সোমবার, ১২-এপ্রিল ২০২১, ০৭:২৪ অপরাহ্ন

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ এর ভাষণ: বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতা অর্জনের প্রথম ধাপ

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৭ মার্চ, ২০২১ ০৯:৪৯ পূর্বাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ৭ই মার্চ ১৯৭১, ঢাকার রমনায় অবস্থিত রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণের কারণেই ৭ই মার্চ তারিখটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ঐদিন বিকেল ২টা ৪৫ মিনিটে শুরু করে বিকেল ৩টা ৩ মিনিট পর্যন্ত ১৮ মিনিট স্থায়ী ভাষণে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ) বাঙ্গালীদেরকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। বিশ্বে এটি একটি শ্রেষ্ঠ উদ্দীপনা মূলক ভাষণ। প্রচণ্ড চাপের মধ্যে থেকেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি ভারসাম্য ও নির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদান করে জাতিকে পথ দেখিয়েছেন। এ জন্য তাঁকে বলা হয় চড়বঃ ড়ভ চড়ষরঃরপং এবং ভাষণটি গবসড়ৎু ড়ভ ঃযব ডড়ৎষফ জবমরংঃবৎ ড়ভ টঘঊঝঈঙ-তে সংরক্ষিত রয়েছে।
আজ থেকে ৫০ বছর আগে পাকিস্তানি দস্যুদের কামান-বন্দুক-মেশিনগানের হুমকির মুখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে স্পষ্ট ঘোষণা করেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। শুরু হয় নতুন পথচলা।
১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ৭ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে পূর্বপাকিস্তানের ১৬৯ আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পায় ১৬৭টি আসন, বাকি ২টি আসন পায় পিডিপি। ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭১-এর ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং পাকিস্তান সামরিক চক্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে অর্থাৎ আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতাহস্তান্তরের ব্যাপারে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ঘোষণা করা হয়, “প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল করেছেন”। তখন তীব্র ক্ষোভে ফেটে পরলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাঙালি জনগণের মুক্তির ডাক দিলেন। শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন, গঠিত হলো স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। উচ্চারিত হলো বাঙ্গালী জাতির ইতিহাসেপ্রথমবারের জন্য স্বাধীনতার স্লোগান, “বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’
বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ২ মার্চ ঢাকা ও ৩ মার্চ সারাদেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়েছিল। ২ মার্চ সকাল থেকেই মিছিল ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়মুখী। ঢাকা ছিলো হরতালের নগরী, মিছিলের নগরী এবং কারফিউর নগরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় স্মরণকালের সর্ববৃহৎ ছাত্র সমাবেশে ছাত্রলীগের নেতৃত্বাধীন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল।
৭ মার্চের একদিন আগে অর্থাৎ ৬ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান টেলিফোনে কথা বলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা, আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখমুজিবুর রহমানের সঙ্গে। ৬ মার্চ এও ঘোষণা করা হলো যে, ২৫ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদেরঅধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।
পরিস্থিতির চাপে ভীতসন্ত্রস্ত পূর্ব পাকিস্তান সামরিক সদর দপ্তর থেকে বিভিন্নভাবে শেখ মুজিবও আওয়ামী লীগকে এই মেসেজ দেয়া হয় যে, ৭ মার্চ যেন কোনোভাবেই স্বাধীনতা ঘোষণা নাকরা হয়। ৭ মার্চ জনসভাকে কেন্দ্র করে কামান বসানো হয়। এমনকি আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি মেজর সিদ্দিক মালিক ৭ মার্চের জনসভার প্রাক্কালে আওয়ামী লীগকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, “পাকিস্তানের সংহতির বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা হলে তা শক্তভাবে মোকাবেলা করা হবে। বিশ্বাসঘাতকদের (বাঙ্গালীদের) হত্যার জন্য ট্যাংক, কামান, মেশিনগান সবই প্রস্তুত রাখা হবে। প্রয়োজন হলে ঢাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হবে। শাসন করার জন্য কেউ থাকবে না কিংবা শাসিত হওয়ার জন্যও কিছু থাকবে না।”
এমনি এক কঠিন সংকটময় পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ হুমকির জবাবে বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে দৃপ্ত ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
আঠারো মিনিট স্থায়ী এ ভাষণে ভাষণের মূল কয়েকটি দিক হচ্ছে- সামগ্রিক পরিস্থিতির পর্যালোচনা; নিজ ভূমিকা ও অবস্থান ব্যাখ্যা; পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিকদের ভূমিকার ওপর আলোকপাত; সামরিক আইন প্রত্যাহারের আহ্বান; অত্যাচার ও সামরিক আগ্রাসন মোকাবেলার হুমকি; দাবি আদায় না-হওয়া পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে সার্বিক হরতাল চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা এবং নিগ্রহ ও আক্রমণ প্রতিরোধের আহ্বান।
৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু নির্যাতিত বাঙ্গালীকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে একপ্রকার নিরস্ত্র বাঙ্গালী জাতি স্বাধীনতা আদায়ের ব্রত নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাই এ ভাষণের যেমন ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে; তেমনই রয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ওই ভাষণের উজ্জীবিত হয়েই বাঙ্গালী জাতি ৯ মাস স্থায়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিল।

(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৫ মার্চ ২০২১ প্রকাশিত)