মঙ্গলবার, ২০-এপ্রিল ২০২১, ০৮:১৮ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন: দুপুরের পর এত ভোট!

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারী, ২০২১ ১১:৩২ পূর্বাহ্ন

শীর্ষ নিউজ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচন শেষ হলেও এখনও আলোচনায় আছে ভোট। তিনটি বিষয় আলোচিত হচ্ছে সর্বমহলে। গতবারের তুলনায় এবার ভোটার উপস্থিতি কম হওয়া, দুপুরের পর হঠাৎ করে ভোটের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং প্রধান দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান বেশি হওয়ার বিষয়টি এখন টক অব দ্য চট্টগ্রাম। 
নির্বাচন কমিশন থেকে চূড়ান্ত হিসাব না পেলেও ৭৩৫ ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অর্ধশত কেন্দ্রে সরেজমিনে ঘুরে ভোটের দুই রকম চিত্র দেখতে পেয়েছে গণমাধ্যম।
চট্টগ্রাম টিচার্স ট্রেনিং কলেজ কেন্দ্র। এখানে বুথের সংখ্যা ৯টি। ভোটার তিন হাজার ৪৭৯ জন। প্রথম এক ঘণ্টায় ভোট পড়েছে মাত্র ২৩টি। একাডেমিক ভবন-২ ভোটকেন্দ্রের একটি বুথে ৪০৯টি ভোটের মধ্যে প্রথম এক ঘণ্টায় ভোট পড়েছে মাত্র একটি। প্রশাসনিক ভবন কেন্দ্রের একটি বুথে ৩৩৬টি ভোটের মধ্যে প্রথম চার ঘণ্টায় ভোট পড়েছে মাত্র ছয়টি। ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডের রাবেয়া বসরি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার তিন হাজার ৩৪২ জন। 
প্রথম চার ঘণ্টায় এখানে ভোট পড়েছে ৪০০টি। কিন্তু পরের চার ঘণ্টায় বেড়ে যায় চার থেকে পাঁচ গুণ। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার তিন হাজার ৩১৮ জন। তৃতীয় তলার আটটি কক্ষে বুথ তৈরি করে পুরুষ ও নারীদের আলাদা করে ভোট নেওয়া হচ্ছিল। দুপুর পর্যন্ত এখানে ভোট পড়েছিল প্রায় সাড়ে চারশ। কিন্তু পরের চার ঘণ্টায় এখানেও চার গুণ বেড়ে যায় ভোটের সংখ্যা।
ভোট শুরুর প্রথম চার ঘণ্টায় গড়ে ভোট পড়েছে মাত্র ৪ থেকে ৬ শতাংশ। কিন্তু পরের চার ঘণ্টায় ভোটের এ হার হঠাৎ করে বেড়ে যায় কয়েক গুণ। ২০১৫ সালের নির্বাচনে মাত্র তিন ঘণ্টা ভোটের মাঠে থেকে বিএনপির মেয়র প্রার্থী এম মনজুর আলম ভোট পেয়েছিলেন তিন লাখের বেশি। এবার সারাদিন মাঠে থেকেও বিএনপির ডা. শাহাদাত হোসেন ভোট পেয়েছেন মাত্র ৫২ হাজার। 
আবার গতবারের বিজয়ী আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঙ্গে এম মনজুর আলমের ভোটের ব্যবধান ছিল এক লাখ ৭০ হাজার ৫২৪। কিন্তু এবারের বিজয়ী রেজাউল করিম চৌধুরীর সঙ্গে ডা. শাহাদাতের ভোটের ব্যবধান তিন লাখের বেশি। গতবার মোট ভোটারের ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট প্রদান করেছিলেন। এবার ভোটার সংখ্যা বাড়লেও ভোটদানের হার মাত্র ২২ দশমিক ৫২ শতাংশ।
হঠাৎ করে ভোট বেড়ে যাওয়া এবং ভোটের আকাশ-পাতাল এমন ফারাককে 'অবিশ্বাস্য' বলছেন বিশিষ্টজন। তবে আওয়ামী লীগ বলছে, বিএনপির জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে নেমেছে। এটিরই প্রতিফলন হয়েছে ভোটে। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, নির্বাচনকে তামাশায় পরিণত করেছে আওয়ামী লীগ। ভোটের আগে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে নির্বিঘ্নে ভোট ডাকাতি করেছে তারা।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন ও বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কথা বলেন তিনি। চলতি মাসে একটি জাতীয় দৈনিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, 'নির্বাচনকে উৎসবমুখর করতে হলে ত্রুটিপূর্ণ বর্তমান পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। সরাসরি মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন না দিয়ে কাউন্সিলরদের ভোটে মেয়র নির্বাচনের কথা বলেন তিনি। নির্বাচনের আগে এখন ভীতিকর একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়। এতে করে ভোটারদের মনে ভোট দেওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়।' মেয়রকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে না রেখে এটি বিকেন্দ্রীকরণ করার কথাও বলেন তিনি।
চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. আখতার কবির চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামে যে নির্বাচন হয়েছে, সেটি নিয়ে জনমনে অনেক প্রশ্ন আছে। ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেনি প্রশাসন। এ জন্য ভোটার উপস্থিতি এত কম। আবার প্রধান দুই দলের মেয়র প্রার্থীর ভোটের যে ব্যবধান দেখা যাচ্ছে, সেটিও সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। একটি দলের জনপ্রিয়তা কখনও বাড়তে পারে, কখনও কমতে পারে। কিন্তু সেটির একটি গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া আছে। নির্বাচন সম্পন্ন করাই কৃতিত্বের কাজ হতে পারে না। এটি বিশ্বাসযোগ্য করাই বড় চ্যালেঞ্জ।'
হঠাৎ করে দুপুরের পর ভোট বেড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুপুরের পর ফাঁকা ছিল বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্র। কিন্তু বেশির ভাগ ভোটই পড়েছে দুপুরের পর। এটি কীভাবে সম্ভব হলো, তা ব্যাখ্যা করা উচিত নির্বাচন কমিশনকে।' চট্টগ্রামের মতো একটি বড় শহরে মোট ভোটারের মাত্র ২২ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে যাওয়াকে নির্বাচন কমিশনের পরাজয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কমেছে ভোটার উপস্থিতি : ২০১৫ সালের নির্বাচনে ১৮ লাখের বেশি ভোটারের মধ্যে ভোট প্রয়োগ করেছিলেন আট লাখ ৬৮ হাজার ৬৬৩ জন। ভোট প্রয়োগের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ। এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ছিল ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৬ জন। ভোট দিয়েছেন মাত্র চার লাখ ৩৬ হাজার ৫৪৩ জন। ভোট প্রয়োগের হার মাত্র ২২ দশমিক ৫২ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় ২৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ কম। প্রাপ্ত ভোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ৮৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। 
বিএনপি পেয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট। সাড়ে ২২ শতাংশের মধ্যে আওয়ামী লীগই পেয়েছে ১৯ শতাংশ ভোট। বাকি ভোট পেয়েছেন অন্যান্য প্রতীকের প্রার্থীরা। তাদের মধ্যে ইসলামী ফ্রন্টের এম এ মতিন পেয়েছেন দুই হাজার ১২৬ ভোট। গতবার তিনি পেয়েছিলেন ১১ হাজার ৬৫৫ ভোট। ইসলামিক ফ্রন্টের প্রার্থী মুহাম্মদ ওয়াহেদ মুরাদ পেয়েছেন এক হাজার ১০৯ ভোট। 
গতবার একই দলের প্রার্থী হোসাইন মোহাম্মদ মুজিবুল হক শুক্কুর পেয়েছিলেন চার হাজার ২১৫ ভোট। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জান্নাতুল ইসলাম পেয়েছেন চার হাজার ৯৮০ ভোট। গতবার একই দলের ওয়ায়েজ হোসেন ভূঁইয়া পেয়েছিলেন ৯ হাজার ৬৬৮ ভোট। এ ছাড়া অন্যদের মধ্যে এবার এনপিপির আবুল মনজুর চার হাজার ৬৫৩ ভোট এবং স্বতন্ত্র খোকন চৌধুরী ৮৮৫ ভোট পেয়েছেন।
প্রধান দুই প্রার্থী যা বললেন : চট্টগ্রামে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়া ও হঠাৎ করে ভোটের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি আওয়ামী লীগের বিজয়ী প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী। তবে ভোটে জনমতের প্রতিফলন হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। 
রেজাউল করিম বলেন, আমার ওপর আস্থা রেখেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। আর প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থা রাখল চট্টগ্রামের জনগণ। বিপুল ভোটে বিজয়ী করে উন্নয়নের পক্ষেই রায় দিয়েছে চট্টগ্রামবাসী।

অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ১৫টি কেন্দ্রের অন্তত ৬০টি বুথে প্রবেশ করেছি আমি। প্রথম চার ঘণ্টায় সব কেন্দ্রে গড়ে ভোট পড়তে দেখেছি ৪ থেকে ৬ শতাংশ। কিন্তু পরের চার ঘণ্টায় কীভাবে এটি ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ হলো? দুপুরের পর নগরীর ভোটকেন্দ্রগুলো ছিল ফাঁকা। এ জন্য নির্বাচন কমিশন থেকে ঘণ্টাপ্রতি ভোট প্রয়োগের চিত্র চেয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত সেটি পাইনি।'

শীর্ষনিউজ/এসএফ