বুধবার, ১৬-জুন ২০২১, ০৪:০৩ অপরাহ্ন

ফিলিস্তিনিরাই পরবর্তী যুদ্ধের সূচনা করতে পারে, ইসরাইল কি প্রস্তুত

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৬ মে, ২০২১ ০৬:১০ অপরাহ্ন

ড. সোহেল আহম্মেদ: এবারের মূল যুদ্ধটা আলটিমেটাম দিয়ে শুরু করেছিল গাজার ফিলিস্তিনিরাই। প্রথমে পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জাররায় উচ্ছেদ তৎপরতা ও মসজিদুল আকসায় হামলা বন্ধের আলটিমেটাম দেয় গাজার ফিলিস্তিনি সংগ্রামীরা। সেই আলটিমেটাম পার হলে ইসরাইল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে গাজা।

যুদ্ধ শুরুর শক্তি

গাজা থেকে মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হতচকিত হয়ে পড়ে ইসরাইলিরা। হামলার শিকার না হয়েও গাজা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সাহস দেখাবে ইসরাইল তা ভাবতেও পারেনি। গত দুই বছরে গাজা যে দীর্ঘ মেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে তা টের পায়নি ইসরাইলের গোয়েন্দারা। এ কারণে যুদ্ধের শুরুতেই ইসরাইলের সরকার ও সামরিক বাহিনীতে উত্তেজনা দেখা দেয়। এই ব্যর্থতার জন্য গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদকে চিহ্নিত করা হয়। ব্যর্থতার দায় নিয়ে মোসাদ প্রধান সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। সব কিছু কেড়ে নিয়ে গত ৭৩ বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্মম হত্যা ও নৃশংসতা চালাচ্ছে ইসরাইল। এই দখলদার শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার। তাদেরকে তাড়ানোর লক্ষ্যে যুদ্ধ শুরু করতে নতুন কোনো কারণ ও অজুহাত খুঁজতে হবে না ফিলিস্তিনিদের। শক্তি অটুট থাকলে গাজাই হয়তো ইসরাইলের বিরুদ্ধে পরবর্তী যুদ্ধের সূচনা করবে।

ফিলিস্তিনিদের নয়া যুদ্ধ কৌশল

যুদ্ধের কৌশলে মার খেয়েছে ইসরাইল। রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে মার্কিন অর্থ সহযোগিতায় ইসরাইল প্রায় দুই দশক আগে তৈরি করেছে আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এটাকে নিয়ে ইসরাইল সব সময় গর্ব করে। এবারের যুদ্ধে এই আয়রন ডোমকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে ফিলিস্তিনিরা। গাজার প্রতিরোধ যোদ্ধারা একসঙ্গে এত বেশি  রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে যে, সবগুলোকে আকাশে ধ্বংসের সময় ও সুযোগ পায়নি আয়রন ডোম। এর ফাঁকে অনেক ক্ষেপণাস্ত্র গিয়ে আঘাত হেনেছে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। ফিলিস্তিনিদের যুদ্ধের একটা কৌশলেই এবার ধরা খেয়ে যায় ইসরাইল। ফিলিস্তিনিরা যুদ্ধের প্রথম দিকেই সাধারণ মানের পুরনো রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে আয়রন ডোমকে ব্যতিব্যস্ত করে ফেলে। এসব সাধারণ রকেট ধ্বংস করতেই আয়রন ডোম খুইয়ে ফেলে বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র। ফিলিস্তিনিদের স্বল্প মূল্যের একেকটি রকেট ধ্বংস করতে আয়রন ডোম থেকে ছুড়তে হয়েছে প্রায় ৭০ লাখ টাকা মূল্যের একেকটি ক্ষেপণাস্ত্র। চার হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের একাংশ ধ্বংস করতে গিয়ে আয়রন ডোমের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এখনই নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু হলে ইসরাইল আয়রন ডোমগুলো সচল রাখতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পরপরই গাজার ২৫০টি পয়েন্টে হামলা চালিয়ে সব কিছু উলটপালট করে দেওয়ার পরিকল্পনা করে ইসরাইল। সে অনুযায়ী ২৫০টি পয়েন্টে বিমান হামলা চালায় তারা। কিন্তু এরপরও গাজা থেকে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্রতা একটুও কমেনি। কারণ পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা দ্রুত তাদের সামরিক অবস্থান পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়। ইসরাইলের কাছে ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের অবস্থান ও ঘাঁটি সংক্রান্ত যে গোয়েন্দা তথ্য ছিল তা নিখুঁত ছিল না। এর ফলে যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি দ্রুতই বুঝতে পারে তেল আবিব। তারা দ্রুতই যুদ্ধবিরতির জন্য কাতার ও মিশরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের শর্তগুলো মেনে নেওয়ার আগে গাজায় বেসামরিক মানুষ হত্যা ও মিডিয়া দপ্তরসহ কিছু বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংসের মাধ্যমে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর চেষ্টা করেছে ইসরাইলের যুদ্ধবাজ নেতারা।

ফিলিস্তিনিদের সামরিক শক্তি ও ঐক্যের মহড়া

এবারের গাজা যুদ্ধে মূলত সামরিক শক্তি ও ঐক্যের মহড়া দিয়েছে ফিলিস্তিনিরা। নানা পাল্লার নতুন নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে নিজেদের সামরিক শক্তির প্রমাণ তুলে ধরেছে তারা। রাজধানী তেল আবিবসহ গোটা ইসরাইলই যে ফিলিস্তিনিদের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় রয়েছে এটা এবারই প্রথম জানতে ও দেখতে পেরেছে দখলদার শক্তি। ফিলিস্তিনিদের ক্ষেপণাস্ত্রের ভয়ে ৫০ লাখ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে সময় কাটিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে স্থান সংকুলানে হিমশিম খেতে হয়েছে ইসরাইলের সরকারকে। কারণ ইসরাইলের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর ধারণ ক্ষমতা ৩০ লাখ মানুষের বেশি নয়।

গাজায় রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রতিরোধ সংগঠন। এসব সংগঠন এবার যৌথ কমান্ড সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে সেখান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। এবার গাজা নিজের জন্য যুদ্ধে জড়ায়নি তারা যুদ্ধে জড়িয়ে শেখ জাররাহ ও বায়তুল মুকাদ্দাস রক্ষার জন্য। এ কারণে ইসরাইলের ভেতরে বসবাসকারী আরব মুসলমানেরাও গাজার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছে। ইসরাইলের ভেতরে আরব মুসলমানদের মধ্যে এক গণঅভ্যুত্থান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তারা ইসরাইলের দখলদারি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ফুসে ওঠে। ইহুদি ও মুসলমানের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। ইসরাইল ও ফিলিস্তিনে বসবাসকারী সব মুসলমান ঐক্যের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবার।

আগ্রাসী প্রতিবেশীর মোকাবেলায় আত্মরক্ষার এক নয়া মডেল

বৃহৎ ও আগ্রাসী প্রতিবেশী দেশগুলোর মোকাবেলায় লড়াই করে টিকে থাকার এক নতুন মডেল হয়ে উঠেছে গাজা। স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের এক বড় মজুদ ও অকুতোভয় একদল সেনাই যে প্রবল সামরিক শক্তির অধিকারী বড় প্রতিবেশীর আগ্রাসন ঠেকাতে যথেষ্ট তা প্রমাণ করেছে গাজা। নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রেখে সেখানে স্থল অভিযান চালানোর শক্তি-সাহসও ইসরাইলিদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে গাজাবাসীরা। একদিকে গাজায় ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের অবস্থান সম্পর্কে সঠিক গোয়েন্দা তথ্যের অভাব আর অন্যদিকে ২০০৯ সালের তিক্ত অভিজ্ঞতা ইসরাইলকে স্থলযুদ্ধের ঝুঁকিপূর্ণ পন্থা অবলম্বন থেকে দূরে রেখেছে। ফিলিস্তিনিরা যুদ্ধের প্রথম দিকেই ইসরাইলের সামরিক গাড়িতে কোরনেট ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত হেনে আগ্রাসীদের বুঝিয়ে দেয় গাজায় ঢুকলে ফিরতে হবে কফিনে করে।

সংগ্রামের শক্তির অন্য এক উৎস

মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান ও প্রথম কিবলা মসজিদুল আকসা দখল করে রেখেছে ইসরাইল। মসজিদুল আকসা হয়েই মেরাজে গিয়েছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (স.)। এছাড়া ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবতার ওপর যে জুলুম চালানো হচ্ছে তা ইতিহাসে বিরল। এই অন্যায় ও জুলুম মেনে নেওয়া মানে গোটা মানব জাতির অপমান ও অবমাননাকে সহ্য করা। এরপরও ফিলিস্তিনিদের একটা অংশ ইউরোপ,আমেরিকা ও দখলদারদের নানা প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করে চুক্তির মাধ্যমে তাদের সঙ্গে সহাবস্থানের চেষ্টা করেছে কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতিই রক্ষা করা হয় নি। এখনও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে দেওয়া হয়নি। শরণার্থীদের স্বদেশে ফেরার অধিকার মেনে নেওয়া হয়নি। গত ৭৩ বছরে ফিলিস্তিনিরা জবরদখল,হত্যা-নির্যাতন ও নিপীড়ন ছাড়া আর কিছুই পায় নি।

জুলুম-নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা প্রত্যেক মানুষের  ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। পবিত্র ইসলাম ধর্মও মানুষকে জুলুম ও অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার শিক্ষা দিয়েছে। আর এই শিক্ষাকে হৃদয়ে ধারণ করেই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে নির্যাতিত ফিলিস্তিনিরা। আজ তারা দখলবাজি,হত্যা-নির্যাতন ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল উপমা। তারা নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও জালিমের বিরুদ্ধে বুক ফুলিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সাহস রাখে। বুক পেতে দিতে পারে ঘাতকের গুলির সামনে। দুই পা হারানোর পর অন্য অঙ্গগুলোও সমর্পণ করতে পারে অবলীলায়। ঘাতকের বুলেট প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পরও মুখে লেগে থাকে অকৃত্রিম হাসি। এই হাসির উৎস হচ্ছে ঐশী প্রতিশ্রুতি। তারা জানে এই রক্ত বৃথা যাবে না। এই রক্তই নিশ্চিত করবে পরকালীন চিরস্থায়ী শান্তির আবাস, এরই ধারাবাহিকতায় একদিন এ জগতেও বইবে শান্তির সুবাতাস।