শুক্রবার, ০৫-মার্চ ২০২১, ০৪:০৭ অপরাহ্ন
সরকার বলছে ভুল তথ্যে রিপোর্ট, সত্যতা যাচাই চায় অন্যরা

আল জাজিরার প্রতিবেদনে ব্যাপক তর্ক-বিতর্ক

shershanews24.com

প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ১১:০২ পূর্বাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: বিদেশি একটি টেলিভিশনের রিপোর্ট বলা যায় পুরো রাষ্ট্রকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। গোটা দেশে তর্ক-বিতর্কেও তোলপাড় বয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক শক্তিমান টিভি চ্যানেল আল জাজিরা ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার ম্যান’ শিরোনামে গত ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের দু’সপ্তা পার হয়ে গেলেও এ প্রতিবেদনের নানা দিক ও তথ্য-উপাত্ত নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ, তর্ক-বিতর্ক। পক্ষে বিপক্ষে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সরকার সমর্থিত বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সরকারের একাধিক মন্ত্রী এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলার পর এ বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দাবি করেছেন সরকারের সমালোচকরা। দেশের মানুষও বিভ্রান্ত। কারণ মানুষ এ রিপোর্টটি প্রমাণের কোনো উদ্যোগ দেখাতে পাচ্ছেন না। তাছাড়া আন্তর্জাতিক অন্য সংবাদ মাধ্যমের পক্ষ থেকে এ রিপোর্টটি নিয়ে বিশ্লেষণ অব্যাহত রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের বক্তব্যের সপক্ষে তথ্য-প্রমাণ চাচ্ছেন মানুষ। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষে দালিলিক ব্যাখ্যা দাবি করেছেন বিশ্লেষকরা। অনেকেই বলছেন, আল জাজিরা যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তা ‘মিথ্যা হোক’ এটাই তারা চাচ্ছেন। কিন্তু প্রতিবেদনে যেসব তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়েছে তা ভুল, ফেক বলে প্রত্যাখ্যান করেই সরকার এ বিষয়ে দায় এড়াতে পারে না। কোনো রিপোর্ট তৈরি করতে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে রিপোর্টটিকে বিশ^াসযোগ্য করার জন্য যেমন তথ্য প্রমাণ দেখাতে হয়, তেমনি এ জাতীয় রিপোর্টকে মিথ্যা, ফেক, ভুল বললেই সেটি মানুষ বিশ্বাস করতে চাইবে না। ভুল প্রমাণেও প্রয়োজনীয় বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ দরকার হয়। আল-জাজিরার রিপোর্টের ক্ষেত্রেও বিশ্লেষক, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও দেশবাসী সরকারের সে ধরণের প্রমাণই চাচ্ছেন। গত ১ ফেব্রুয়ারি আল জাজিরা এ রিপোর্টটি প্রকাশের পর তা নিয়ে দেশের প্রায় সব গণমাধ্যম সরকারের প্রতিবাদ-বিবৃতি প্রচার করলেও নানা কারণে রিপোর্টটিতে যা উল্লেখ করা ছিল সেটি প্রকাশ করেনি। বাংলাদেশের প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো এ বিষয়ে খুব বেশি বিশ্লেষণে না গেলেও ইশারা-ইঙ্গিতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলে ও দেশের বেসরকারি টেলিভিশনের টকশো’তে অংশ নিয়ে কেউ কেউ এ রিপোর্টটি’র ওপর সরকারের বক্তব্যের সপক্ষে প্রমাণ চেয়েছেন। তবে বিশ্লেষক ও জনগণের চাওয়ায় গুরুত্ব না দিয়ে সরকার ‘আল জাজিরার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছে। এ নিয়ে সরকারের প্রতিনিধি, রাষ্ট্রদূত এবং আন্তর্জাতিক আইনজীবীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন।
ডয়চে ভেলে’র বিশ্লেষণ 
‘আল জাজিরার প্রতিবেদন: যেসব প্রশ্নের জবাব মিলছে না’, শিরোমানে একটি সংবাদ প্রকাশ করে জার্মান ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ডয়চে ভেলে। ডয়চে ভেলে’র প্রতিবেদনে বলা হয় “আল জাজিরার ডকুমেন্টারিতে অসঙ্গতি থাকলেও তা কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্মও দিয়েছে, সেগুলোর জবাব সরকারের পক্ষ থেকে আসেনি। ‘অভিযোগ উঠলেই ‘জামাত-শিবিরের ষড়যন্ত্র’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা থেকে বের হতে পারেনি সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভ্যারিফায়েড ফেসবুক পাতার একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে এ প্রতিবেদন নিয়ে। সেটিকেই শুরুতে বিশ্লেষণের চেষ্টা করছি। পরের অংশে আল জাজিরার প্রতিবেদন নিয়ে থাকছে কিছু কথা। প্রেস রিলিজের শুরুতেই কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই প্রতিবেদন ‘ভুয়া’ এবং ‘মানহানিকর’। সংবাদে পরিবেশন করা নানা তথ্য ও যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টা কোনো জবাব না দিয়ে প্রতিবেদনকে ‘ঠেস দেওয়া’ ‘ইঙ্গিতপূর্ণ’ ইত্যাদি বলা হয়েছে। কিন্তু এই প্রতিবেদনে কী ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে সেসব নিয়ে কোনো মন্তব্য নেই। যেসব প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর বিষয়েও কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। একজন পলাতক আসামি কিভাবে নির্বিঘ্নে আসা-যাওয়া করছেন, বিয়েতে যোগদান করছেন, সে বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো মন্তব্য আমরা এখনও জানি না। কিন্তু বেশ কয়েকবার বিজ্ঞপ্তিতে smear campaign অর্থাৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের কথা বলা হচ্ছে। রাষ্ট্রের কোনো সংস্থার এর সঙ্গে সংযোগ থাকার কথা অস্বীকার করা হলেও যে ছবিগুলো তথ্যপ্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে প্রতিবেদনে, সেগুলো নিয়ে কোনো বিস্তারিত বক্তব্য আমরা জানি না। একই সঙ্গে আল জাজিরার বিরুদ্ধেও কিছু অভিযোগ আনা হয়েছে।  বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সরকারকে কক্ষচ্যূত করার লক্ষ্য নিয়ে সাজানো হীন রাজনৈতিক ছক বাস্তবায়নে আল জাজিরা নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। ’ কিন্তু কী সেই চক্রান্ত? এই প্রতিবেদনের পেছনে জামাত-শিবির বা রাষ্ট্রবিরোধী চক্রের জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ ছাড়া নিশ্চয়ই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এমন অভিযোগ করছে না। সেই প্রমাণ দেখতে চাই।”
ডয়চে ভেলে’র প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “এই প্রতিবেদনকে বাংলাদেশ সরকার ‘প্রত্যাখ্যান’ করছে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনো সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন তো প্রত্যাখ্যান বা গ্রহণের ব্যাপার না। সংবাদ মাধ্যমের কাজ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে অভিযোগ ও অন্যায় তুলে ধরা। গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব সেসব অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে দেখা। এমন প্রতিবেদনকে রাষ্ট্র ও সরকারকে সঠিক পথে চলতে সহায়তা করে।”
আল-জাজিরার প্রতিবেদন যদি তথ্য থাকত, সরকার ব্যবস্থা নিত: গওহর রিজভী
সাংবাদিক টিম সেবাস্টিয়ানের উপস্থাপনায় গত ১০ ফেব্রুয়ারি জার্মানির গণমাধ্যম ডয়চে ভেলেতে প্রচারিত টক শো ‘কনফ্লিক্ট জোন’-এ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। 
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরায় ১ ফেব্রুয়ারি প্রচারিত ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ শীর্ষক তথ্যচিত্র নিয়ে কথা বলেছেন গওহর রিজভী। ডয়চে ভেলে বাংলায় প্রকাশিত অংশটুকু হুবহু তুলে ধরা হলো:
 টিম সেবাস্টিয়ান: আল-জাজিরা চলতি মাসে একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে আপনার দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিস্মিত হওয়ার মতো দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। আর আপনার সরকার ত্বরিত প্রতিক্রিয়ায় ওই তথ্যচিত্রকে মিথ্যা, মানহানিকর ও অপপ্রচার বলে আখ্যা দিয়েছে। অথচ আপনারা প্রথমে তদন্তের কথা ভাবেনওনি। এটা সৎ সরকারের প্রতিক্রিয়া হয়নি, তাই নয় কি?
গওহর রিজভী: তদন্ত চলছে। তদন্ত করা হচ্ছে। আন্তরিকতার সঙ্গে আপনাকে বলতে চাই, তথ্যচিত্রের শিরোনাম ছিল ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’। আর আমাদের বলা হলো যে এতে প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে হওয়া দুর্নীতি প্রকাশ করা হবে। আপনি কি আসলেই বিশ্বাস করেন যে এই তথ্যচিত্রে তা করা হয়েছে? সেখানে কি এমন একটি প্রমাণও আনতে পেরেছে, যাতে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা যায়? সে কারণে আমি মনে করি, সচেতন একাডেমিক ও সাংবাদিক হিসেবে আমাদের পেছনে ফিরে তাকিয়ে নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে, প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিতে জড়িয়ে থাকার কী প্রমাণ দেওয়া হয়েছে? তারপরও এই তথ্যচিত্রে শাসনব্যবস্থা কত দুর্নীতিগ্রস্ত, তা দেখানো হয়েছে বলে বলা হচ্ছে।
টিম সেবাস্টিয়ান: তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে যে আল-জাজিরা হত্যার দায়ে অভিযুক্ত দুজন পলাতক আসামির অবস্থান নির্ণয়ে সক্ষম হয়েছে। দুই আসামির ভাই আপনাদের সেনাবাহিনীর প্রধান

জেনারেল আজিজ আহমেদ। এটা আপনাদের জন্য বড় অস্বস্তির, তাই নয় কি?
গওহর রিজভী: অবশ্যই। কিন্তু অন্যদিকে আবার বলছি, আমি সবকিছু ডিফেন্ড করতে যাচ্ছি না। তবে আপনি যেভাবে আমাকে প্রশ্ন করেছেন, তাতে মনে হয় এটা প্রয়োজনীয়। একজন মানুষকে কি তার ভাইয়ের অপরাধ দিয়ে বিচার করা উচিত? আমার মনে হয়, আমাদের এই প্রশ্নটা জিজ্ঞাসা করা উচিত। এখন সেনাবাহিনীতে থাকা ভাইটি যদি তাঁর ভাইদের বিচার এড়াতে সাহায্য করেন, তাহলে এ অভিযোগ খুবই বৈধ হবে। অথচ যা ঘটেছে, তা এই ভদ্রলোক সেনাপ্রধান হওয়ার বহুদিন আগে ঘটেছে।
টিম সেবাস্টিয়ান: ঠিক আছে। তথ্যচিত্রে জেনারেল আজিজের ভাইদের বিষয়ে বিস্তারিত যা দেখানো হয়েছে, তা দেখুন। জেনারেল আজিজের ভাইদের মধ্যে দুজন—আনিস ও হারিস ১৯৯৬ সালের প্রতিদ্বন্দ্বী দলের এক ব্যক্তিকে হত্যায় অভিযুক্ত হন। তাঁরা দুজনই পালিয়ে যান। আর তাঁদের তৃতীয় ভাই জোসেফও অভিযুক্ত হয়েছিলেন এবং তিনি ১০ বছরের বেশি সময় মৃত্যুদ  মাথায় নিয়ে কারাগারে ছিলেন। তিনি কোন জাদুবলে আজিজ আহমেদ সেনাপ্রধান হওয়ার কিছু আগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পান—এটা কীভাবে হলো? এটা কি বাংলাদেশে স্বাভাবিক যে সেখানে রাস্তায় বিরোধীদের ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়?
গওহর রিজভী: মি. সেবাস্টিয়ান, আপনি এমন নিশ্চিত ভাব নিয়ে কথা বলছেন, তা আমাকে অবাক করছে। আপনি সেনাপ্রধানের নিয়োগ ও তাঁর ভাইয়ের মুক্তির বিষয়টি একই সঙ্গে জড়াচ্ছেন। আমি আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাই...(এ সময় টিম সেবাস্টিয়ান বলেন, অবশ্যই একই ঘটনা)। না, না, না, না...
টিম সেবাস্টিয়ান: আমার কথা হলো, ঠান্ডা মাথায় হত্যার জন্য ক্ষমা পেতে একটি ভালো যোগাযোগ থাকতে হবে, তাই না?
গওহর রিজভী: আমাকে প্রকৃত তথ্যটা বলতে দিন। আপনি তারপর দয়া করে উপসংহার টানুন। তাঁর যে ভাইকে নিয়ে কথা হচ্ছে, তিনি প্রায় ২০ বছর কারাগারে ছিলেন। আমাদের দেশে একটা আইন আছে, একটা নির্দিষ্ট সময় কারাভোগের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্যারোলে মুক্তি বা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেতে পারেন। এসব কিছু অনেক আগে ঘটেছে। তাঁর ভাই সেনাপ্রধান হয়েছেন, সেটা আলাদা ঘটনা। এই মানুষটি ৩৫ বছর সশস্ত্র বাহিনীতে ছিলেন, একেবারে ক্লিন রেকর্ড নিয়ে কাজ করেছেন। তাহলে আমরা কেন এ দুটি ঘটনাকে একসঙ্গে জড়াব এবং কুৎসা রটাব? দুই ঘটনার মধ্যে ছয় মাসের পার্থক্য। 
টিম সেবাস্টিয়ান: ওকে, ঠিক আছে ড. রিজভী। তথ্যচিত্রে এটাও দেখানো হয়েছে যে আপনাদের সেনাপ্রধান খুব ভালোভাবেই জানতেন যে তাঁর পলাতক দুই ভাই কোথায় আছেন। কিন্তু তিনি তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাননি। এটা তদন্ত করার মতো বিষয় নয়?
গওহর রিজভী: এটা তদন্ত করার মতো হবে। কিন্তু আমি যা জানি, আপনিও তাই জানেন’ এই দুই ব্যক্তি বাংলাদেশের আওতার বাইরে ছিলেন। এরপরও তাঁদের তথ্য যদি আমাদের কাছে থাকত, তাহলে ওই দুই দেশের সঙ্গে আমাদের বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলে আমরা তাঁদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতাম। আসলে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা তা করেছি। এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে আমরা তা করতাম না। সত্যিই সরকারের কাছে যদি এই তথ্য থাকত, তাহলে সরকার ব্যবস্থা নিত।
সরকারি দলে তীব্র প্রতিক্রিয়া
গত ১ ফেব্রুয়ারি আল জাজিরার রিপোর্টটি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে সরকার। ১ ফেব্রুয়ারি ওই রিপোর্টটি প্রকাশের পরপরই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কড়া প্রতিবাদ জানায়। পরে সেনাসদর দপ্তরের তরফে ২ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ জানানো হয়। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ প্রভাবশালী মন্ত্রীদের কয়েকজন এ সংবাদ প্রকাশের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। ওই প্রতিবেদনটি ফেক ও ভুল তথ্যে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করা হয় সরকারের তরফ থেকে। সর্বশেষ গত ১২ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, এই রিপোর্টের নেপথ্যে কারা তাদের খুঁজে বের করা হবে। 
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে বলেন, মিথ্যা তথ্য প্রচারের জন্য আল জাজিরার বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করবো। দেখি কীভাবে কী করা যায়। যেসব ভুল তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে সে বিষয়ে নিশ্চয়ই আমরা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবো। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিবেদনটি মিথ্যা, সম্মানহানিকর এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রচারণা বলে অভিহিত করে তা প্রত্যাখ্যান করে। আল জাজিরার প্রতিবেদনকে ‘ফেক নিউজ’ আখ্যা দিয়ে এটি প্রচারের জন্য তাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত মন্তব্য করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আল জাজিরা আরো কয়েকটি পর্ব দেখাবে বলে শুনেছি। সরকার আইনি পদক্ষেপের কথা ভাবলেও আল জাজিরার প্রতিবেদন আটকে দেওয়ার কোনো চিন্তা নেই জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে কেউ চাইলেই আল জাজিরা দেখতে পারে না। এটি দেখতে হলে অপারেটরদের আলাদাভাবে পয়সা দিয়ে কানেকশন নিতে হয়। অনেক দেশে তারা সম্প্রচার করতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশে তাদের সমপ্রচার বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। কারণ বিশ্ব উন্মুক্ত। তবে আমরা আশা করবো প্রতিবেদন প্রচারে আল জাজিরা আরো দায়িত্বশীল হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আল জাজিরার প্রতিবেদন উদ্দেশ্যমূলক ও অপপ্রচারের নোংরা বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করছে, সরকারের সমালোচনাও করছে, দেশের এত ‘ভাইব্রেন্ট এবং অ্যাক্টিভ মিডিয়া’ যেখানে কোনো ধরনের তথ্য পায়নি সেখানে আল জাজিরা টেলিভিশন শেখ হাসিনাকে নিয়ে অসত্য তথ্য প্রচার অত্যন্ত নিন্দনীয়। মন্ত্রী তার সরকারি বাসভবনে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমন কথা বলেন। 
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, বিদেশি মিডিয়ার স্লট ভাড়া করে একটি চিহ্নিত চক্র দেশবিরোধী অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি এদের বিরুদ্ধে সজাগ ও সতর্ক থাকতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। ৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক সভায় তিনি একথা বলেন। তথ্যমন্ত্রী বলেন, যারা যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছে, মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলেছিল, স্বনামধন্য একজন আইনজীবীর মেয়ের ইহুদি জামাতাসহ স্বাধীনতাবিরোধী জামাত চক্র, যারা আজ দেশের মানুষের কাছে নিন্দিত, ঘৃণিত, ধিকৃত ও বর্জিত, তারা এখন তাদের অর্থ-বিত্ত দিয়ে মানুষ ভাড়া করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার স্লট ভাড়া করে, মানুষ ভাড়া করে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার মেন’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, এটি তথ্যভিত্তিক নয়, হলুদ সাংবাদিকতা। তিনি বলেন, আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আইএসপিআর ওই প্রতিবেদনের জবাব দিয়েছেন। প্রতিবেদনটি তথ্যভিত্তিক নয়। এটা হলুদ সাংবাদিকতা। এগুলো সাংবাদিকতার নর্মসের ভেতরে পড়ে না। তিনি আরো বলেন, আমি মনে করি, যারা এটা করেছে তাদের একটি উদ্দেশ্য ছিল। সে উদ্দেশ্য নিয়ে তারা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছেন। আমরা মনে করি এগুলো ভিত্তিহীন এবং দেশবিরোধী একটি ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ। 
আল-জাজিরার সম্প্রচার নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি), ঢাকা কেন্দ্রের নির্বাহী কমিটি। এক বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘আল-জাজিরা বহু আগে থেকেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করে চলেছে। জঙ্গিবাদকে উসকে দেওয়ার কাজও তারা সুচারুভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে। এবার তারা বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার ধারা ব্যাহত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, আল-জাজিরা কর্তৃক বাংলাদেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র অতীতের মতো ভবিষ্যতেও রুখে দেবেন দেশের সচেতন নাগরিকরা।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা-বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও মানহানিকর’ আল-জাজিরার প্রামাণ্যচিত্র প্রচারের প্রতিবাদে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি), ঢাকা কেন্দ্রের নির্বাহী কমিটি ও কাউন্সিলের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা জানানো হয়।
তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে আইএসপিআর
কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল জাজিরায় প্রচারিত ‘অল দ্যা প্রাইম মিনিস্টার্স মেন’ প্রতিবেদনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। ২ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বিকালে আইএসপিআরের সহকারী পরিচালক রাশেদুল আলম খানের পাঠানো এক বিবৃতিতে এই প্রতিবাদ জানানো হয়। বিবৃতিতে আল জাজিরার প্রতিবেদনটির মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হচ্ছে অভিযোগ করে আইএসপিআর বলেছে, দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করার অসৎ উদ্দেশ্যে এ প্রতিবেদন করা হয়েছে। যারা আগেও দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করেছে, তারাই এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। প্রতিবেদনে ইসরায়েল থেকে মোবাইলে নজরদারি প্রযুক্তি কেনার যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা পুরোপুরি ভুল বলে অভিহিত করেছে আইএসপিআর। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জাতিসংঘের একটি শান্তিরক্ষী মিশনের জন্য হাঙ্গেরি থেকে এ প্রযুক্তি কেনা হয়। এছাড়া প্রতিবেদনে দেখানো আরও নানা বিষয়েও প্রতিবাদ জানিয়েছে আইএসপিআর।
বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা চায় বিরোধীরা 
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরায় প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এ ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দাবি করেছে বিএনপি। ৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই দাবি জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গত ১ ফেব্রুয়ারি আলজাজিরা ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স মেন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা বাংলাদেশের আপামর জনগণকে বিব্রত ও উৎকণ্ঠিত করেছে। জনগণের ওই অনুভূতির সাথে বিএনপিও গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।’ এতে বলা হয়, ‘জনগণের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিটি অভিযোগের প্রকৃত ব্যাখ্যা দেওয়ার বদলে সরকার তার প্রতিবাদ বিবৃতিতে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের আড়ালে তা নাকচ করার চেষ্টা করেছে, যা জনগণকে আরও বেশি উদ্বিগ্ন করেছে ও প্রচারিত অভিযোগ সম্পর্কে তাদের উৎকণ্ঠাকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিএনপির বিবৃতিতে বলা হয়, এ দেশের মানুষের সঙ্গে বিএনপিও ওই প্রতিবেদনে উল্লিখিত প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে সরকারের নিকট থেকে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। আল জাজিরায় বাংলাদেশ নিয়ে যে তথ্যচিত্র প্রচার হয়েছে, তা মিথ্যা প্রমাণ করতে সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মেয়র মির্জা আব্বাস। ৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক প্রতিবাদ সভায় এ চ্যালেঞ্জ জানান তিনি। এ সময় মির্জা আব্বাস বলেন, ‘এই সরকারকে বলতে চাই, আপনারা প্রমাণ করুন আল জাজিরায় যা কিছু আছে, সব মিথ্যা। আমরা আপনাদের সমর্থন দেব।’
আল জাজিরায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে সরকারকে ‘সুন্দরভাবে জবাব’ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করিম। ৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এক সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আল জাজিরা যে তথ্য প্রকাশ করেছে, এখন দেশের যত দায়িত্বশীল, একজনেরও হুঁশ আছে? ওদিকে দেখেন জাতিসংঘ আবার এটার ব্যাখ্যা চাইছে। তামাম বিশ্বে আমরাও তো আসলে লজ্জিত।
জাতিসংঘের মাধ্যমে তদন্ত চায় বিএনপি
বাংলাদেশকে নিয়ে আল জাজিরায় প্রচারিত প্রতিবেদনে যে সব অভিযোগ তোলা হয়েছে, জাতিসংঘের মাধ্যমে তার তদন্ত চেয়েছে বিএনপি।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি গুলশানে দলীয় চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে দলের বক্তব্য উপস্থাপন করেন স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন। উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং নির্বাহী কমিটির সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন ও চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব আবদুস সাত্তার।
খন্দকার মোশাররফ বলেন, আল জাজিরার প্রতিবেদনে যা এসেছে, তা ‘লাগামহীন সাগরসম দুর্নীতির একটি টিপ অব দ্য আইসবার্গ’। “৭টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা জাতিসংঘকে এই বিষয়ে তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে যে তদন্তের আহবান জানিয়েছে, এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তার প্রতি বিএনপি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করছে এবং জাতিসংঘকে তার নিজস্ব পদ্ধতিতে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগের বিষয়ে আশু তদন্তের আহ্বান জানাচ্ছে।”
আল জাজিরার প্রতিবেদন নিয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে বিএনপি নেতা বলেন, “আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই না করেই সরকার প্রতিবেদনটিকে ঢালাওভাবে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
“অথচ সঠিক তথ্যের প্রকাশই হচ্ছে ভুল তথ্যের জবাব। আর অপপ্রচার থেকে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের উপায়ও হচ্ছে আসল সত্য তুলে ধরা। কিন্তু সরকার প্রতিবেদনের মূল বিষয় বস্তু উহ্য রেখে খি ত তথ্য অথবা প্রান্তিক বিষয়ের উপর ভর করে ‘ষড়যন্ত্রের তত্ব’ প্রকাশ করে চলছে।”
খন্দকার মোশাররফ বলেন, “আল জাজিরার প্রতিবেদনে প্রচারিত অভিযোগসমূহে উল্লিখিত অনেক বিষয় নিঃসন্দেহে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। দেশে ও দেশের বাইরে একাধিক দেশে এই সব অপরাধ সংগঠিত হওয়ার সংবাদের কারণে উল্লিখিত অভিযোগসমূহ আন্তর্জাতিক ফৌজদারি অপরাধে রূপ লাভ করেছে।”
প্রতিবেদনের প্রতিবাদ থেকে জাতিসংঘ যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তাতে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অশংগ্রহণ বিঘিœত হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে বিএনপি।
খন্দকার মোশাররফ বলেন, “সেনাবাহিনী তথা প্রতিরক্ষা বাহিনী জাতীয় ঐক্যের গর্বিত প্রতীক। প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে তার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি বজায় রাখা দলমত-নির্বিশেষে আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।
“আড়িপাতার সিগনাল সরঞ্জামাদি আমদানির ক্ষেত্রে জাতিসংঘের নাম ব্যবহারের সরকারি ব্যাখ্যা জাতিসংঘ কর্তৃক বাতিল হওয়ার পর জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের বৃহত্তম অংশীদার হিসেবে ওই দায়িত্বে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টতাই এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। এরূপ আশঙ্কার মধ্যেই জাতীয় ঐক্যের প্রতীক আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী তথা আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ হারিয়ে ফেলতে পারে তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, ভাবমূর্তি এবং প্রাসঙ্গিকতা।”
খন্দকার মোশাররফ বলেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের গর্ব। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জাতীয় সঙ্কটে অকাতরে কাজ করে যাওয়া দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী তথা প্রতিরক্ষা বাহিনী সর্বদা জনগণের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
“কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠির দুর্নীতি বা নৈতিকতা বিবর্জিত কর্মের কারণে রাষ্ট্রের সংবেদনশীল এই মহান প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
প্রতিবেদন মিথ্যা হলে ফাঁসিতে ঝুলবেন নুর, জেলে যেতে চান না জাফরুল্লাহ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, ‘আলজাজিরার এই প্রতিবেদন ধরে নিলাম পুরোপুরি সত্য নয়। আমি চ্যালেঞ্জ করে বললাম এই প্রতিবেদন পুরোপুরি মিথ্যা নয়। সরকার যদি প্রমাণ করতে পারে, এই প্রতিবেদন পুরোপুরি মিথ্যা তাহলে আমি স্বেচ্ছায় ফাঁসি বরণ করব।’ নুরুল হক নুর বলেন, ‘আলজাজিরার এই প্রতিবেদনকে যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে আমাদের সরকার এই প্রতিবেদনকে উড়িয়ে দিচ্ছে, মানুষকে তারা বোকা ভাবছে। মনে করছে তারা যা বলবে তা বিশ্বাস করবে। ভয় পেলে চলবে না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের কথা বলতেই হবে।’ 
প্রতিবেদনটিকে কেন্দ্র করে দেওয়া ঢাবি শিক্ষক সমিতির বিবৃতির কথা উল্লেখ করে নুর বলেন, আপনারা কি বিবেকের তাড়নায় এই বিবৃতি দিয়েছেন নাকি কেউ প্রভোস্ট হবেন! কেউ প্রক্টর হবেন! কেউ ভিসি হবেন! এই আশায় এই বিবৃতি দিয়েছেন। যেখানে সারা দেশের মানুষ এই প্রতিবেদন নিয়ে কথা বলছে। আপনারা সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষক হয়ে সরাসরি সরকারের পক্ষ নিয়েছেন এটি কখনোই কাম্য নয়।’ ৬ ফেব্রুয়ারি শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে ‘ছাত্র-শিক্ষক-জনতা’-এর ব্যানারে এক প্রতিবাদ সমাবেশে নুর এসব কথা বলেন। 
একই দিন (৬ ফেব্রুয়ারি) গণস্থাস্থ্য কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, আলজাজিরা নিয়ে কিছু বলতে চাই না। এ বিষয়ে কথা বলে জেলখানায় যাওয়ার ইচ্ছা আমার নেই। ডা. জাফর উল্লাহ বলেন, আমি বিলেতে দীর্ঘদিন ছিলাম। তাই কমোড ছাড়া টয়লেট করতে পারি না। একটা আয়েশী জীবন আমার আছে। তাছাড়া আমার দুটো কিডনি নষ্ট। জাফরুল্লাহ বলেন, আল-জাজিরার বিরুদ্ধে বক্তব্য না নিয়ে এখন ইরান পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন করা দরকার। তা না হলে ভারতীয় আগ্রাসন বন্ধ হবে না। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে ভারতের তাবেদারি না করে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, কাশ্মির ইস্যু আজ গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল থেকে আজ অস্ত্র কেনা হচ্ছে। ইহুদিবাদ খুবই খারাপ জিনিস। শান্তি ও উন্নয়ন চাইলে দিনকে দিন বলতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলব অনেক দিন তো কাটালেন। এখন বেরিয়ে আসুন। আপনার চারপাশে যারা আছে তারা মোসাহেব। আপনি তাদের কাছ থেকে বেরিয়ে আসুন। খালেদা জিয়াকে যেমন বেইল দিয়েছেন প্রয়োজন হলে আপনার বেইলের জন্যও আমি দাঁড়াব। 
আল-জাজিরার রিপোর্টের তদন্ত চায় জাতিসংঘ
কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির যে অভিযোগ আনা হয়েছে তার তদন্ত হওয়া উচিত বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক। ৫ ফেব্রুয়ারি নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ আহবান জানান। এতে তাকে আল-জাজিরার তোলা অভিযোগ এবং জাতিসংঘের শান্তি মিশনের জন্য ইসরাইল থেকে বাংলাদেশের নজরদারি প্রযুক্তি ক্রয়ের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। এর উত্তরে ডুজাররিক বলেন, আল-জাজিরার অনুসন্ধানে বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ এবং এ নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি সম্পর্কে আমরা অবহিত আছি। দুর্নীতির অভিযোগ একটি গুরুতর বিষয়। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করা উচিত। এরপর তিনি যুক্ত করেন, জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বাংলাদেশের সবথেকে বেশি ইউনিফর্মড সদস্য রয়েছে। প্রতিটি শান্তি মিশনে তাদের মোতায়েনে জাতিসংঘের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। আল-জাজিরার ডকুমেন্টরিতে যে ধরনের ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রের কথা উঠে এসেছে সে ধরনের কোনো যন্ত্র ব্যবহারের কথা জাতিসংঘের চুক্তিতে নেই। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের কোনো কন্টিনজেন্টে এরকম যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, একটি শান্তিরক্ষা মিশনের অপারেশনে জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা রক্ষার খাতিরে ইন্টালিজেন্স পিসকিপিং পলিসি অনুযায়ী কিছু নির্দিষ্ট ধরনের আড়ি পাতার যন্ত্রপাতির ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটি কঠোরভাবে জাতিসংঘের ইন্টালিজেন্স পিসকিপিং পলিসি মেনে এবং ফোর্স কমান্ডারের অধীনে পরিচালিত হয়েছে।
প্রতিবেদনটি ভিত্তিহীন বলছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় 
‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স ম্যান’ শিরোনামে যে প্রতিবেদনটি করেছিল কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরায়; তা ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ওই প্রতিবেদনটিকে মানহানিকর আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে একটি বিবৃতি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স ম্যান’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলছে ‘গুরুত্বপূর্ণ হলো এই প্রতিবেদনে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যার ঐতিহাসিক তথ্যের কথা উল্লেখ করা হয়নি। যখন জামাতের অপরাধীচক্র লাখো বেসামরিক বাঙালিকে হত্যা এবং দুই লাখের বেশি নারীকে ধর্ষণ করেছে। এই প্রতিবেদন আল জাজিরার সম্প্রচার ও তাদের ভাষ্যকার ডেভিড বার্গম্যানের রাজনৈতিক পক্ষপাতের প্রতিফলন। ১৯৭১ সালে নিহতের সংখ্যা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করায় বার্গম্যান বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দ্বারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ওই প্রতিবেদনের অভিযোগের মূল সূত্র একজন অভিযুক্ত আন্তর্জাতিক অপরাধী, যাকে আল জাজিরা নিজেই ‘সাইকোপ্যাথ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এতে এই নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত থাকার এক বিন্দু প্রমাণও হাজির করা হয়নি। মানসিকভাবে অস্থির প্রকৃতির একজন মানুষের কথার ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া একটি আন্তর্জাতিক নিউজ চ্যানেলের জন্য বড় ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ। উগ্রবাদী গোষ্ঠী এবং লন্ডনসহ বিভিন্ন স্থান থেকে কাজ করা তাদের মিত্রদের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে এই বেপরোয়া ভিত্তিহীন ও বানোয়াট প্রচারণাকে প্রত্যাখ্যান করছে বাংলাদেশ সরকার। ১ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমে পাঠানো এ বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রলাণয় এ অবস্থান ব্যাখ্যা করে। 
পুলিশের প্রতিবাদ নিয়ে নানা প্রশ্ন
‘আল জাজিরার প্রতিবেদন: পুলিশের প্রতিবাদ ও কিছু প্রশ্ন’ শিরোনামে ৮ ফেব্রুয়ারি একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরে জার্মানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলে। প্রতিবেদনে বলা হয়- “আল জাজিরার প্রতিবেদনের পর যাদের তদন্ত করার কথা, তারাও তা না করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। যাদের প্রশ্ন তোলার কথা তারাও প্রতিবাদই করছেন। কেউ কোনো প্রতিবেদন করলেই যদি তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে আক্রমণ শুরু হয়, তাহলে প্রশ্নটা তুলবে কে? সরকার যেমন প্রতিবেদনের কনটেন্ট তৈরিতে সহায়তাকারীদের এক কথায় জামায়াত-শিবির বানিয়ে দিচ্ছে, তেমনি কিছু কনটেন্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলা ব্যক্তিদেরও আলোচনার সুযোগ না দিয়ে আওয়ামী লীগ বানিয়ে দিচ্ছে আরেক পক্ষ। সমাজকে এমন বিভক্ত অবস্থায় নেওয়া হয়েছে যে, ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থানে থেকে আলোচনা-সমালোচনার কোনো সুযোগই কাউকে দেওয়া হচ্ছে না। অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে আপনাকে ততক্ষণই ‘নিরপেক্ষ’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে যতক্ষণ আপনার কথা তার পক্ষে যাচ্ছে। 
“প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো তথ্য আমলে না নিয়ে??