বুধবার, ১৪-এপ্রিল ২০২১, ১২:৪২ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে শত কোটি টাকার দুর্নীতি-লুটপাট, তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে শত কোটি টাকার দুর্নীতি-লুটপাট, তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু

shershanews24.com

প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ০১:০০ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ইএম ডিভিশনে কেনাকাটার নামে গত এক দশকে অন্তত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি দুর্নীতিবাজ চক্র। এর নেতত্বে যিনি রয়েছেন তিনি একসময় ছাত্রদলের নেতা হিসেবে পরিচিতি থাকলেও বর্তমানে ডাকসাইটে আওয়ামী লীগার। তার নাম প্রকৌশলী মিরাজ হোসেন। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের শেষ মুহূর্তে চাকরিতে নিয়োগ পান। সম্প্রতি এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ বিস্তারিত অভিযোগ জমা পড়ে গৃহায়ন ও পূর্ত মন্ত্রণালয়ে। তারই সূত্র ধরে মন্ত্রণালয় প্রকৌশলী মিরাজ হোসেনের নেতৃত্বাধীন এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। 
প্রকৌশলী মিরাজ হোসেন বর্তমানে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে আছেন। তবে ইএম ডিভিশনে যেহেতু নির্বাহী প্রকৌশলীর উপরে আর পদ নেই। তাই তিনিই ইএম ডিভিশনের সর্বেসর্বা। আর এর সুবাদে বিগত বছরগুলোতে ব্যাপক লুটপাট চালিয়ে গেছেন এবং এখনো লুটপাট চালাচ্ছেন। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে রাশিদুল ইসলাম থাকাকালে শুধু ইএম ডিভিশনেই নয় পুরো সংস্থাটিতেই দুর্নীতি-লুটপাটের নেতৃত্ব দিয়েছেন। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকৌশলী মিরাজ হোসেন যদিও ছাত্রজীবনে সরাসরি বিএনপির অঙ্গসংগঠন ছাত্রদলের নেতা ছিলেন, এমনকি নিয়োগ পেয়েছেন ছাত্রদলের নেতা হিসেবে, চাকরিতেও শুরুতে বিএনপির পেশাজীবী সংগঠন এবং বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন, কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাতারাতি বোল পাল্টিয়ে ফেলেন। গ্রামের বাড়ি বৃহত্তর ফরিদপুরের রাজবাড়ি জেলায়, সেই সুবাদে রাতারতি আওয়ামী লীগ সমর্থক বনে যেতে তার আর সমস্যা হয়নি।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে সহকারী প্রকৌশলী (ইএম) পদে মিরাজ হোসেন নিয়োগ পান ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের একেবারে শেষ সময়ে। মিরাজ হোসেনসহ আরো কয়েকজন ছাত্রদল নেতাকে নিয়োগ দিতেই তখন তড়িঘড়ি করে ওই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। নামেমাত্র নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে মোট ৭১ জনকে ওই সময় একযোগে নিয়োগ দেয়া হয়। তারমধ্যে সহকারী পরিচালকের একটি পদ, চেয়ারম্যানের পিএস পদ এবং একজন প্রোগ্রামার ছাড়া বাকি সবাই প্রকৌশলী। ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাত্র দু’দিন আগে তড়িঘড়ি করে এই ৭১ জনকে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতো দ্রুততার সঙ্গে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় যে, অতীতে কখনো এভাবে এতো গুরুত্বপূর্ণ পদে এতো দ্রুততায় নিয়োগ কার্যক্রম হয়নি। আর এটা সম্ভবও নয়। বস্তুত নিয়োগ পরীক্ষা হলেও সেটি ছিল নামেমাত্র, অনেকটা নিয়ম রক্ষার মতোই। কিন্তু সরকারের আইন ও বিধি-বিধান অনুযায়ী নিয়ম রক্ষার জন্য যা কিছু করার দরকার ছিল সেটিও ওই নিয়োগে করা হয়নি। যে কারণে পরবর্তীতে এই নিয়োগের বিরুদ্ধে মামলা হয়। তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তদন্ত কমিটি ওই নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য তদন্ত রিপোর্টে তুলে ধরে রিপোর্ট পেশ করে। এমনকি কমিটি নিয়োগ বাতিলেরও সুপারিশ করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মিরাজ হোসেন ও তার সহযোগীরা নিজেদের মধ্যে মোটা অংকের চাঁদা তুলে সরকারের প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে সেটি কোনোরকমে ধামাচাপা দেন।   
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ৭১ জনের এই নিয়োগ কেলেংকারি নিয়ে তখন ব্যাপক তোলপাড় বয়ে যায়। একেতো নজিরবিহীন তড়িঘড়ি করে নিয়োগ, তারউপর ব্যাপক ঘুষ লেনদেন। নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে  অনেক উচ্চ অংকের ঘুষ লেনদেন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এবং এই ঘুষ লেনদেনের নেতৃত্বে ছিলেন প্রকৌশলী মিরাজ হোসেন। আর তখনই ঘুষ লেনদেনে তার হাত পেকে যায়। ফলে নিয়োগ পেয়েই শুরু করেন ঘুষের ব্যবসা। 
অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে চাকরিকালে গত ১৪ বছরে অন্তত একশ’ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন প্রকৌশলী মিরাজ হোসেন। প্লট-ফ্ল্যাটের মালিক হওয়া ছাড়াও বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন ব্যাপকভাবে। 
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ইএম ডিভিশনে কেনাকাটা বাবদ প্রতি বছর বিপুল অর্থ বরাদ্দ থাকে। এই ডিভিশনের যেহেতু তিনি প্রধান ব্যক্তি এবং একচ্ছত্র আধিপত্য তার রয়েছে সেই সুবাদে মিরাজ হোসেন ব্যাপক লুটপাট চালিয়েছেন। তবে সবচেয়ে বেশি লুটপাট করেছেন সাবেক চেয়ারম্যান রাশিদুল ইসলামের আমলে। রাশিদুল ইসলামের বাড়ি মিরাজ হোসেনের জেলায়ই, যে কারণে উভয়ের মধ্যে শুরুতেই একটা বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠে। রাশিদুল ইসলাম শুরুতে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য (ভূমি) পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে চেয়ারম্যান পদ শূন্য হলে তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। রাশিদুল ইসলাম চেয়ারম্যান পদে থাকাকালে তার ব্যাপক দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই প্রতিবেদন দাখিল করে। তারপরও তিনি নানা মহলে তদবির চালিয়ে সেই তদন্ত প্রতিবেদনকে ধামাচাপা দিয়ে পদ আঁকড়ে থাকেন। কিন্তু ক্রমান্বয়ে তার দুর্নীতির প্রবণতা এতো বেড়ে যায় যে, এক পর্যায়ে সরকার তাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। 
প্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব রাশিদুল ইসলাম জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য (ভূমি) থাকাকালেই তার সঙ্গে প্রকৌশলী মিরাজ হোসেনের সখ্যতা গড়ে উঠে। রাশিদুল ইসলাম চেয়ারম্যান হবার পর প্রকৌশলী মিরাজ হোসেন রাতারাতি একচ্ছত্র ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন। এ সময় তিনি শুধু ইএম ডিভিশনই নয়, গোটা সংস্থাটিই দাবড়ে বেড়ান এবং ব্যাপক লুটপাট চালান। যদিও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে তিনি একজন জুনিয়র প্রকৌশলী মাত্র। চেয়ারম্যান রাশিদুল ইসলামের পক্ষে তিনি বিভিন্ন পার্টির অর্থাৎ লোকজনের সঙ্গে দেন-দরবার, অর্থ লেনদেন করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অবশ্য তার এই সিন্ডিকেটে নিজের দফতরের ট্রেসার কাম এস্টিমেটর কাম প্রকৌশলী জর্জেস আলম, গাড়ির ড্রাইভার মাসুদ খান ছাড়াও ভূমি শাখার এক কর্মচারীসহ আরো কয়েকজন রয়েছেন।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ফ্ল্যাট প্রকল্পগুলোতে বিদ্যুতের সাব-স্টেশন স্থাপন, জেনারেটর, পানির পাম্প, লিফট প্রভৃতি স্থাপন ও পরিচালনা এবং গাড়ি ক্রয়-পরিচালনার পুরো কর্মকা- প্রকৌশলী মিরাজ হোসেনের হাতে। নি¤œমানের মালামাল ক্রয় এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে এ খাত থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন মিরাজ হোসেন। দুর্নীতি-লুটপাটের মাধ্যমে যেহেতু ইতিমধ্যে বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন এবং এ অবৈধ অর্থের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন মহলে কানেকশন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন তাই জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে কেউ তাকে কিছুই বলার সাহস পান না। এমন একটা অবস্থার মধ্যে মিরাজ হোসেনের দুর্নীতি তদন্ত শুরু করতে যাচ্ছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এই তদন্ত বাস্তবে কতটা এগোতে পারবে তা সময়ই বলে দেবে। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ প্রকাশিত)