সোমবার, ১৭-মে ২০২১, ১২:২৪ পূর্বাহ্ন

ডোমুরুয়া থেকে সচিবালয়

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৬ মার্চ, ২০২১ ১২:০২ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে,গত সংখ্যার পর: ড. শেলী খুব মেধাবী অফিসার ছিলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক ছিলেন এবং কোটায় আমার ভিলেজ অ্যাসাইনমেন্ট পেপারের উপস্থাপন সেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন। রাষ্ট্রপতি জিয়া রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত (নাটোরে উত্তরা গণভবনে) মন্ত্রিপরিষদ সভায় যাওয়ার সময়ে শেলীকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। ড. শেলী অবশ্য পরে এরশাদের আমলে মন্ত্রীও হয়েছিলেন। জিয়া জীবিত থাকলে শেলীকে মন্ত্রী করতেন এমন কথাও তখন শোনা গিয়েছিল। ড. শেলী সম্পর্কে আমরা এমনও শুনেছিলাম যে, তার সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় কোনোভাবেই প্রতিযোগিতায় প্রথম হতে পারবেন না জেনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ওই বছর পরীক্ষা না দিয়ে পরের বছর পরীক্ষা দিয়ে প্রথম হয়েছিলেন। আমার ভিলেজ অ্যাসাইনমেন্ট ছিল কায়েতপাড়া গ্রামে সামাজিক কোন্দল। এটা সুপারভাইজ করেছিলেন কোটার তখনকার এক পরিচালক জগন্নাথ দে। পরে তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিবও ছিলেন। ড. শেলী তার বক্তব্যে সোশ্যাল কনফ্লিকটের ওপর যে বিশ্লেষণ দিলেন আমরা থ বনে গেলাম। তার পাণ্ডিত্য আমরা প্রত্যক্ষ করলাম।
ড. সামাদও আমাদের ক্লাস নিতেন। তিনি সংসদ ভবন চত্বরে হাফ-প্যান্ট পরে দৌড়াতেন। হাফ-প্যান্ট পরে সচিব এবিএম সফদারও আসতেন। ড. সামাদ রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের দক্ষিণ পাশে একটা বাড়িতে থাকতেন। ওই বাড়িতে পরে আমার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে থাকাকালীনকার যুগ্ম সচিব হুমায়ুন কবীরও ছিলেন। তখনকার সিএসপি অফিসারগণ তুলনামূলকভাবে খুব স্বাস্থ্য সচেতন ছিলেন। তাদের দৈহিক অবয়বও বেশ চমৎকার থাকতো, বলা চলে রাখতেন। ড. শেলীর জানাজাতে ড. মশিউর রহমান, ড. আকবর আলি খান, ড. সা’দত হুসেইনও উপস্থিত ছিলেন। ড. মশিউর রহমান যখন ১৯৯৬ সালে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে সচিব তখন আমি ওখানে সিনিয়র সহকারী সচিব।
যমুনা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত পরিচালক থাকতে অফিসের জন্য প্লেট কেনার এক প্রস্তাবে আমার এক হাস্য-রসিকতার মৌখিক মন্তব্য নির্বাহী পরিচালক আবদুল মুয়ীদ চৌধুরীর একান্ত সচিব তাকে ‘লাগিয়ে’ দিলে মুয়ীদ চৌধুরী আমাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেন। অথচ তিনি আমার নোটের প্রস্তাব চিহ্নিত করে অনুমোদন করতেন এবং প্রশংসাও করতেন। তার পূর্বসূরি মোহাম্মদ আলী (সচিব, নরসিংদী) অনেকটা লড়াই করেই আমাকে সেতু কর্তৃপক্ষে নিয়েছিলেন। তখনকার সংস্থাপন সচিব হাবিবুর রহমান (নরসিংদী) আমাকে চিনলেও আমি যেহেতু উপসচিব নই (৬,৩০০ টাকার স্কেল), অতিরিক্ত পরিচালকের (৭,১০০ টাকার স্কেল) পদে আমাকে প্রেষণে দিতে রাজি নন। মোহাম্মদ আলী সাহেব সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী নূরুল হুদার কাছে গিয়েও ব্যর্থ হন। কিন্তু তারাতো জাতে সিএসপি, হার মানতে অভ্যস্ত নন। তিনি সরাসরি মন্ত্রী কর্নেল অলির কাছে গেলেন এবং আমাকেই তার দরকার বললেন।
কোনো এক ঘটনায়, আমার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে থাকালীন, কর্নেল অলি আমাকে চিনেছেন। তার আগে জিয়ার মন্ত্রীদের কর্ডিনেশন সভায়ও অলি মাঝে মাঝে আমন্ত্রণ পেতেন। তখন আমাকে দেখলেও তার চেনার কথা নয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পুচকে ডেস্ক অফিসারকে তারা চিনবেন কেন? আমার বিরুদ্ধে জিয়া এয়ারপোর্টের ম্যানেজার প্রাক্তন এক সামরিক অফিসার অলির নিকট অভিযোগ করলে তিনি সচিব হাবিবুর রহমানকে বলেন। সচিব আমার যুগ্মসচিব মোঃ রকিফুল ইসলামকে (কুষ্টিয়া), (যিনি সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে আমার উপসচিব ছিলেন এবং আমার কাজে সন্তুষ্ট ছিলেন) বিষয়টি দেখতে বললে জনাব রফিকুল আমাকে নিয়ে সচিবের কক্ষে গেলেন এবং দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন যে, বদিউর ঘুষ চাইতেই পারে না। এটা অবিশ্বাস্য। আমি ঘটনা খুলে বললাম, ওই এয়ারপোর্ট ম্যানেজার সামরিক বাহিনীর (অব.) থেকে সিভিল সার্ভিসে নিয়োগপ্রাপ্ত (আত্মীকৃত) ১৩ জন অফিসারের একজন ছিলেন। তার বাড়ি চট্টগ্রামে হওয়ার সুবাদে অলির কাছে অভিযোগের সুযোগ নিয়েছেন। তাদের জ্যেষ্ঠতা সরকারের এক আদেশে নির্ধারিত ছিল। তিনি ওই আদেশের অপব্যাখ্যা করে সিনিয়রিটি নিয়ে পদোন্নতি পেতে চান। আমি তা সম্ভব নয় বলি। তিনি আমার বাসায় গিয়ে দেখা করতে বারবার অনুরোধ করেন। কেন বাসায় যেতে চান তা অনুধাবন করি। রাজি না হওয়াতে ক্ষেপে যান। বিজি প্রেসে থাকতে এক ঠিকাদারকে বাসায় দেখা করার সুযোগ দিতে কন্ট্রোলার সিরাজুল ইসলামের অনুরোধ না রাখলে তিনিও ক্ষেপেছিলেন যা অনেকদূর গড়ায়। উইং কমান্ডার মির্জাকে (অব.) পরিচালক, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি যদি বাসায় যেতে দিতে পারি, তাকে কেন দেব নাÑ এমন যুক্তিও তার ছিল। মির্জা গিয়েছিলেন আমার সাথে তার এক বন্ধুর পরিচয়ের সুবাদে, কোন কাজে নয়। সমস্ত ঘটনা খুলে বললে কর্নেল অলি এ নিয়ে আর কিছু বলেননি। যেই মোহাম্মদ আলী সাহেব মন্ত্রী অলির নিকট আমার পদায়ন চাইলেন তখন অলি সংস্থাপন সচিবকে প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দিলেন। আমার ইতোমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বদলির আদেশ হয়ে রয়েছে এবং যুগ্মসচিব মীর মোজাম্মেল হোসেন (রেলওয়ে সার্ভিসের), পূর্বে সংস্থাপনের বিধি অনুবিভাগের যুগ্মসচিব ছিলেন, আমাকে যোগ দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। 
মোজাম্মেল স্যার (মানিকগঞ্জ) একজন নিরেট খাঁটি অফিসার ছিলেন। তার সততা সম্পর্কে তখনকার সংস্থাপন সচিব মোঃ শামসুল হক চিশতি বলেছিলেন যে, বিধি অনুবিভাগ অন্তত বিক্রি হবে না। মোজাম্মেল স্যার একজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার দ্বারা নিয়মমত অনেকে উপকৃত হয়েছেন। আমার এক জেঠাত ভাই তার চাকরি হারিয়ে পরে মোজাম্মেল স্যারের সঠিক ব্যাখ্যায় চাকরি ফিরে পেয়েছিলেন। আরেক দূর সম্পর্কীয় মামাতো ভাই তার সঠিক হস্তক্ষেপে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে তার নিকট থেকে অন্যায়ভাবে আদায় করা টাকা ফেরত পেয়েছিলেন। আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যোগ দিতে যাওয়ার পথেই যুগ্মসচিব (এপিডি) তখন ওই মোঃ রকিকুল ইসলামই, লোক পাঠিয়ে যোগদান না করতে ডেকে পাঠালেন। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, বদি, আপনার এখন জামাই-আদর। যোগাযোগ মন্ত্রীর ঠেলায় এখনই আপনার যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত পরিচালক পদে প্রজ্ঞাপন হয়ে যাচ্ছে। হাতে হাতে নিয়ে গিয়ে আজই যোগদান করেন। মোহাম্মদ আলী স্যার আমাকে সেভাবে অনুরোধ করেছেন। সরকারি চাকরিতে ঠেলার নাম বাবাজি কাকে বলে আমি দেখেছি। তার বিপরীতে মুয়ীদ চৌধুরীর ঠেলায় আমার যমুনা থেকে বদলিও দেখলাম। মুয়ীদ কর্তৃপক্ষের বৈঠকে আপ্যায়নের জন্য অনেক ক্রোকারিজ কিনতে বলেছিলেন। আমি অত ক্রোকারিজ অপ্রয়োজনীয় ভেবেছি। তার একান্ত সচিব কামরুন্নাহারের কক্ষে হাসতে হাসতে মজা করে বললাম যে, এত ক্রোকারিজ, বিয়ে-সাদী আছে নাকি? আর যায় কোথায়? আমার বদলি। উপপরিচালক সৈয়দ মাহবুব হাসান আমাকে বললেন, হাসি-মশকারার কথা মুয়ীদ সাহেবকে বলে দেয়া পিএস-এর উচিত হয়নি। পরিচালক (প্র:), যুগ্ম সচিব মোঃ আজমল চৌধুরী আমাকে শুধু বললেন, কিচ্ছু করার নেই। বুঝতেই তো পারছেন। এক সচিব পছন্দ করে অনেক লড়াই করে নিলেন, আরেক সচিব তার সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘরোয়া প্রশ্ন তোলায় ক্ষণিকে সরালেন। সিভিল সার্ভিসে পছন্দ-অপছন্দ আর সিএসপি সাহেবদের গোঁ-য়ে কতকিছু দেখলাম। এদের রাজত্ব তারা খুবই উপভোগ করেছেন। সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা (স্টাফ থেকে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) একটা সুন্দর গল্প বলেছিলেন সিএসসি সাহেব সম্পর্কে। একবার তার অফিসার স্ত্রীসহ ওই কর্মকর্তার কক্ষে এসেছিলেন। তখন তিনি সাহেবকে দিয়েছিলেন একটা সালাম, আর বেগম সাহেবকে দিয়েছিলেন ডবল সালাম। কারণ ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, বেগম সাহেবার ডবল সালামের একটা বেগম সাহেবার জন্য, আরেকটা বেগম সাহেবার পেট থেকে যে পরে আরেক সিএসপি অফিসার পয়দা হবে এবং ওই কর্মকর্তার বস হবে তার জন্য আগাম। এ প্রজাতির শেষ দিকে ঠিকাদারী নিয়োগেও তারা রাজত্ব করে গিয়েছেন।
ড. মশিউর রহমানকে ড. শেলীর বাড়ির আঙ্গিনায়, জানাজা শুরুর আগে, সালাম দিতে এগিয়ে গেলাম। পরিচয় দিলাম, স্যার, লুৎফুল্লাহিল মজিদ এর পর আপনি ইআরডি’র (আগে বহিঃসম্পদ বিভাগÑ এক্সটারনাল রিসোর্সেস ডিভিশন, পরে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগÑইকনোমিক রিলেশন্স ডিভিশন) সচিব হয়ে এলেন, আমি সিনিয়র সহকারী সচিব ছিলাম। তিনি বললেন, আপনি এনবিআর’র স্বনামধর্ম চেয়ারম্যান ছিলেন। আমি বললাম, আপনার সাথে স্যার আমার আগের পরিচয়ই বড় পরিচয়, যদিও তখন আপনাকে আমি যতটুকু চিনতাম, আপনি আমাকে ততটুকু চিনতেন না। একজন ইআরডি সচিবের পক্ষে, বেদরকারি হলেও ৭৬ সেকশনের সবাইকে চেনার প্রশ্ন ওঠে না। তিনি যুগ্মসচিব পর্যন্ত বেশি চিনতেন, উপসচিব বা ডেস্ক অফিসার বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছাড়াগুলো কেন চিনবেন? তিনি সহজভাবে বললেন, সিভিল সার্ভিসে উঠতে উঠতে শেষ পদে এসে সবাই থেমে যান। তখন সে পরিচয়টাই বড় হয়। আমি বললাম, একদা সিনিয়র, সবসময়েই সিনিয়র, আপনি স্যার আমার সচিব ছিলেন, এখনো আমার সচিবই। মনে পড়ে, ইংরেজি শেখার একটা শর্ট কোর্সে বিদেশ যাওয়ার প্রোগ্রামে আমিও প্রার্থী হয়েছিলাম। ইংরেজিতে অনার্স ও মাস্টার্স দেখে তিনি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বললেন, ওর আর ইংরেজি শেখার দরকার নেই। উনি যদি জানতেন যে, টাকার জন্য তখন আমি বিদেশ যেতে চেয়েছিলাম। টাকার জন্য আমি শুধু টিউশনই করিনি, অস্ট্রেলিয়াতে পড়ার সময়ে কাঁধে ২০ কেজির ভ্যাকুয়াম ক্লিনার নিয়ে অফিসও পরিষ্কার করেছি, গাছের পাতা কুড়িয়ে পরিষ্কার করেছি, লেটারবক্সে কাগজ বিতরণ করেছি। হক-হালালি রোজগার, প্রতি ঘণ্টায় সেই ১৯৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়ান ৮ ডলার সমান আমাদের তখনকার ২০০ টাকা। টাকা সঞ্চয়ের জন্য বৈধভাবে কত কী না করেছি। তখনকার অভাব আর এখনকার প্রাচুর্য দেখলে আমারই অবাক লাগে। আল্লাহ কাকে কোথা থেকে কোথা নিয়ে যাবেন, সেটা তিনিই ভালো জানেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে বাস্তবায়ন-২ শাখায় আমার কাজ। এ শাখায় মন্ত্রিপরিষদ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কিছু কাজ হতো। আমার প্রথম উপসচিব ছিলেন কুমিল্লা জেলার জেলা প্রশাসকÑ ডিসি থেকে আসা এইচএন আশিকুর রহমান। পরে আমি এ বিভাগের বিখ্যাত বা এক নম্বর সেকশন হিসেবে খ্যাত মন্ত্রিপরিষদ শাখা, ইংরেজিতে কেবিনেট সেকশনে পদায়ন পাই ২৩ এপ্রিল, ১৯৮০। এ শাখা মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকের কাজ করতো। বৈঠকের এজেন্ডা ঠিক করা, নোটিস প্রদান, ফোল্ডার পাঠানো, বৈঠকের প্যাড-পেন্সিল সরবরাহ, মন্ত্রীদের আসন বিন্যাসে তাদের নাম-কার্ড দেয়া, সভার কার্যবিবরণী প্রস্তুত ও চূড়ান্তকরণ এবং বাস্তবায়নের জন্য সিদ্ধান্ত প্রেরণ। নূরে আলম সিদ্দিকীর, বাংলাদেশের সুপরিচিত ‘চার খলিফার’ একজন, শ্বশুর মোঃ আবুল হাশেম কেবিনেট শাখার ঊর্ধ্বতন শাখা প্রধান। তার অবসরে যাওয়ার পর আমার এ শাখায় পদায়ন।
এ সুবাদে ডায়বেটিস হাসপাতালের, বর্তমান বারডেম-এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. ইব্রাহিমের সাথে হঠাৎ আমার পরিচয়ের সুযোগ ঘটে। শাহবাগের বারডেম-এর জায়গা সরকার থেকে সম্মানী মূল্যে পাওয়ার প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে উপস্থাপনের সারসংক্ষেপ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে এসেছে। তা পরীক্ষান্তে বৈঠকে পেশ করতে হবে। প্রফেসর ডা. ইব্রাহিম আমার কক্ষে এলেন। তাকে সামনাসামনি জীবনে প্রথম দেখলাম। তিনি নিজেই তার পরিচয় দিয়ে বললেন, আমি ডা. ইব্রাহিম। তোমার কাছে একটা কাজে এসেছি। আমার ডায়াবেটিস হাসপাতালের জায়গার সামারিটা বৈঠকে পাঠাতে হবে। প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলা আছে। আমি তো টাব্বুস, প্রফেসর ডা. ইব্রাহিম আমার সামনে! দাঁড়িয়ে গেলাম, স্যারকে বসতে বললাম। ভেতরে আমার কেমন একটা উত্তেজনাও কাজ করছে। বললাম, স্যার, আপনি কেবিনেট সেক্রেটারি সাহেবের কক্ষে গিয়ে বসেন। আমি হাতে হাতে নথি নিয়ে আসছি। মিনিট দশেক সময় লাগবে। উপসচিব মুহম্মদ ওমর ফারুক, পরে স্বরাষ্ট্রসচিব, যুগ্মসচিব মোঃ নূর-উন-নবী চৌধুরী থেকে হাতে হাতে সই করিয়ে নেব। তিনি আমার সামনের চেয়ারে বসে পড়লেন। বললেন, কাজটাতো তোমার কাছে, কেরামতের রুমে গিয়ে কী করব, তুমি ফাইল নিয়ে যাওয়ার সময়ে যাব। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম যেন, বলে কী, আমার সামনে এত বড় মানুষ বসে থাকবেন! আমি পাশের স্টাফদের রুমে নথি নিয়ে রওয়ানা দিতেই তিনি বললেন, তুমি তোমার চেয়ারে বসে কাজ কর, কোনো অসুবিধা নেই। আমার তখন একটু জড়তা দেখা দিল, তার সামনে বসে কাজ করব। তিনি আমার কাঁধে সস্নেহে হাত দিয়ে বসিয়ে দিলেন। আমি তার হাতের স্পর্শে অভিভূত হলাম। আমার সামনে সিগারেটের অ্যাসস্ট্রে ছিল, আস্তে চুরি করার ভঙ্গিতে তা সরিয়ে ফেললাম। আমার চাকরি জীবনের, তাও ধরতে গেলে শুরুতে, এরকম সামনাসামনি প্রফেসর ইব্রাহিম বসে আছেন!
বৈঠকের পরে তিনি আবার এলেন। এবারও সরাসরি আমার কক্ষে। রাষ্ট্রপতি জিয়ার স্বাক্ষরিত কার্যবিবরণী তিনি দেখে গেলেন, ১ টাকা সম্মানী মূল্যে বারডেমের জায়গাটা দেয়া হলো। যাওয়ার সময় তিনি আমাকে তার হাসপাতালে, তখন সেগুন বাগিচায় টিনসেডে, যেতে বললেন। একদিন গেলাম। তিনি তার ফ্রন্ট ডেস্কেই বসা। তার একজন বিশ্বস্ত সহকর্মীকে নামটা মান্নান-জাতীয় কিছু হবে, সঠিক মনে পড়ছে না এখন, ডাকলেন। আমাকে দশটা গ্লুকোজের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বললেন, কিছু সময় কাজ করার পর পানিতে মিশিয়ে খাবে, কাজের শক্তি বাড়বে। পরে ১৯৮৪ সালে আমার শ্বশুর সেগুনবাগিচার ওই হাসপাতালে ভর্তি হলে আবার সেখানে গিয়েছিলাম। এখন তার অবদান কত বড়, কত বিশাল। ওই যে শিখলাম, কাজটা তোমার কাছে, এখানেই বসিÑ এ শিক্ষাটা পরবর্তী জীবনে আমিও কাজে লাগিয়েছি। সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, রাজউক এবং অন্যান্য অফিসÑ ঠিক যার কাছে প্রথম কাজ তার কাছে গিয়ে বসেছি। আমি প্রফেসর ইব্রাহিমকে আমার কাছে দেখে যেভাবে অবাক হয়েছি, তারচেয়ে কম হলেও আমাকে দেখে অন্যরাও হয়েছেন, সাথে সাথে আমার কাজ করে দিয়েছেন। সময়সাপেক্ষ ব্যাপারে সময় নিয়ে করে দিয়েছেন। এমন গুণীজন থেকে শেখা যেন এবাদতের সমান।
আমার পিত্তথলির পাথর জমার বিষয়টি আমি বুঝতেই পারতাম না, যদি না আমার এক মামা শ্বশুরের বাড়িতে তার বিয়েবার্ষিকীতে গোটা ছয়েক বড় বড় পরোটা এবং দু’বাটি গোমাংস একসাথে খেয়ে ফেলতাম। ঐ রাতের অনুষ্ঠানের পর রাত ১টার দিকে পেটে প্রচণ্ড ব্যথা হতে থাকে। এ ব্যথা আস্তে আস্তে পিঠ হয়ে উপরে উঠতে থাকে। তারপর দেখি বুক-পিঠ-পেট কিছুই নাড়ানো যাচ্ছে না। ডাক্তারি ভাষায় এটা নাকি রেফার্ড পেইন। তারও পরে দেখা যায় আমার প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেল। অসহ্য ব্যথা। আমরা তখন সোবহানবাগ নতুন কলোনির ১০ নং ভবনের ৬নং ফ্ল্যাটে। আমার প্রতিবেশী ৫ নং ফ্ল্যাটের হাই ভাই অর্থাৎ ১৯৭৩ ব্যাচের মোঃ আবদুল হাই (সিলেট) আমাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। রাত তখন ৩টা। এ হাসপাতাল আমাকে রাখল না, বলল ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যেতে। এখন করোনায় এ-হাসপাতাল সে-হাসপাতাল করতে করতে কত রোগী অ্যাম্বুলেন্সে বা রাস্তায় মরে যাচ্ছে। বড় করুণ অবস্থা আমাদের স্বাস্থ্য খাতের। করোনার আগে যেসব বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণ রাতের ২-৩টা পর্যন্তও চেম্বার করেছেন, রোগী দেখেছেন, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামিয়েছেন, তাদের অনেকেই এখন সেবায় নেই। এ অভিযোগ কিন্তু সবার বিরুদ্ধে করা যাবে না। তারপরও ডাক্তারগণ করোনায় প্রশংসনীয় প্রচেষ্টা নিচ্ছেন বলা চলে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে অনেক ডাক্তারও মারা যাচ্ছেন।
যাক, সোহরাওয়ার্দী থেকে ফিরে আমি আমার বড় শ্যালক মোঃ লুৎফুল কবীরকে নিয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছলাম রাত ৪টায়। এলিফ্যান্ট রোডের দোকানগুলোতে তখনও কিছু কেনাবেচা হচ্ছে। সকালেই ঈদ-উল-ফিতর। হাসপাতালে জরুরি বিভাগে ভর্তি স্লিপ দিয়ে একটা বেডে পাঠানো হলো। ঢাকা মেডিকেল কলেজ এখনও দেশের গরিবের বড় ভরসা। বেডের চেয়ে কয়েকগুণ রোগী ফ্লোরে, বারান্দায় থেকেও এখানে সুচিকিৎসা নেয়, যেমনি হচ্ছে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। স্বাস্থ্য খাতে চুরি-ডাকাতি না থাকলে যে উন্নয়ন হতো তা থেকে আমরা বঞ্চিত। অন্যান্য খাতের ন্যায় এখানেও সুশাসনের দারুণ অভাব রয়েছে এবং রাজনৈতিক দলীয়করণ তো এখন স্বাস্থ্যখাতের চালিকাশক্তি বলা চলে। সালাহউদ্দিন ইউসূফ যখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী তখন তার যে কিছু কান্ড দেখেছিলাম, প্রফেসর রুহুল হকের মন্ত্রীত্বকালে তো দুর্নীতি আরো বেড়েছিল। স্বয়ং মন্ত্রীকে নিয়েও দুর্নীতির বড় অভিযোগ ছিল। সাকা চৌধুরী সম্ভবত একটু টাইট করতে পেরেছিলেন এরশাদের আমলে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক ওয়ার্ডবয় আমার পরিচয় জেনে সোজা বলল, স্যার, সকালেই ঈদ, এখন কে আপনাকে দেখবে? এভাবে কতক্ষণ পড়ে থাকবেন? বুঝলাম, শালাকে বললাম, তুমি একদিকে কেটে পড়, আমি টয়লেটে যাব বলে সেই যে বেরুলাম আর আমার টয়লেট শেষ হলো না। পালিয়ে বলা চলে, বলে আসতে চাইলে তো পারতাম না, বাসায় চলে এলাম। শালা এক কম্পাউন্ডার ডেকে এনে ব্যথার কী একটা ইনজেকশন পুশ করে দিল। ম্যাজিক কাজ হলো। যেভাবে ব্যথা উঠেছিল, ছড়িয়েছিল, ঠিক রিভার্স হয়ে তা কমে যেতে থাকল। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে আমি সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত হয়ে ৮টায় ঈদের জামাতে সোবহানবাগ মসজিদেও হাজির হতে পারলাম। কিন্তু ওই কম্পাউন্ডার বলে গেলেন, তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখাবেন নচেৎ পরে আবার বিপদ হতে পারে। আবার পস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে অবস্থা বেগতিক হতে পারে। দেখলাম, তখনকার কম্পাউন্ডারও অনেক ডাক্তার থেকে ভালো অভিজ্ঞতা রাখেন। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৫ মার্চ ২০২১ প্রকাশিত)