বুধবার, ১৬-জুন ২০২১, ০৫:৩৩ অপরাহ্ন
  • অর্থনীতি
  • »
  • ফারইস্টের দুর্নীতিতে জড়িতরা দৃশ্যমান: অর্থ মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ

ফারইস্টের দুর্নীতিতে জড়িতরা দৃশ্যমান: অর্থ মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৮ জুন, ২০২১ ১০:৪৯ অপরাহ্ন

শীর্ষনিউজ, ঢাকা: দীর্ঘদিন ধরে মন্দ ঋণ ও লোকসানের ভারে নিমজ্জিত শেয়ারবাজারে আর্থিক খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট।কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের কোনো ধরনের লভ্যাংশ দিচ্ছে না। মূলত আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে কোম্পানিটি বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বলে মনে করে অর্থ মন্ত্রণালয়। আর কোম্পানিটির দুরবস্থার পেছনে জড়িতদের অনিয়ম ও দুর্নীতি দৃশ্যমান বলে মনে করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পর্যবেক্ষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এ বিষয়টি শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) অবহিত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিএসইসি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের সামগ্রিক আর্থিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি এবং অত্যন্ত বড় অঙ্কের ঋণ রয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই বিভিন্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ। এমনকি পিকে হালদারের কোম্পানিকেও বড় অঙ্কের ঋণ প্রদান করা হয়েছে। আর কোম্পানিটির এ দুরবস্থার পেছনে সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান শামসুল ইসলাম ভরসা, পূর্বতন চেয়ারম্যান এম এ খালেক, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শান্তনু সাহা, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রফিকুল আলম, সাবেক উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাফিজুর রহমান, কোম্পানি সচিব নাজমুন নাহার প্রমূখ ব্যক্তিবর্গের চরম আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির মুখ্য ভূমিকা দৃশ্যমান।

মূলত ওই সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে গৃহীত ঋণের বিপরীতে সুদ প্রদানের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ পারস্পরিক যোগসাজশে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়াও ব্যক্তিগত বিভিন্ন খরচের বিল প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে যোগান দেওয়াসহ বিভিন্ন অবৈধ উপায়ে কোটি কোটি টাকা লোপাটের চিত্র পরিলক্ষিত হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয় পর্যবেক্ষনে বেরিয়ে এসেছে, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের পূর্বতন চেয়ারম্যান এম এ খালেকের মালিকানাধীন ফারইস্ট স্টকস অ্যান্ড বন্ডসের অনুকূলে পারস্পরিক যোসাজশে উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ বা ঋণ হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। একই উপায়ে বহুল আলোচিত পিকে হালদারের পিপলস লিজিংয়ে ৩৮ কোটি টাকাসহ এফএএস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি নামীয় প্রতিষ্ঠানে মোট ৫০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। বাস্তবতার নিরিখে উপরোক্ত ঋণের টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০০১ সালে ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৩ সালে কোম্পানিটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এরপর থেকে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা ভালোই ছিল। তবে ২০১৭ সাল থেকে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের কোনো ধরনের লভ্যাংশ দিচ্ছেন না। ফলে কোম্পানিটি ২০১৮ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে, যা এখনও বহাল রয়েছে। এর পর থেকে তিন বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও আর্থিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। কোম্পানিটির এ পরিস্থিতির জন্য সাবেক উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ব্যর্থতা দায়ী বলে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় মনে করে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. নাহিদ হোসেন বলেন, ‘বিএসইসিকে আমরা একটি চিঠি দিয়েছি। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার জন্য কিছু সুপাশি করা হয়েছে।’

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএসইসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি আমরা হাতে পেয়েছি। কমিশন সার্বিক দিক বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সান্তনু সাহা বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। তাই এ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করব না।’

তবে ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের কোম্পানি সচিব নাজমুন নাহার বলেন, ‘আমি বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার। কোম্পানি সচিবের দায়িত্ব পালন করার কারণে আমি অথরাইজড সিগনেটরি ছিলাম। তাই বেশ কিছু জায়গায় আমার স্বাক্ষর থাকতে পারে। তবে আমি ব্যক্তিগত স্বর্থ হাসিলের জন্য একটি টাকাও হেরফের করি নাই। তাই দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে বিষয়টি উন্মোচনের দাবি জানাচ্ছি।’
 
এদিকে ফাররইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান শামসুল ইসলাম ভরসা ও পূর্বতন চেয়ারম্যান এম এ খালেকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তারা মোবাইল ফোন ধরেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফাররইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী জারিয়াব বলেন, ‘বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে সরকারের যে কোনো পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই।’

প্রসঙ্গত, ১৬৪ কোটি ৬ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ১১৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঋণাত্মক রিজার্ভ রয়েছে। আর কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ১৬ কোটি ৪০ লাখ ৬৩ হাজার ৩৩০টি। এর মধ্যে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত উদ্যোক্তা পরিচালকদের ৪১.৮৮ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ১২.৪২ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ০.০৫ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৪৫.৬৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। বুধবার (৮ জুন) কোম্পানিটির শেয়ার সর্বশেষ ৩.৮০ টাকায় লেনদেন হয়েছে।

শীর্ষনিউজ/আরএইচ