শনিবার, ২৭-ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৬:৩৭ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম, খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতর জড়িত 

মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম, খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতর জড়িত 

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৯:২০ অপরাহ্ন

শীর্ষনিউজ প্রতিবেদক: স্বাস্থ্য অধিদফতরের অধীনে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও মেডিকেল টেকনিশিয়ান নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এর সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কয়েকজন কর্মচারী এবং কর্মকর্তাও জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে পরীক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সরকারের শীর্ষমহলে লিখিতভাবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেশ করা হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের। 
মেডিকেল টেকনোলোজিস্টের ৮৮৯টি পদ এবং মেডিকেল টেকনিশিয়ানের বিভিন্ন গ্রুপের ১৮০০ পদের বিপরীতে মোট ৭২ হাজার ৬১৫ জন চাকরিপ্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। ১২, ১৮ ও ১৯ ডিসেম্বর তিন দিনে এই নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানীর ১৩টি স্কুলে পরীক্ষাগুলো নেয়া হয়। কিন্তু পরীক্ষা কেন্দ্র ম্যনিপুলেট করে পূর্ব নির্র্ধারিত পরীক্ষার্থীদের বিশেষ সুবিধা দেয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষা কেন্দ্রে কোনো রকমের ডিভাইস নেয়া যাবে না মর্মে নির্দেশনা থাকলেও সেটি মানা হয়নি। কোনো কোনো চাকরিপ্রার্থীকে মোবাইল ফোন নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢুকতে দেখা যায়। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বাইরে পাঠিয়ে প্রশ্নের উত্তর লিখতে সহায়তা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। 

জানা গেছে, খিলগাঁও গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ, খিলগাঁও মডেল কলেজ, বাড্ডা আলাতুন্নেছা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, রামপুরা একরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং তেজগাঁও আদর্শ স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয়। লিখিত পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ এনে চাকরিপ্রার্থীরা ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সামনে বিক্ষোভও করেছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কয়েকজন কর্মচারী ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকসহ সরকারের শীর্ষমহলে লিখিতভাবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করা হয়েছে চাকরিপ্রার্থীদের পক্ষ থেকে। লিখিত অভিযোগে নিয়োগ কমিটির সদস্যসচিব স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক (প্রশাসন) ড. আফম আখতার হোসেন ছাড়াও তিনজন কর্মচারীর নাম উল্লেখ করা হয়। এরা হলেন, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, মহাখালীর মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. আশিকুর রহমান ও মো. আওলাদ হোসেন এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক মো. মহব্বত হোসেন। 
অভিযোগে বলা হয়, দুর্নীতিবাজ চক্রটি বিভিন্ন দালালের মাধ্যমে প্রতিটি নিয়োগের জন্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছে। লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় পাশের কথা বলে এই টাকা নেয়া হচ্ছে। দালাল চক্রটি লিখিত পরীক্ষার আগে এমন কথা বাইরে প্রচার করেছে যে, যারা টাকা দিয়ে গোপন তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করবে শুধু তারাই চাকরি পাবে। ফলে চাকরি প্রার্থীরা অনেকেই বাধ্য হয়েছেন এদের হাতে ধরা দিতে।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, মহাখালীর মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. আওলাদ হোসেনের গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জে অর্থাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের এলাকায়। জাহিদ মালেকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা প্রচার করতে গিয়ে আওলাদ হোসেন নিজের ফেইসবুক পেইজে বেশ কয়েকটি ছবিও কিছুদিন আগে পোস্ট করেছেন। জাহিদ মালেকের সঙ্গে একান্তভাবে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ানোর ছবি এগুলো। এসব ছবি প্রকাশ করেছেন মূলত চাকরিপ্রার্থীদেরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করার জন্যই, এমন তথ্য জানিয়েছেন সংশিষ্টরা।
উল্লেখ্য, ১২ বছর পর মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দিতে যাচ্ছে সরকার। এর আগে গত জুনে বিশেষ বিবেচনায় সরাসরি ১৪৫ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হলেও পরীক্ষার মাধ্যমে ২০০৮ সালের পর এবারই প্রথম ৮৮৯ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ পেতে যাচ্ছে। মেডিকেল টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেয়া হবে ১৮০০। মেডিকেল টেনোলজিস্ট পদের জন্য লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় গত ১২ ডিসেম্বর। এতে অংশ নেন ২৩৫২২ জন চাকরিপ্রার্থী। বিভিন্ন গ্রুপে মেডিকেল টেকনিশিয়ান পদের জন্য ১৮ ডিসেম্বর ৩৩০৫৭ জন এবং ১৯ ডিসেম্বর ১৬০৩৬ জন চাকরিপ্রার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন।

গত জুন মাসে কোনো রকমের নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই বিশেষ বিবেচনায় যে ১৪৫ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেয়া হয় তাতে ব্যাপক ঘুষ লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তখন মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রকৃত মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের বাদ দিয়ে তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়। এমনকি সে সময় নিয়োগ সংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের কথোপকথন সংবলিত একটি অডিও রেকর্ডও ফাঁস হয়। তখন এ নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করে টেকনোলজিস্টদের সংগঠনগুলো। এরপর তড়িঘড়ি করে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
নিয়োগ কমিটির সদস্যসচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক (প্রশাসন) ড. আফম আখতার হোসেনের কাছে নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি এসব অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেন। 
উপপরিচালক আফম আখতার হোসেন এ বিষয়ে নিয়োগ কমিটির সভাপতি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. হাসান ইমামের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। কিন্তু ডা. হাসান ইমামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। 
ডা. শেখ মোহাম্মদ হাসান ইমাম ইতিপূর্বে ঢাকা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক পদে ছিলেন। সেখান থেকে গত ৯ আগস্ট তাকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) পদে পদায়ন করা হয়। আগের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো বেলাল হোসেনকে দুর্নীতির অভিযোগে সরিয়ে হাসান ইমামকে এই পদে পদায়ন করা হয়। কিন্তু হাসান ইমাম এই পদে এসে ইতিমধ্যেই অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। তিনি ঢাকার বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে নিজের পছন্দের ও অনুগত কয়েকজন কর্মচারীকে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এনে স্বাস্থ্য অধিদফতরে পদায়ন করেছেন। এ নিয়ে খোদ অধিদফতরের কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি যাদেরকে তার আগের বিভাগীয় কার্যালয় থেকে অবৈধভাবে স্বাস্থ্য অধিদফতরে পদায়ন করেছেন এরা দুর্নীতিবাজ বলে অভিযোগ রয়েছে।  
ওআর/