাহানকে একতাবদ্ধ করার একটি মহৎ পরিকল্পনাও এতে ছিল। মদিনার সনদ দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয়, হজরত মুহাম্মদ (সা.) শুধু ধর্ম প্রচারকই ছিলেন না, তিনি পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ রাজনীতিজ্ঞও ছিলেন। উইলিয়াম মূরের মতে, 'হজরতের বিরাট ব্যক্তিত্ব ও অপূর্ব মননশীলতা শুধু তৎকালীন যুগের নয়, বরং সর্বযুগের ও সর্বকালের মহামানবের জন্য শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক।
মদিনার সনদ মদিনার রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও নাগরিক জীবনে বিরাট পরিবর্তন আনে। প্রথমত, এ সনদ রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপনে সাহায্য করে। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে নিয়ত যুদ্ধরত গোত্রগুলোর শহর শান্তিপূর্ণ প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর রসুলের দেওয়া নতুন সংবিধান অনুযায়ী এটা গৃহযুদ্ধ ও অনৈক্যের স্থলে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে। নবী করিম (সা.) মদিনার প্রত্যেক মানুষের (মুসলমান বা ইহুদি) জানমালের নিরাপত্তা বিধান করেন। তৃতীয়ত, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মদিনার সব নাগরিককে এ সনদ সমানাধিকার দান করে। চতুর্থত, এটা মদিনার মুসলমান ও অমুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তোলে এবং মোহাজেরদের মদিনায় বসবাসের জীবিকা উপার্জনের ব্যবস্থা করে। পঞ্চমত, মদিনায় ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, এ সনদ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে।
মদিনা সনদ গোত্র বা গোষ্ঠীগত চুক্তি হয়েও তা সার্বজনীনতা লাভ করেছে। এই চুক্তি উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, গোত্রীয় দম্ভ, ধর্মবিদ্বেষ, অঞ্চলপ্রীতির নামে কর্তৃত্ব মূলত মানবতার শত্রু ও প্রগতির অন্তরায় সব রকম প্রয়াস খতম করে সাফল্যের ন্যায্য অধিকার সংরক্ষণ ও দায়িত্ব কর্তব্যের বিবরণ সংবলিত এক অনন্য দলিল। এ দলিল পর্যালোচনা করলে মহানবী সা:-এর মানবাধিকার ঘোষণার প্রকৃষ্ট পরিচয় প্রতিভাত। বলা হয় এই মদিনা সনদের ধারাবাহিকতা ধরেই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় পরবর্তী যুগে যথাক্রমে ১২১৫ সালের ম্যাগনা কার্টা, ১৬২৮ সালের পিটিশন অব রাইট, ১৬৭৯ সালের হেবিয়াস কার্পাস অ্যাক্ট, ১৬৮৯ সালের বিল অব রাইটস এবং ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত ‘সর্বজনীন মানবাধিকার’ ঘোষিত হয়। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এই দলিলকে ‘মন্টোগোমারি ওয়াট’ তার মুহাম্মদ এট মদিনা গ্রন্থে বলেছেন ‘The Constitution of Madina’ অর্থাৎ মদিনার সংবিধান। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবী সা:-এর আরো একটি কীর্তি হচ্ছে হুদায়বিয়ার সন্ধি। আপাতদৃৃষ্টিতে নতজানু সন্ধি মনে করে প্রিয় সাহাবিরা মনস্তাত্ত্বিক কারণেই মর্মাহত হয়ে পড়েন কিন্তু মহান আল্লাহ স্বয়ং একে ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ বলে অভিহিত করেন। ঐতিহাসিকদের মতেÑ এ ধরনের একটি আপসচুক্তি ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা। যে কুরাইশরা এত্তগুলো মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত করেছে, যারা মুসলিমদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, যারা তখনো তাদেরকে হারাম শরিফে ঢুকতে দেয়নি এবং বহন করে আনা কোরবানির জন্তুগুলোকেও ফিরিয়ে দিচ্ছিলÑ এ হেন কপট, যুদ্ধবাজ আগ্রাসী মুশরিকদের এমন আকস্মিকভাবে সন্ধি ও সমঝোতায় নিয়ে আসা নবীজি সা:-এর জন্য একটি প্রাথমিক বিজয় ছিল যা পরবর্তীতে আরো বৃহত্তর বিজয় ডেকে নিয়ে আসে। দূরদর্শী মহামানব এই সন্ধিপত্রে কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও বৃহত্তম স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্রতম স্বার্থের বিসর্জন হিসেবে মেনে নিয়ে এক চরম রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি থেকে মানবতাকে রক্ষা করেন। মহানবী সা:-এর মক্কা বিজয়ের ঘটনাতেও মানবাধিকারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নিহিত। বিজয় মানুষকে আত্মহারা করে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য করে দেয়, প্রতিশোধ স্পৃহায় দাউ দাউ আগুনে হৃদয়হীন করে দেয়Ñ কিন্তু ক্ষমার মূর্তপ্রতীক মহানুভবতায় উদ্ভাসিত মহানবী সা: মানবের জানমালের নিরাপত্তায় ‘মক্কা বিজয়ে’ এক অতন্দ্র প্রহরীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যান।
ইসলামি শরিয়তের বিধানে মানবাধিকার সংক্রান্ত পাঁচটি প্রধান ধারা নির্ধারণ করা হয়েছে। যথা: জীবন রক্ষা, সম্পদ রক্ষা, বংশ রক্ষা, জ্ঞান রক্ষা ও ধর্ম রক্ষা। মূলত মানবতার সুরক্ষা বা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাই ইসলামের মূল লক্ষ্য এবং মুখ্য উদ্দেশ্য। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) মানবতার মুক্তির বার্তা নিয়েই এ জগতে এসেছিলেন। তিনিই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অন্ধকার ও অজ্ঞানতার যুগে পাপাচার, যুদ্ধবিগ্রহ, সহিংসতা, শিশুহত্যা ও কন্যাশিশুকে জীবন্ত মাটিচাপা দেওয়ার মতো অমানবিক প্রথার প্রচলন ছিল। ইসলামই কোরআন-সুন্নাহর বিধানে মানবতাবিরোধী সব কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধকে ‘কবিরা গুনাহ’ বা মহাপাপ রূপে আখ্যায়িত করেছে এবং এর জন্য দুনিয়ায় চরম শাস্তি ও পরকালে কঠিন আজাবের ঘোষণা দিয়েছে।
মানবজাতির আদর্শ হজরত মুহাম্মদ (সা.)। দুনিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পরকালে মুক্তির জন্য তিনি জীবন ভর মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান করেছেন। হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে শ্রেণি বৈষম্যকে অতিক্রম করে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মধ্যে ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব জাগ্রত করেছেন। আকাবার শপথ, মদিনা সনদ ও হুদায়বিয়ার সন্ধি এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী পাঠ করলে মানবতার কল্যাণে তার মহৎকর্ম ও কৃতিত্ব বোঝা যায়। হজরত মুহাম্মদ (সা.) দৃঢ় ভিত্তির ওপর ইসলামী রাষ্ট্রের বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সাম্রাজ্যের সব সম্প্রদায়ের লোকের সহযোগিতা ও সমর্থন না পেলে রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। যে দেশে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর বাস সে দেশে সব ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা বিশেষ প্রয়োজন। এদিক থেকে হজরতের নীতি ছিল- 'নিজে বাঁচ এবং অপরকেও বাঁচতে দাঁও।' তাই ছিল মদিনা সনদের মূল ভিত্তি। পরিশেষে বলতে পারি যে, মদিনা সনদ হচ্ছে বিশ্ব মানবাধিকার ও মানবতার শ্রেষ্ঠ দলিল ও সংবিধান।
(সাবেক উপ-মহাপরিচালক
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী
লেখক, কলামিস্ট ও গবেষক)