মঙ্গলবার, ২০-এপ্রিল ২০২১, ০৭:০২ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • তাজউদ্দিন মেডিকেলে দুর্নীতি-লুটপাট: মন্ত্রণালয়ের তদন্ত রিপোর্টে যা আছে

তাজউদ্দিন মেডিকেলে দুর্নীতি-লুটপাট: মন্ত্রণালয়ের তদন্ত রিপোর্টে যা আছে

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ০৯:০৪ পূর্বাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ-এর নামে প্রতিষ্ঠিত “শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল”। তাজউদ্দিন আহমেদের নাম স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে তাঁর জন্মস্থান গাজীপুরে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এতে চিকিৎসা বিষয়ক উচ্চ শিক্ষাদানের লক্ষ্যে সরকারের তরফ থেকে অবকাঠামো নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু বরাদ্দকৃত এই অর্থের অনেকটাই কতিপয় দুর্নীতিবাজ লুটেরা গোষ্ঠীর পকেটে চলে গেছে ইতিমধ্যে। ইতিপূর্বে সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে এ বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। অবশেষে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনও দুর্নীতি-লুটপাটের চিত্র বেরিয়ে এসেছে। যদিও এ তদন্ত ছিলো আংশিক অর্থাৎ কয়েকটি বিষয় এবং সীমিত কিছু সময়ের ঘটনার জন্য কিন্তু তাতেও তদন্তে সরকারি অর্থ লুটপাটের ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছে। 
মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিবের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি এই তদন্তকাজ চালায়। ডিপিপি বহির্ভুতভাবে প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ, লাশবাহী গড়ির পরিবর্তে মাইক্রোবাস ক্রয়, ডিপিপি- তে অনুমোদিত ক্রয় পরিকল্পনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, রিক্যুইজিশন ছাড়া বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি ক্রয়, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্র ক্রয় ও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে ওইসব কোটি কোটি টাকার যন্ত্র নষ্ট হয়ে যাওয়া, একই যন্ত্র ভিন্ন ভিন্ন কার্যাদেশের মাধ্যমে ক্রয়সহ ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে তদন্তে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির জন্য তদন্ত প্রতিবেদনে কলেজটির অধ্যক্ষ ও প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আসাদ হোসেনকে দায়ী করা হয়েছে।  
স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের যুগ্মসচিব (পার অধিশাখা) একেএম শামিমুল হক ছিদ্দিকীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই তদন্ত কমিটিতে অন্য দু’জন ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক ডা. শেখ মো. মনজুর রহমান স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব এএমএম রিজওয়ানুল হক। কমিটি গাজীপুরস্থ প্রকল্প এলাকা অর্থাৎ কলেজটি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে রিপোর্ট দাখিল করে। 
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের (হাসপাতাল পরিচালকের) অথবা বিভিন্ন বিভাগ প্রধানদের নিকট থেকে চাহিদাপত্র (রিক্যুইজিশন) গ্রহণ না করেই বিপুল পরিমাণ মেডিকেল যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়েছে। এ সকল মেডিকেল যন্ত্রপাতির একটি বিপুল পরিমাণ অংশ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গ্রহণ না করায় গোডাউনে থেকে নষ্ট হচ্ছে যার মূল্য প্রায় ১৮.০৫ কোটি টাকা। এ ধরনের ক্রয়ের কারণে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। 
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫,৯৪,৪৫,৪১৪ টাকা দিয়ে ‘ইএসআর ল্যাব অটোমেশন’ নামক যন্ত্র ক্রয় করা হয়েছে। পরিদর্শনকালে দেখা যায় যে, এই যন্ত্রটি হাসপাতালের মেঝেতে পড়ে আছে। এখনো প্যাকেট খোলা হয়নি।  ৫,৯৪,৪৫,৪১৪ টাকার যন্ত্রটি দীর্ঘ এক বছরের অধিক সময় পড়ে থাকায় প্রতীয়মান হয় যে, হাসপাতালে এ যন্ত্রের প্রয়োজন না থাকলেও যন্ত্রটি ক্রয় করা হয়েছে। এছাড়া ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মেডিকেল কলেজের বই ক্রয়ের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ ছিল সেটি কোটেশনের মাধ্যমে ক্রয় করা হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। কিন্তু পরিদর্শনকালে দেখা যায়, কোটেশন বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়নি। 
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, মেডিকেল যন্ত্রপাতি এবং আসবাবপত্র ক্রয়ের জন্য ২০১৮-১৯ সালে কোনো টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়নি। ২০১৭-১৮ সালে নিয়োজিত ঠিকাদার এর নিকট থেকে ভিন্ন ভিন্ন কার্যাদেশের মাধ্যমে মেডিকেল যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র ক্রয় করা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয়/ বিভাগ/ বিভাগীয় প্রধান/ প্রকল্প পরিচালককে সরকারের পরিপত্রে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তাতে এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের আর্থিক ক্ষমতা ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ এর ১১(৬) ধারায় বলা হয়েছে, “কোনো একক কাজ একাধিক প্যাকেজে বিভক্ত করা হলেও মোট অর্থের পরিমাণ অনুমোদনের এখতিয়ার যে কর্তৃপক্ষের থাকিবে, উক্ত যে কোনো প্যাকেজের চুক্তি সম্পাদনের জন্য সকল প্যাকেজের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সেই কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপন করিতে হইবে।”
কিন্তু ২০১৮-১৯ সালে ২২ কোটি ৯৪ লাখ টাকার মেডিকেল যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়েছে। এক্ষেত্রে টেন্ডার অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ সচিব, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ। কিন্তু সচিব মহোদয়ের অনুমোদন ব্যতিরেকে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ লঙ্ঘনপূর্বক প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক মো. আসাদ হোসেন ২২ কোটি ৯৪ লাখ টাকার মেডিকেল যন্ত্রপাতি পৃথক পৃথকভাবে ক্রয় করেছেন, যা একটি গুরুতর অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আসবাবপত্র ক্রয় বাবদ বরাদ্দ ছিল ২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এরমধ্যে ২ কোটি ৩৫ লাখ ৫২ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। ক্রয়কৃত আসবাবপত্রের অনেকগুলোই এখনো স্টোরে পড়ে রয়েছে। 
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১২ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের মেডিকেল যন্ত্রপাতি ক্রয়ের দীর্ঘদিন পরও ব্যবহার না হওয়ায় প্রতীয়মান হয় যে, প্রয়োজন ছাড়াই কেবল সরকারি অর্থ ব্যয় করার উদ্দেশ্যেই এ সকল মেডিকেল যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়েছে। সরকারি অর্থের এ ধরনের অপচয় কাঙ্খিত নয়। ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতির একটি বিপুল পরিমাণ অংশ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গ্রহণ না করায় গোডাউনে থেকে নষ্ট হচ্ছে।  
ডিপিপিতে অনুমোদিত ক্রয় পরিকল্পনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। ডিপিপিতে একটি এ্যাম্বুলেন্স ও একটি লাশবাহী গাড়ি ক্রয়ের অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক লাশবাহী গাড়ির পরিবর্তে মাইক্রোবাস ক্রয় করেছেন এবং ডিপিপি বহির্ভুতভাবে ১১৮ কোটি টাকা ব্যয় করে ২.২৯৫০ একর জমি অতিরিক্ত অধিগহণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ সকল অনিয়মের জন্য অধ্যক্ষ ও প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক মো. আসাদ হোসেনকে দায়ী করে রিপোর্ট দাখিল করেছে তদন্ত কমিটি।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ প্রকাশিত)