রবিবার, ১৬-মে ২০২১, ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

ডোমুরুয়া থেকে সচিবালয় 

shershanews24.com

প্রকাশ : ১০ মার্চ, ২০২১ ০৯:২২ পূর্বাহ্ন

বদিউর রহমান: আমার কিবরিয়া ভাই চলে গেলেন। আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান এসএএম গোলাম কিবরিয়ার কথা বলছি। আমাদের ফেনীতে মহিপালের একটু উত্তরেই তাদের বাড়িÑ দারোগা বাড়ি। ডাক্তার হিসেবে বিখ্যাত, একজন সজ্জন এবং দয়ালু ব্যক্তি। আমার দু’বছরের সিনিয়র। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছেন। সরকারি চাকরিতে সর্বশেষ ঢাকা মেডিকেল কলেজেই ছিলেন। তখন আমি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো সাবেক পিজি হাসপাতালকে অর্থাৎ আইপিজিএমআর বা ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চের নাম পরিবর্তন করে। এ প্রতিষ্ঠানের মূল ভবনটি আগে (পাকিস্তান আমলে) বিখ্যাত শাহবাগ হোটেল ছিল। এই শাহবাগ হোটেল ছিল তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের বনেদি হোটেল। পাকিস্তানের বড় বড় হোমরা-চোমরারা পূর্ব পাকিস্তানে এলে কিংবা পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের যারা হোমরা-চোমরা ছিলেন তারাও হোটেল বলতে এই শাহবাগ হোটেলেই থাকতেন, উঠতেন। এখানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানও উঠেছিলেন। আমরা যখন ছোট তখন এ হোটেল নিয়ে এমন গল্পও শুনেছিলাম যে, এখানে মানুষের মাংসও রান্না হতো। একবার একজন খাওয়ার সময়ে মানুষের হাতের নখ পেয়েছিল। আমরা এ-ও শুনেছিলাম যে, চিত্র-নায়ক রহমান আগে এ হোটেলের ফ্রন্টডেস্ক অফিসার ছিলেন। চিত্র-পরিচালক এহতেশাম তাকে দেখেই নায়ক করেছেন। অবশ্য তখন পূর্বানী হোটেলও ছিল, সেটার এত নামধাম ছিল না। শাহবাগ মোড়ে বড় একটা ফোয়ারা ছিল। এখন আর সেটা নেই। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বেশ কয়েক বছর ফোয়ারাটি ছিল। শাহবাগ থেকে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট হয়ে মৎস্যভবন ঘেঁষে রমনা পার্ক এবং প্রাক্তন রেসকোর্স যা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান-এর মাঝখানের রাস্তাটি তখন বর্তমান পর্যায়ের প্রশস্ততায় ছিল না। সরু ছিল। তখনতো এ রাস্তায় গুলিস্তানগামী বাস চলতো না, বাস যেতো শাহবাগ থেকে সোজা দক্ষিণ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ, লাইব্রেরি, টিএসসি’র (টিচার্স-স্টুডেন্টস সেন্টার বা ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র) পাশ দিয়ে। শাহবাগ থেকে রমনা পার্ক-ঘেঁষা রাস্তার পূর্ব পাশে বিশাল বিশাল সেগুন গাছ ছিল। জিয়াউর রহমানের আমলে সড়ক প্রশস্থকরণের সময়ে এ গাছগুলো কেটে ফেলা হয়। 
যা বলছিলাম, কিবরিয়া ভাই একদিন আমার সচিবালয় ক্লিনিক ভবনের দোতলার অফিসে এসে হাজির। ফেনীর মানুষ হলেও তার সাথে আমার ১৯৮৭-এর পূর্বে পরিচয় ছিল না। আমার সাথে বস্তুত আমাদের প্রাক্তন নোয়াখালী, পরে এরশাদের আমলে জেলায় উত্তীর্ণ ফেনীর, বেশি মানুষের পরিচয় আগেও যেমন ছিল না, এখনও তেমন নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর-এর চেয়ারম্যান হওয়ার পর মূলত দেশব্যাপী আমার বেশ পরিচিতি হয়। স্বাভাবিকভাবেই একজন আমলার, এমনকি সচিব হলেও, তেমন আহামরি পরিচিতি জনসাধারণ্যে থাকে না। মন্ত্রিপরিষদ সচিব (কেবিনেট সেক্রেটারি) বা গুটিকয়েক জাঁদরেল সচিব ছাড়া কর্ম-সংশ্লিষ্ট জনগণ ব্যতীত আমলাদের সাধারণ মানুষ চিনতই না। আমলা এবং জনগণের সম্পর্কের মাপকাঠি যেন তখন শাসক ও শাসিতের। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান হওয়ার পর সাবেক ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের পরিবর্তিত রূপে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের সিএসপি সাহেবগণতো লাহোর সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে প্রশিক্ষণের সময়ে এমনই ধারণা পেতেন যে, ইউ আর বর্ণ টু রুল, নট টু বি রুলড্। সে-ই যে ঘোড়ার পিঠে প্রশিক্ষণে উঠেছেন, আর তাদের নামতে হয়নি। চ্যাংড়া মহকুমা অফিসার অর্থাৎ এসডিও বা সাব-ডিভিশনাল অফিসার হয়েই পেয়েছেন জিপ গাড়ি। তখন এসডিও-সাহেবরাই মহকুমার মা-বাপ। তার অফিসের ধারে-কাছে দিয়েও তো সাধারণ মানুষ হাঁটতো না। তাদের ক্ষমতার ডিগ্রি নিয়ে এমনও বলা হতো যে, হোয়েন এসডিও ক্যাচ্ছে কোল্ড দ্যা হোল সাব-ডিভিশন স্নিজেজ অর্থাৎ মহকুমা অফিসারের সর্দি হলে গোটা মহকুমা হাঁচতো। আর ডিএম বা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিট্রেট, পরে ডেপুটি কমিশনার যার বাংলা হয়েছে জেলা প্রশাসক তারা তো জেলার মালিকই ছিলেন। তারা নাকি বদলি হলে দায়িত্ব হস্তান্তর অফিসে করতেন না, ট্রেনে বা অন্য বাহনে উঠে কর্মস্থল ত্যাগের সময়ে নিজের জেলার সীমানা পার হয়ে তবে দায়িত্ব হস্তান্তর করতেন। নিজের জেলার সীমানায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ‘রাজা’ থেকেই যেতেন।
আর পূর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস অর্থাৎ প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাগণ অর্থাৎ ইপিসিএস সাহেবদের তো সিএসপি সাহেবরা গণনায়ই আনতেন না। এমন সিএসপি সাহেবও দেখেছি যে, তার বেশ সিনিয়র ইপিসিএস সাহেবের সাথেও তার ‘চাকর-তুল্য’ আচরণ করেছেন। আমি সিভিল সার্ভিসে যোগদান করে তাজ্জব হয়ে দেখলাম যে, চ্যাংড়া সিএসপি উপসচিবের সামনে তার আগে চাকরিতে যোগ দেয়া অনেক সিনিয়র ইপিসিএস উপসচিব চেয়ারেই বসছেন না। প্রথম চাকরিতে এসে এসব মান-মানিতার ‘ফালতু’ নিয়ম না বুঝে আমি তো একদিন এক মহাফ্যাসাদের সৃষ্টি করে ফেলেছিলাম। সিএসপি উপসচিবের কক্ষে গিয়ে আমি সামনের চেয়ারে বসে পড়লাম। আমার সাথে-যাওয়া ইপিসিএস উপসচিব বসলেন না; আমি না বুঝে বলে ফেললাম, স্যার, বসছেন না কেন? অমনি সিএসপি সাহেব কটমট করে আমার দিকে তাকালেন। আধাঘণ্টা আমরা অফিসের কাজ নিয়ে কথা বললাম, কিন্তু ইপিসিএস সাহেব বসলেনই না। শুনতাম এবং পরে দেখেছিও, ইপিসিএস সাহেবদের এসডিও করা হলেও সাধারণত সদর-মহকুমার এসডিও-ই করা হতো এবং তারা তখন মূলত ডিএম বা জেলা প্রশাসকের স্টাফ-অফিসারতুল্যই থাকতেন। এমনটি হওয়ার কারণ নাকি ছিল। সিএসএস বা সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিসে অকৃতকার্য হলে বা ইপিসিএস-এ নিয়োগ পেলে নাকি অনেকে লজ্জায় তা লুকিয়ে রাখতে চাইতেন। মূলত চাকরির প্রবেশেই তাদের হীনমন্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেত। আর প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব পালন, সবদিক বিচেনায় তো তারা আরো পিছিয়ে যেতেন। অথচ তাদের মধ্যে অনেক অনেক মেধাবী কর্মকর্তা ছিলেন যারা কোনো অংশেই সিএসপি সাহেব থেকে কম ছিলেন না। কিন্তু কপালগুণে, প্রাদেশিক সার্ভিসে এসে, তারা এক ‘ভিন্ন প্রজাতির’ মানুষ বনে গেলেন।
আমি লক্ষ করেছি, সিএসপি সাহেবদের দুটো বড় গুণ ছিলÑ এক, তাদের বেশিরভাগই নিজে যেমন কাজ বুঝতেন, তেমনি কাজ আদায় করে নিতেও পটু ছিলেন; দুই, তাদের মধ্যে শ্রেণি-একাত্মতা ছিল প্রবল। নিজে নিজের অধঃস্তন সিএসপি সাহেবকে যতই বকাঝকা করুন না কেন, স্বজাতি-স্বগোত্রের গায়ে অন্য কারো দ্বারা কোনো আঁচড় লাগতে তারা দিতেন না। স্বজাতি-স্বগোত্রের পারস্পরিক সুরক্ষায় তারা সর্বশক্তি নিয়োজিত করতেন। ড. কামাল সিদ্দিকী আর মোঃ ফয়েজউল্লা কিংবা ড. কামাল সিদ্দিকী আর ড. সাদ’ত হুসেইনের মতো দা-কুমড়ো সম্পর্ক ছিল নেহায়েত নগণ্য বা ব্যতিক্রম। এদের, এ দু’জোড়া অফিসারের, পারস্পরিক তিক্ত সম্পর্কের রসালো গল্প আছে বেশ উপভোগ্য। আমি নিজেও দু’চারটে নজির স্বচক্ষে দেখেছি এবং উপভোগ করেছি। সিভিল সার্ভিসের অনেকেই কমবেশি কিছু-না-কিছু জানেন বটে, তবে তখনকার সমসাময়িক অফিসারাই বেশি জানেন। এদের তিনজনের সাথেই আমি কর্ম-উপলক্ষে পরিচিত ছিলাম, তবে ড. কামাল সিদ্দিকীর সাথে একটু কম। সিভিল সার্ভিসকে আমি মাঝে মাঝে মজা করে ‘ইভিল সার্ভিস’ বলে ফেলি, অর্থাৎ হয়তো বা ভুলে-ভালে সি-টাকে ই-করে ফেলি আর কি। আমার বেশ কিছু লেখায় আমি কিছু উল্লেখও করেছি। ‘সরকারি চাকুরিতে আমার অনুভূতি’ সিরিজের বইগুলোতেও কিছু কিছু আলোকপাত করা হয়েছে। আমার সহজ-সরল বক্তব্যের জন্যে আমার নিজের ঘরানার কেউ কেউ আমাকে ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ হিসেবেও ভেবে থাকেন। আমি বলি, সত্য সত্যই; এতে আপন পর চিহ্নিত করার কোনো সুযোগ নেই, যদি না মনের ভেতর কোনো স্বার্থপরতা বা পক্ষপাতিত্ব থেকে থাকে।
হ্যাঁ, কিবরিয়া ভাই আমার কক্ষে এসে হাজির। আমি তো ভীষণ খুশি। তিনি আমার পিত্ত-পাথরের অপারেশনের সময়ে সাবেক পিজি হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। আমার অপারেশন টিমেও ছিলেন। স্বনামধন্য একজন বড় মাপের সার্জন অধ্যাপক ডা. গোলাম রসুল সাহেব অপারেশন করেছিলেন। সেই ১৯৮৭ সালের আগস্ট। আমি জীবনে এমন ডাক্তার খুব কম দেখেছি, বিরলই বলা চলে। যার মধ্যে সেবা ছাড়া ভিন্ন কিছু দেখলাম না। টাকার প্রতি তিনি যে কত নির্মোহ তা ভাবাই যায় না। অথচ আমাদের বেশিরভাগ ডাক্তার কেবল টাকা-টাকা করতে করতে জীবন শেষ করে ফেললেন। রাত ২-৩টা পর্যন্ত রোগী দেখা, রোগীর চেহারার দিকে একটু তাকানোরও কারো কারো ফুরসৎ নেই। কোনো কোনো ডাক্তার, যিনি যত বড় নামের অধিকারী হয়েছেন, তিনি তত বড় বেশি করিৎকর্মা। তিনি রোগী চেম্বারে প্রবেশের আগেই বুঝে ফেলেন তার কী রোগ এবং কী ঔষধ দিতে হবে। নিজের জন্য বেশি ডাক্তারের কাছে না গেলেও আমার একমাত্র স্ত্রীর জন্য দেশের ১৯৭৬ থেকে ২০২০ সালের কত বড় বড় ডাক্তারের শরণাপন্ন হলাম। দারুণ অভিজ্ঞতা বাড়ল। ডাক্তারদের স্বরূপ দেখলাম। বিরল এবং ব্যতিক্রম যাদের দেখলাম তাদের পা ছুঁয়ে শ্রদ্ধা জানাতে ইচ্ছে হয়। আমাদের হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং চিকিৎসকদের নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে বছর চারেক কাজ করার অভিজ্ঞতাসহ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতে গেলে তা একটা বই-ই হয়ে যায়। কিন্তু কী লাভ, দেশ যেমন রাজনীতিতে চলে, চিকিৎসা সেবাও তার বাইরে যেতে পারে না। এবারের করোনায় তো প্রমাণ হয়ে গেল আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কোন পর্যায়ে রয়েছে। তারপরও ডাক্তাররা হলেন একটা ‘নেসেসারি ইভিল’, এদের ছাড়া আমাদের চলে না। তবে ডাক্তারের কাছে যত কম যাওয়া যায় তত মঙ্গল। তারপরও এদের সাথে আমি বেয়াদবি করি না। আমার হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আহমদ উল্লাহ সাহেব দু’শ্রেণির সাথে বেয়াদবি করতে নিষেধ করতেন। এক, শিক্ষকÑ এদের সাথে বেয়াদবি করলে শিক্ষা পাওয়া কঠিন হবে; দুই. ডাক্তারÑ এদের সাথে বেয়াদবি করলে চিকিৎসা পাওয়া দুষ্কর হবে। স্যার সেকেলে মানুষ, এখনকার ডাক্তারদের অনেকের আচরণ দেখলে হয়তো হতাশ হতেন। গোলাম রসুল সাহেব বোধ করি আমার হেডস্যারের মতো সেকেলেই। টাকার প্রতি তার নির্মোহ বাস্তবতা আমাকে শিখিয়েছেও। তাকে তো আমি চিনতামই না। তাহলে চিনলাম কিভাবে? তা-ও এক মজার অভিজ্ঞতা।
আল্লাহ যে কার উসিলায় কাকে কিভাবে চেনান এবং কাকে দিয়ে যে কার কী কাজ করিয়ে দেন তা বোঝা বড় মুশকিল। আল্লাহর সৃষ্টি-রহস্য নিয়ে আমি এমনিতেই বুঝে উঠতে পারি না। কী আশ্চর্য তার সব সৃষ্টি! আমার নিজের দেহের দিকে দেখলেই আমি অবাক হইÑ কেমনে আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করলেন। কী মহাকাণ্ডÑ ছোট্ট একটু জায়গায় দু’টো চোখ, দু’টো কান, একটা নাক, তাও দুটো ছিদ্র, একটা মুখÑ তাতে আবার ঠোঁট, দাঁত, জিহ্বা, গলা, দু’টো হাত, দু’টো পা, একটা পেট,... আরো কত কী! যেদিকে তাকাই তার সৃষ্টির সে কী-মহাকাণ্ড! গাছপালা, পশু-পাখি, জীব-জন্তু, আলো-বাতাস-পানি... না আমার মাথায় ধরে না। কুন-পাইয়াকুনের মালিক ছয় দিনে, তাও সে এক একদিন আমাদের পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করলেন!
আমার ছোটবেলার ঘাস তোলার সাথী আদর লেখাপড়া না জেনেও সক্রেটিস-প্লেটোদের হারিয়ে দিয়েছে। সে একদিন বলেই বসল, জানিস, আমি আবিষ্কার করেছি যে, আল্লাহর বুদ্ধি ইংরেজ থেকে বেশি। সে ব্যাখ্যা করল যে, ৫০-৫২ বগির একটা মালগাড়ি চিকনা-চিকনা দু’টি লোহার পাতের ওপর দিয়ে জোরে চলে যায়, কিন্তু লাইনচ্যুত হয় না, কী বুদ্ধি ইংরেজের, যে এ গাড়ি বানালো! কিন্তু পরে দেখি, রেলগাড়ির চেয়েও বড় সৃষ্টি তো মানুষ, এটা কেমনে বানাইল আল্লাহ! এ মানুষ নিজে নিজে হাঁটে, খায়, কথা বলে, মারামারি করে; ওমা, একটা মেয়ে মানুষের পেট থেকে দেখি আরেকটা মানুষ পয়দা হয়ে যায়! তখন বুঝলাম ইংরেজ থেকে আল্লাহর বুদ্ধি বেশি! শুনেতো আমি হা করে চেয়ে থাকি। তাইতো, আমিওতো কোনোদিন এমন করে ভাবতে পারিনি! এখন নিজেকে দেখলে আমারই অবাক লাগে। পবিত্র কুরআনের দেয়া তথ্যেও যার পর নাই অবাক হই। না, আমার মাথায় ধরার দরকার নেই, সৃষ্টি তার স্রষ্টা সম্পর্কে কী-ইবা আর বুঝতে পারবে? ঘড়ি তার মেকার সম্বন্ধে কী-ইবা বলতে পারবে? মানুষ সম্বন্ধে, সকল সৃষ্ট প্রাণিকূল, সকল সৃষ্টি সম্পর্কে আমি শুধু এটুকু বলতে পারি যে, এগুলো সব আল্লাহ-সৃষ্ট সেলফ-সুইচড্ কম্পিউটার।
আমি তখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চাকরি করি, ১৯৭৯ সালের ১ মার্চ তখনকার সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে যোগদানের পর ২ তারিখ থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পদায়নÑ শাখা প্রধান, এখন নাম সহকারী সচিব। সুপিরিয়র পদ পরীক্ষা, ১৯৭৬, ইংরেজিতে সুপিরিয়র পোস্টস এক্সামিনেশন, ১৯৭৬ পাবলিক সার্ভিস কমিশন-১-এর মাধ্যমে লিখিত, মৌখিক, সাইকোলজি টেস্ট -সব উতরিয়ে যোগদান। তার পূর্বে ১৪ অক্টোবর, ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রথম শ্রেণীর অফিসার হিসেবে যোগদান। এ পরীক্ষাও পিএসসি-১ নিয়েছিল। তখন দু’টো পিএসসি ছিল, প্রথম শ্রেণির পদের কাজ পিএসসি-১ আর ২য় শ্রেণির জন্য পিএসসি-২। পিএসসি-১ এর অফিস ছিল ধানমন্ডি ৭নং রোডের মসজিদের সামনে রাস্তার ৫০৭-এ নম্বর উত্তর পাশের বাড়িতে, পিএসসি-২-এর অফিস ধানমন্ডি ২নং রোডে। মঈদুল ইসলাম পিএসসি-১-এর চেয়ারম্যান, মির্জা আনোয়ার নামে একজন উপসচিব পিএসসি’র সচিব। আমাদের মৌখিক পরীক্ষার সময়ে পিএসসি-১-এর কার্যালয় ছিল তোপখানা রোডের চামেরী হাউজে। তারপর তো ওই অফিস পুরনো বিমানবন্দর হয়ে এখন আগারগাঁওস্থ নিজস্ব ভবনে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসার ক্লাস ওয়ান পদের পরীক্ষা পিএসসি-১-এর নেয়ার কথা নয়, কিন্তু রাষ্ট্রপতি জিয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য কিছু মেধাবী অফিসার চাইলেন বলে পিসএসসি-১কে এ দায়িত্ব দেয়া হলো। ৮০ জন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা নেয়ার জন্য লিখিত হলো, পরে মৌখিক। মৌখিকের সময়ে আমার বোর্ডে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এ কে গাঙ্গুলীও ছিলেন। তিনি আমাকে চেইন প্রশ্নে কাহিল করে ফেলছিলেন। একটার উত্তর দিলেই ওই উত্তর থেকে আরেক প্রশ্ন। মোট ৩৭ মিনিট মৌখিক জেরা। চোরা-চালানের উপকারিতা নিয়ে যুক্তি দিতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। কোনোরকমে একটা মেশিনের ছোট্ট একটা পার্টসের নিয়মমাফিক আমদানির দীর্ঘসূত্রিতা আর চোরাচালানের সহজ এবং কম সময়ে আনার ব্যাখ্যা দিয়ে শিল্প উৎপাদনের বিলম্ব এড়ানো এবং কুরবানির সময়ে গরু চোরাচালানের উপকারিতা দিয়ে বাঁচি। গাঙ্গুলী হাসলেনÑ বললেন, তাহলে অনৈতিক হলেও মাঝে মাঝে অনৈতিক চোরাচালান দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো বলতে চাইছ। এই তো যুক্তি তোমার, নাকি। হ্যাঁ বলার সাথে সাথে চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, আর দরকার নেই, এবার ছেড়ে দিন। বাইরে এসে দেখলাম, পাখার নিচে থেকেও ঘামে জামা ভিজেছে।
পরবর্তীতে সুপিরিয়র পদে মৌখিকে তো কত প্রস্তুতি, কত ভয়। কি না প্রশ্ন করতে পারে পিএসসি। বাজিয়ে নেয়ার জন্য যেমন খুশি বাজাতে পারেন। তখন অবশ্য পিএসসি’র নাম শুনলেই সবাই বলতো ওটা নিরপেক্ষ, কোনো খাতির নেই, যে যেমন যোগ্য তেমনই ফল। পিএসসির চেয়ারম্যান, মেম্বারও হতেন নামকরা, সুনামের অধিকারী আমলা, শিক্ষক, যোগ্য ব্যক্তিবর্গ। এ সুনাম মঈদুল ইসলাম, আল-হোসাইনী, এমনকি পরে অধ্যাপক মোস্তফা চৌধুরী পর্যন্ত অক্ষুণœ ছিল বলা চলে। তারপর এর পতন হতে থাকে। সাবেক সংস্থাপন সচিব ফয়েজউদ্দিনের (আমাদের নিয়োগের সময়ে তিনি সংস্থাপন সচিব ছিলেন) পিএসসির চেয়ারম্যান হওয়ার পর বদনাম শুরু হয়। ১৯৮২ সালের বিশেষ ব্যাচ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ইপিসিএস থেকে সচিব হওয়া ফয়েজউদ্দিন আহমদ সাহেব বিসিএস-এর কোচিং খুলেছিলেন। ড. সা’দত চেয়ারম্যান হয়ে সুনাম পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হলেও তেমন একটা সুবিধে করতে পারেননি। রাজনৈতিক নিয়োগে, দলীয়করণে পিএসসিতে গুণগতমানের পতন ঘটে। লোকে তেমন জানে না, চিনে না, পূর্ব-কর্মক্ষেত্রে তেমন সুনাম নেই, ব্যক্তিত্ব প্রশ্নসাপেক্ষÑ এমন এমন লোকও পিএসসি’র চেয়ারম্যান-মেম্বার হয়ে গেলেন। দলীয়মনাদের পুনর্বাসন ক্ষেত্র হয়ে গেল যেন পিএসসি। যাকগে, যে দেশে যেমন রাজা, সেদেশে তেমন প্রজা, হবু চন্দ্রের রাজত্বে গবুচন্দ্র মন্ত্রী হবেনÑ এতে হা-পিত্যেসের কী আছে!
সুপিরিয়র পদ পরীক্ষা, ১৯৭৬-এর সিলেবাস করেছিলেন প্রফেসর মুহম্মদ শামস উল হকের নেতৃত্বাধীন এক কমিটি। প্রফেসর হক পরে জিয়ার মন্ত্রিপরিষদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন। তার এক পুত্র খালেদ শামসও একজন নামকরা সিএসপি ছিলেন। তিনি কোটায় (ঈঙঞঅ) সিভিল অফিসার ট্রেনিং একাডেমিতে আমাদের প্রশিক্ষক ছিলেন, কোটার অধ্যক্ষ ছিলেন। খালেদ শামস অনেক বছর লিয়েনে বিদেশে পোস্টিং থেকে ফেরত এসে পদোন্নতিতে হতাশায় পড়েন এবং শেষতক চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে চলে যান। পরে তিনি প্রফেসর ইউনূসের গ্রামীণ ফোনে যোগ দেন। অনেকে তাকে ভাইস ইউনূসও বলতেন। তার সাথে আমার সর্বশেষ দেখা হয় ড. মিজানুর রহমান শেলীর জানাজায় ডরমেটরি মসজিদে, গ্রীনরোডে। আমি সামনের এক কাতার থেকে পেছনে এসে তাকে অনুরোধ করে সামনের কাতারে জোর করে পাঠালেও তিনি যেতে চাননি। অগত্যা আমাকে খুশি করার জন্য গেলেন। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১মার্চ ২০২১ প্রকাশিত)