বুধবার, ১৬-জুন ২০২১, ০৫:০০ অপরাহ্ন

আল জাজিরা বিতর্ক থামছে না 

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৪ মার্চ, ২০২১ ০৮:৫১ পূর্বাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স মেন’ শিরোনামে কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল-জাজিরায় বাংলাদেশ বিষয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে গত ১ ফেব্রুয়ারি। প্রায় এক মাস আগে এ প্রতিবেদনটি সম্প্রচার হলেও দেশের মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখনো শীর্ষে রয়েছে ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স মেন’। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এ প্রতিবেদনটি ষড়যন্ত্রমূলক ও অনেকাংশে অসত্য বলে দাবি করে করলেও বিরোধী পক্ষ ও সাধারণ মানুষ এমন ঢালাও বক্তব্য গ্রহণ করতে রাজি নন। প্রতিবেদনটি যে ‘অসত্য’ এর দালিলিক প্রমাণ চান। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এ প্রতিবেদনের বিপক্ষে খুব জোরালো কোনো তথ্য-উপাত্ত জনদৃষ্টিতে আনা যায়নি। শুরুতে এ প্রতিবেদনটি সরাতে সরকার বা অন্য কোনো পক্ষ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। পরে জনৈক বিক্ষুব্ধ আইনজীবী এ বিষয়ে রিট করেন। দেশের বিশিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, এটি কোনো ব্যক্তি সংক্ষুব্ধ হওয়ার বিষয় নয়, রাষ্ট্র ও সরকারের বিষয়। আইনি কোনো পদক্ষেপ নিতে হলে তা নেবে রাষ্ট্র বা সরকার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো থেকে ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স মেন’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনটি সরিয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) আদালত ইতোমধ্যে নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশনার আলোকে বিটিআরসি উদ্যোগ নিলেও সেটির ফলাফল এখনো আসেনি। অন্যদিকে ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স মেন’ শিরোনামের প্রতিবেদনের সঙ্গে ৪ জন সংশ্লিষ্ট দাবি করে ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে যে মামলার আবেদন করা হয়েছিল- তা ফেরত দিয়েছেন আদালত। তবে আল-জাজিরা ইস্যুতে সর্বশেষ সবচেয়ে বেশি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে আনিছ আহমেদ ও হারিছ আহমেদের সাজা মওকুফের তথ্যটি। সেনা প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বিদেশ থেকে ফেরার পরপরই আইএসপিআর-এর এক বিবৃতি এবং পরদিন আজিজ আহমেদ এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্যটি প্রকাশ করেন। আর সারাদেশে হঠাৎ করেই ব্যাপক তর্ক-বিতর্কেও সৃষ্টি হয়। অনেকটা আইএসপিআর এবং পরে সেনা প্রধান জানান। তার ভাই আনিছ আহমেদ ও হারিছ আহমেদের সাজা মওকুফ করেছে সরকার। আর তাতেই বিতর্কের ঝড় বয়ে যায়। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা তাৎক্ষণিকভাবে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে ‘জানেন না’ বলে জানান। একের পর প্রশ্নবানে মন্ত্রীরা বিবৃতবোধ করতে থাকেন। পরে যদিও এই মন্ত্রীরাই স্বীকার করে নেন যে, সাজা মওকুফ করা হয়েছে। পলাতক অবস্থায় কারো সাজা মওকুফ করা যায় কি-না এ বিতর্ক এখনো থামেনি। এদিকে হাইকোর্ট ফেইসবুক-ইউটিউব থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদনটি সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিলেও সেটি এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
আল-জাজিরার সেই ভিডিও সরানোর নির্দেশ
আল জাজিরা টেলিভিশনে ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ শিরোনামে সম্প্রচারিত প্রতিবেদনটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে দ্রুত সরাতে ইতোপূর্বে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল বেঞ্চে এ আদেশ দেন। ওই নির্দেশনার আলোকে গুগল ও ফেসবুককে অনুরোধও জানানো হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে।
মন্ত্রীর বক্তব্যের বিপরীতে ফেসবুকের বিবৃতি 
বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম (২০ ফেব্রুয়ারি) ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ফেসবুক কর্তৃপক্ষ আল জাজিরার প্রতিবেদনটি সরিয়ে ফেলতে রাজি হয়েছে এবং দ্রুত এই ব্যবস্থা নেবে তারা। ২০ ফেব্রুয়ারি শনিবার বিকেলে বিটিআরসি কার্যালয়ে অর্ধেক খরচে বাংলা ভাষায় এসএমএস সেবা চালু করার অনুষ্ঠানে তিনি একথা জানান। মন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে আরো বলা হয়, আদালতের নির্দেশনার কপি ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং তারা আল জাজিরার রিপোর্টটি সরিয়ে নেবে। এমন পটভূমিতে ফেসবুকের তরফ থেকে ওই রাতেই একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। ফেসবুক বলেছে, “আমরা বিটিআরসির কাছ থেকে ডকুমেন্টারি সরিয়ে নেওয়ার জন্য হাইকোর্টের লিখিত নির্দেশনা পাইনি। আমরা এই বিষয়ে কোন বিবৃতি দেইনি।” ফেসবুকের পক্ষে বাংলাদেশে জন-সংযোগকারী প্রতিষ্ঠান বেঞ্চমার্ক পিআর ইমেইলের মাধ্যমে এই বিবৃতি পাঠিয়েছে।
ফেইসবুক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা আল-জাজিরার প্রতিবেদন সরিয়ে নেয়ার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এ ধরনের কোনো বিবৃতিও দেয়নি। ফেইসবুকের এমন পাল্টা বক্তব্যের পর মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার কিছুটা বেকায়দায়ই পড়েন।
সেই ভিডিও চিত্র কি সোস্যাল মিডিয়ায় থাকছে?
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ‘আল জাজিরা বিতর্ক: প্রতিবেদন সরিয়ে নিতে কি গুগল ও ফেসবুক বাধ্য?’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিসি বাংলা। প্রতিবেদনে বলা হয়, কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরার তৈরি ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ নামে একটি তথ্যচিত্র সরিয়ে ফেলতে গুগল ও ফেসবুককে বিটিআরসি যে আবেদন জানিয়েছে তা মানতে প্রতিষ্ঠান দুটি আইনগত ভাবে বাধ্য নয়। একথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসি। তবে সংস্থাটি বলছে যে, আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলেও একটা নৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংস্থাটির ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র বলেন, ‘ওইভাবে বাধ্যবাধকতা নেই। তবে তাদের একটা কোড অব কন্ডাক্ট আছে। কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড আছে।’ তিনি বলেন, যেকোন দেশের বিচারালয়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন-তাদের কন্ডাক্টের আওতায় আছে। ‘সেই অর্থে একটা নৈতিক বাধ্যবাধকতা তো থাকেই,’ বলেন তিনি। এর আগে বুধবার ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকালে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান এবং তার ভাইদের কর্মকা- নিয়ে আল জাজিরা টেলিভিশন যে প্রতিবেদন প্রচার করেছে, হাইকোর্ট সেই প্রতিবেদন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সব ধরনের সামাজিক মাধ্যম থেকে অবিলম্বে সরাতে বিটিআরসিকে নির্দেশ দেয়।
যার জের ধরেই ইন্টারনেট থেকে আল-জাজিরার তথ্যচিত্রের ভিডিওটি সরিয়ে ফেলার জন্য গুগল এবং ফেসবুকের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনুরোধ জানায় বিটিআরসি। বিবিসি বাংলার ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়- কাতার ভিত্তিক টেলিভিশনটির এই প্রতিবেদন নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে। ইস্যুটি দেশের আদালত পর্যন্ত গড়ায়। সুব্রত রায় মৈত্র বলেন, যেহেতু তাদের সাথে বাংলাদেশের কোন আইনি চুক্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই, এজন্য তাদের অনুরোধ করা হবে তারা যাতে আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। তবে বিটিআরসির অনুরোধে যদি এই দুটি সংস্থা কোন সাড়া না দেয় সেক্ষেত্রে কী করা হতে পারে প্রশ্ন করা হলে সুব্রত রায় মৈত্র বলেন, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের সরকার এবং আদালতের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয় রয়েছে। তিনি বলেন, যদি তারা সরিয়ে ফেলতে রাজি না হয় তাহলে সে সিদ্ধান্তটি সরকার এবং আদালতকে জানিয়ে দেয়া হবে। তাদের কাছ থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে সেটিই বাস্তবায়ন করা হবে। মি. মৈত্র বলেন, “যেহেতু আমাদের সেই কারিগরি সক্ষমতা নেই এগুলো বন্ধ করার, সেহেতু বাধ্য হয়ে আমরা তাদের অনুরোধ জানাবো।’
কি ছিল রিটে, যে মত দিয়েছেন অ্যামিকাস কিউরি 
বাংলাদেশে আল জাজিরার সম্প্রচার বন্ধের আদেশ চেয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে দায়ের রিট আবেদনটি বিবেচনার যোগ্য কি-না তা নির্ধারণে, ছয়জন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগের নির্দেশ দেয় ঢাকার একটি আদালত। আদালত যে ছয়জন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ করেছে, তারা হচ্ছেন এজে মোহাম্মদ আলী, আব্দুল মতিন খসরু, শাহদীন মালিক, ফিদা এম কামাল, প্রবীর নিয়োগী এবং কামাল উল আলম। আদালতে ওই রিট দায়ের করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এনামুল কবির ইমন। রিটে বাংলাদেশে আল জাজিরার সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
সেই সঙ্গে ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ নামে সম্প্রচারিত প্রতিবেদনটি ইউটিউব, ফেসবুক ও টুইটার থেকে অপসারণের নির্দেশনাও চাওয়া হয়। তথ্যচিত্রটি যেহেতু দশদিন আগে প্রচারিত হয়েছে, তার ফলে এখন নতুন করে স্থগিতাদেশ দেবার আবেদন জনস্বার্থে গ্রহণযোগ্য কিনা এবং বিদেশি প্রচারমাধ্যমের সম্প্রচার বন্ধের ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা কার্যকর করা যাবে কি না এসব বিষয়ে আইনজীবীদের মতামত জানতে চেয়েছে আদালত।
করা রিটের গ্রহণযোগ্যতাসহ পাঁচটি বিষয়ে মতামত দিতে আদালত ১০ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিমকোর্টের ছয়জন সিনিয়র আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেন। অ্যামিকাস কিউরিদের কাছে আদালতে প্রশ্ন ছিল, রিট আবেদনকারীর সংক্ষুব্ধ হওয়ার দিক, রিটের প্রার্থনা অনুসারে আদালত থেকে কোনো আদেশ দেয়া হলে বিদেশি কোনো টিভি চ্যানেলের ক্ষেত্রে তা কার্যকর করা যাবে কি না? কোনো আইনি নোটিশ ছাড়া রিট (ম্যান্ডামাস) চলে কি না, রিটের প্রার্থনা অনুসারে এই আদালত থেকে আল-জাজিরার তথ্যচিত্রটি সব মাধ্যমে থেকে বন্ধ করার কোনো নির্দেশনা দেয়ার প্রয়োজন আছে কি না, ১ ফেব্রুয়ারি তথ্যচিত্রটি প্রকাশের পর এত দেরিতে রিট করার প্রেক্ষাপটে কোনো নির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না?
১৫ ফেব্রুয়ারি শুনানিতে অংশ নিয়ে পাঁচজন অ্যামিকাস কিউরি বলেছেন, রিটটি গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে একজন ব্যক্তির রিট করার সুযোগ নেই। আর রিট আবেদনকারীর সংক্ষুব্ধ হওয়ার যৌক্তিকতা নেই। আর সংক্ষুব্ধ না হলে সংবিধান ও আপিল বিভাগের গাইডলাইন অনুযায়ী তিনি রিট করতে পারেন না।
অ্যামিকাস কিউরিরা বলেছেন, এটা সরকারের নির্বাহী বিভাগের কাজ। এখানে বিটিআরসি আছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রয়েছে। তবে অপর একজন অ্যামিকাস কিউরি আবদুল মতিন খসরু বলেছেন, ডকুমেন্টরি সরাতে আদালত আদেশ দিতে পারেন। এটা না করলে তারা আবারো করতে পারে।
শুনানির এক পর্যায়ে আদালত একজন অ্যামিকাস কিউরিকে প্রশ্ন করেন, বিচারপতিরাও দেশের সন্তান, এখানে সরকারের সর্বোচ্চ ব্যক্তি যদি বিপদগ্রস্ত হন, আদালত সুয়োমোটো রুল জারি করতে পারে কি? জবাবে অ্যামিকাস কিউরি প্রবীর নিয়োগী বলেন, কাউকে কোর্টে আবেদন নিয়ে আসতে হবে। তবে এ পর্যায়ে এই রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। অ্যামিকাস কিউরি কামাল উল আলম আদালতে বলেন, রিট আবেদনকারীর সংক্ষুব্ধ হওয়ার যৌক্তিকতা নেই। রিটটি গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সরকারই ব্যবস্থা নেবে। নির্বাহী বিভাগ আদেশ দেবেন। আদালত কেন বার্ডেন করবে? এই রিট আবেদনের আগে ডিমান্ড অফ জাস্টিস (বিবাদীদের নোটিশ দেয়া) প্রয়োজন ছিল। এই আবেদন গ্রহণ করা হলে তা আপিল বিভাগের ১৪টি গাইডলাইনের বাইরে চলে যাবে। শুনানির এক পর্যায়ে আদালত প্রশ্ন করেন আমরা দেশে (আল জাজিরার) সম্প্রচার বন্ধের আদেশ দিতে পারি কি না? জবাবে কামাল উল আলম বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে পারবেন না। টেরিটোরির বাইরে যেতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে তো ক্যাবল নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন আছে। কি সম্প্রচার করা যাবে না তা আইনেই বলা আছে। জনস্বার্থে সরকার যেকোনো নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে পারে।
তিনি বলেন, এক ঘণ্টার ডকুমেন্টরিতে সরকারপ্রধানকে ম্যালাইন করা হলে, সরকারকেই ম্যালাইন করা হয়। এজন্য সরকারই ব্যবস্থা নিতে পারে। এখানে রিট আবেদনকারী সংক্ষুব্ধ নন। আর সংক্ষুব্ধ না হলে রিট আবেদন করতে পারেন না। অ্যামিকাস কিউরি ফিদা এম কামাল বলেন, আল জাজিরার ডকুমেন্টরি সরকারই বন্ধের নির্দেশ দিতে পারে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তথ্য-উপাত্ত ব্লক করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আইনে বিটিআরসিকে পরিষ্কার ক্ষমতা দেয়া আছে। এই ডকুমেন্টারি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় দিয়েছে। অন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলে গেছে। এখানে রিট আবেদনকারী দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন, তিনি কিভাবে সংক্ষুব্ধ। আলজাজিরা অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স মেন ডকুমেন্টারি প্রকাশ করেছে। এটা সরকারের অগোচরে হয়নি। সরকার দেখেছে। প্রতিবাদ করেছে। সরকার যদি মনে করত বন্ধ করা দরকার, সেখানে তাদের ম্যাকানিজম আছে। অ্যামিকাস কিউরি আব্দুল মতিন খসরু আদালতে লিখিত বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ডকুমেন্টারি সরাতে আদালত আদেশ দিতে পারেন। এটা না করলে তারা আবারো করতে পারে। অ্যামিকাস কিউরি প্রবীর নিয়োগী আদালতে বলেন, এখানে ব্যক্তির রিটের সুযোগ নেই। এটা সরকারের নির্বাহী বিভাগের কাজ, তারা সিদ্ধান্ত নেবে।
কী আছে আইনে
বাংলাদেশের বিষয়ে আল জাজিরা যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তা সরাতে ইতোমধ্যে বিটিআরসি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে অনুরোধ জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছে। কিন্তু এই অনুরোধ রাখতে যে তারা বাধ্য নয়, সেটি দেশের আইনজীবীরাই ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছেন। তবে কর্পোরেট আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইমতিয়াজ ফারুক বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বিটিআরসিকে, কোন প্রতিষ্ঠানকে নয়। তাই এটা মানা না মানার প্রশ্নটি আসে না। তবে আদালত তার নির্দেশনায় এরই মধ্যে বলেছে যে, এই কন্টেন্ট বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়াচ্ছে। আর বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো অপরাধ। তিনি বলেন, তবে কোন প্ল্যাটফর্ম যতক্ষণ পর্যন্ত এটা না জেনে ওই কন্টেন্ট প্রচার করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের কোন দায় থাকবে না। বিটিআরসি টেক ডাউন রিকোয়েস্ট বা সরিয়ে নেওয়ার আবেদনের মাধ্যমে আদালতের নির্দেশনা গুগল এবং ফেসবুককে জানানোর পরও যদি সেটি থাকে তাহলে সেটি বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় অপরাধ বলে গণ্য হবে বলে জানান তিনি। ফারুক বলেন, বাংলাদেশে যদি ওই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিস থাকে তাহলে তাদেরকে এই অপরাধের আওতায় আনা যাবে। “যদিও সরাসরি কোন বাধ্যবাধকতা নেই, তবে ইনডিরেক্ট একটা চাপ ওদের উপর আছে।”
সেই ৪ ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা ফেরত
কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল জাজিরায় প্রতিবেদনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪ ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে যে মামলার আবেদন করা হয়েছিল- তা ফেরত দিয়েছেন আদালত। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর হাকিম শহিদুল ইসলামের আদালত এ আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) হেমায়েত উদ্দিন খান গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতি আইনজীবী আবদুল মালেক ওরফে মশিউর মালেক বাদী হয়ে আল জাজিরার প্রতিবেদনটিকে রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী আখ্যা দিয়ে এ মামলা দায়ের করেন। সেদিন ঢাকার মহানগর হাকিম আশেক ইমাম শুনানি শেষে বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে কোনো আদেশ দেননি। পরে ১৮ ফেব্রুয়ারি মামলার নথি পর্যালোচনা করে আদালত এ বিষয়ে আদেশের জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছিলেন। মামলার ৪ আসামিরা হলেন- আল জাজিরার ডিরেক্টর জেনারেল মোস্তেফা সউয়াগ, শায়ের জুলকারনাইন ওরফে সামি, নেত্র নিউজের সম্পাদক তাসনিম খলিল এবং যুক্তরাজ্যের সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান।
সাজা মওকুফ, জানতেন না আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ওয়াকিবহাল নন তথ্যমন্ত্রীও
দেশের একটি প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিকে খবর প্রকাশ ও সেনাবাহিনী প্রধান নিজের ভাইয়ের সাজা মওকুফের বিষয়ে জানানোর আগে দেশের আইনমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল হারিছ আহমেদ, আনিছ আহমেদ সাজার বিষয়ে। তখন দুই মন্ত্রী এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান। তথ্যমন্ত্রী জানান, তিনি এ বিষয়ে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নন। হারিছ আহমেদ, আনিছ আহমেদ এই সাজা মওকুফের বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে প্রশ্ন করা হলে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘কারও সাজা মওকুফ করা হয়েছে কি না, তা আমি জানি না। এ বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।’ এ বিষয়ে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এঁদের (হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদ) সাজা মওকুফের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। না জেনে কিছু বলতেও পারব না।’ তবে তিনি এও বলেন, ‘আমাদের কাছে একজন যাবজ্জীবন সাজা মাফের আবেদন করেছিলেন। নাম মনে করতে পারছি না। মহামান্য রাষ্ট্রপতি সেই আবেদন মঞ্জুর করেছিলেন। আরেকজন নিজেকে মানসিক রোগী বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এইটুকুই আমার মনে পড়ছে।’ পলাতক কোনো আসামি কোনো আইনগত অধিকার পেতে পারেন কি না, জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো আইনগত অধিকার পলাতক আসামি পায় না। আইনগত অধিকার পেতে হলে তাকে সারেন্ডার (আত্মসমর্পণ) করতে হয়।’ তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদের সাজা মওকুফের বিষয়টি নিয়ে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নন।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, পলাতক কোনো ব্যক্তি কখনো কোনো ধরনের আইনি সুযোগ-সুবিধা এবং অধিকার ভোগ করতে পারে না। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় পলাতক কারও সাজা মওকুফ করা হলে তা সম্পূর্ণ বেআইনি হবে। এটা আইনের স্পষ্ট বিধান। তিনি বলেন, যদি কেউ এই আইনের বিধান লঙ্ঘন করে সাজা মওকুফের ব্যবস্থা করেন, তাহলে তাঁর বা তাঁদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী বিভাগীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কারণ, পলাতক আসামির দণ্ড মওকুফ করার অর্থ ক্ষমতার বেআইনি ব্যবহার ও অপপ্রয়োগ। কোনো আইনগত অধিকার পলাতক আসামি পায় না। আইনগত অধিকার পেতে হলে তাকে সারেন্ডার (আত্মসমর্পণ) করতে হয়।
পলাতক অবস্থায় সাজা মওকুফ, আইন কী বলে?
পলাতক অবস্থায় সাজা মওকুফকে বেআইনি বলেছেন বাংলাদেশের আইন ও সংবিধান বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, ‘পলাতক অবস্থায় সাজা মওকুফ করা যাবে কিনা আইনে তা স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই।’ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধিতে পলাতক বা পলাতক না এরকম কিছু বলা না থাকলেও আটক বা আত্মসমর্পণ ছাড়া এই সুবিধা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। আত্মসমর্পণ না করে কেউ জামিন বা আপিলেরও সুযোগ পান না। পলাতক আসামি আইনের কোনো সুবিধা পায় না। বাংলাদেশে এই দুইজন বাদে এখন পর্যন্ত কোনো পলাতক আসামি সাজা মওকুফ পাননি। আইনে নেই বলেই সুযোগ পায়নি।’
তিনি সাম্প্রতিক ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বলেন, সিকদার গ্রুপের দুই ভাই রন হক সিকদার ও দিপু হক সিকদার বিদেশে পলাতক অবস্থায় আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন করে উল্টো জরিমানার শিকার হয়েছিলেন। আদালত আইনজীবীকেও ভর্ৎসনা করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘পলাতক অবস্থায় এই দুই ভাইয়ের সাজা মওকুফ করে সরকার সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ করেছে। এই কাজে যারা জড়িত ছিল তারা জেনেশুনে বেআইনি কাজ করেছে। তাদের সবার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত।’ কারো সাজা মওকুফ করতে হলে তার সুনির্দিষ্ট কারণও দেখাতে হবে বলে জানান আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তা না হলে সব দণ্ডপ্রাপ্তই তো সাজা মওকুফের দাবিদার হয়ে উঠবেন। এ ব্যাপারে হাইকোর্টের একটি নির্দেশনাও আছে। তিনি বলেন, ‘‘আইনের সুবিধা পেতে হলে আইনের মধ্যে থাকতে হবে। পলাতক আসামি তো আইনের মধ্যে নেই। তাই পলাতক অবস্থায় তাদের সাজা মওকুফ কোনোভাবেই আইনসম্মত হয়নি।’’ তার মতে, ‘‘এই আইনটির ব্যাপক অপব্যবহার করা হচ্ছে। আইনটির বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে একটি রিট করেছিলাম। কিন্তু তার শুনানিই করা যায়নি। ’’
বিশেষ দিবসেও বাংলাদেশে দণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা মওকুফের রেওয়াজ আছে। সাবেক ডিআইজি প্রিজন মেজর (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী জানান, ‘‘বয়স্ক, সাজা প্রায় শেষ বা কঠিন কোনো রোগে ভুগছেন এমন দণ্ডপ্রাপ্তের সাজা মওকুফ করা হয়। তবে সাধারণভাবে কারাগার থেকে হত্যা, নারী নির্যাতন বা গুরুতর অপরাধে জড়িতদের এই সুবিধার জন্য সুপারিশ করা হয় না। কারাগারের বাইরের ব্যাপার তো আমরা বলতে পারবো না।’’ সাজা মওকুফের আবেদন প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাবে। তারপর আইন মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। 
অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেছেন, আইনে পলাতক থাকা না থাকার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। আত্মসর্পণের বিষয়েও কিছু বলা হয়নি। আইনে স্পষ্ট কিছু নেই। শুধু বলা হয়েছে সরকারের এখতিয়ার। তিনি বলেন, পলাতক অবস্থায় জামিন বা আপিলের সুযোগ আইনে নেই। কিন্তু সাজা মওকুফের ব্যাপারে কিছু বলা নেই।’ আনিস ও হারিসের পলাতক অবস্থায় সাজা মওকুফের ব্যাপারে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে তার পর্যবেক্ষণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারবো না। কাগজ-পত্র না দেখে বলা যাবে না তাদের কী প্রক্রিয়ায় সাজা মওকুফ হয়েছে।
গত ১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত আল জাজিরার প্রতিবেদনে আনিস আহমেদ ও হারিস আহমেদকে ‘পলাতক’ বলা হলেও বাস্তবে ঘটনার সময় তারা পলাতক ছিলেন না, তার আগেই তাদের সাজা মওকুফ করা হয়- একথা প্রথম প্রকাশ করেও আইএসপিআর এবং পরদিন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। আল জাজিরার প্রতিবেদনে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে সেনা প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের সঙ্গে তার পলাতক দুই ভাই আনিস ও হারিসের যে ছবি দেখানো হয়েছে, সেই প্রসঙ্গে ১৬ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমকে সেনাপ্রধান বলেন, ‘‘সেদিন আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে না কোনো সাজা ছিল, না তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল।’’ আগের দিন আইএসপিআর-এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘‘গত ২৯ মার্চ ২০১৯ তারিখে সেনাবাহিনী প্রধানের ছেলের বিবাহোত্তর সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান হয়, যেখানে বিশিষ্ট গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। অথচ তার পূর্বেই সেনাবাহিনী প্রধানের ভাইয়েরা (আনিস এবং হাসান) তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ষড়যন্ত্রমূলক, পরিকল্পিতভাবে দায়েরকৃত সাজানো ও বানোয়াট মামলা হতে যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অব্যাহতি পান। ফলে ২৯ মার্চ ২০১৯ তারিখে সেনাবাহিনী প্রধানের ছেলের বিবাহোত্তর অনুষ্ঠানে তার কোনো ভাই কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত বা পলাতক আসামি অবস্থায় ছিলেন না, বরং সম্পূর্ণ অব্যাহতিপ্রাপ্ত হিসেবেই তারা ঐ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন এবং উক্ত সময়ে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা অনিষ্পন্ন অবস্থায় বা চলমানও ছিল না।’’ 
এই দুই জনের সাজা মওকুফ করা হলেও তা ছিল অনেকটাই গোপন। বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটেও ১৬ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার পর্যন্ত হারিস আহমেদের নাম ও ছবি মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনালের তালিকায় দেখা গেছে। তাদের দুই ভাইয়ের পলাতক অবস্থায় সাজা মওকুফের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী এমনকি আইনমন্ত্রীও স্পষ্ট করে সংবাদমাধ্যমকে কিছু বলতে পারেননি। ডয়চে ভেলের কনফ্লিক্ট জোন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীও পরিষ্কার কিছু বলতে পারেননি। আর তারা যে পলাতক অবস্থায় সাজা মওকুফ পেয়েছেন তার বড় প্রমাণ হলো মওকুফের পর তাদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট প্রত্যাহার করতে বলা। 
যেভাবে সাজা মওকুফ
১৯৯৬ সালের ৭ মে ঢাকার মোহাম্মদপুরে ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান হত্যায় তিন ভাই আনিস আহমেদ, হারিস আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফসহ ছয় জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দেয়া হয়। বিচারে জোসেফ এবং মাসুদের মৃত্যুদণ্ড এবং হারিস ও আনিসসহ তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। জোসেফ কারাগারে আটক থাকায় আপিল করেন। হাইকোর্টের  আপিলে তার মৃত্যুদ  বহাল থাকলেও আপিল বিভাগে সাজা কমে যাবজ্জীবন হয়। হারিছ ও আনিস পলাতক থাকায় তারা আপিলের সুযোগ পাননি। জোসেফকে ২০১৮ সালে রাষ্ট্রপতি সাজা মওকুফ করে দিলে তিনি কারাগার থেকে ছাড়া পান। আর আনিস ও হারিস পলাতক থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ সরকার তাদের সাজা মওকুফ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবে জোসেফের সাজা মওকুফের বিষয়টি ওই সময়ই আলোচনার বিষয় ছিল। গণমাধ্যমে এ নিয়ে লেখালেখিও হয়। কিন্তু হারিছ ও আনিসের সাজা মওকুফের খবরটা প্রকাশিত হয় আল-জাজিরা বিতর্কের মধ্যে আইএসপিআর-এর বিবৃতি এবং সেনা প্রধানের বক্তব্যে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ এবং সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদটি সাজা মওকুফ ও স্থগিত সংক্রান্ত। অবশ্য মৃত্যুদ  মওকুফের বিষয়টি এককভাবে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার। আর এর বিধানটি সুনির্দিষ্ট, কারণ ও অপরাধ স্বীকার করে এর সুযোগ পাওয়া যায়। তাছাড়া এতে সংশ্লিষ্ট বিচারকেরও মতামত প্রয়োজন হয়। 
সাজা মাপ, তবে কেনো গোপন 
নিয়ম অনুযায়ী আদালত কর্তৃক কোনো দি ত আসামির সাজা মওকুফ হলে তিনি অন্যদের মতোই সাধারণ নাগরিকের মতো চলতে পাবরেন। এতে কোনো আইনি বাধা নেই। কিন্তু দেশের দুইজন নাগরিকের সাজা মওকুফ হওয়ার পরও তা নিয়ে লুকোচুরি হয়েছে। দণ্ড মওকুফের খবর তা কেউ জানতে পারেনি, গোপন রাখা হয়েছে। শুধু সাধারণ মানুষ বা গণমাধ্যমের কাছে বিষয়টি গোপন ছিল এমনটি নয়, এ ঘটনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরাও জানেন না বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। আল জাজিরার “অল দ্যা প্রাইম মিনিস্টারস ম্যান” শিরোনামের প্রতিবেদনে যে দুই জনকে পলাতক এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী এবং গ্যাংস্টার বলা হয়, তারা দেশের আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হলেও ২০১৯ সালে তারা সাজা থেকে মাফ পেয়েছেন। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, ২০১৯ সালে ফেব্রুয়ারিতে যে সাজা মওকুফ করা হয়েছে সেই সাজা মওকুফ নিয়ে লুকোচুরি কেন? সর্বশেষ গত ১৫ ফেব্রুয়ারিতেও পুলিশের ওয়েবসাইটে যে মোস্ট ওয়ান্টেডদের তালিকায় ছিল হারিছের নাম। একই সাথে ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের যারা রেড অ্যালার্টে আছে তাদের তালিকাতেও হারিছ আহমেদের নাম। যখন সাজা মওকুফ করা হলো সাথে সাথে এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো এই সাজা মওকুফের ব্যাপারটি সকলকে অবহিত করা। ২০১৮ সালে ২৭ মে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত জোসেফের সাজা মওকুফ করেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই সাজা মওকুফ করেন। জোসেফ দণ্ডিত হয়েছিলেন ১৯৯৬ সালে ৭ মে ফ্রিডম পার্টির নেতা মোস্তাফিজুর রহমানকে হত্যার অভিযোগে। দেখা যাচ্ছে যে, জোসেফের দণ্ড মওকুফের ঠিক ৯ মাস পরে ২০১৯ সালে ফেব্রুয়ারিতে হারিছ এবং আনিস আহমেদেরও দণ্ড মওকুফ করা হয় এবং এই দণ্ড মওকুফ করা হয় ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারার ক্ষমতাবলে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার যদি এরকম অভিপ্রায় ব্যক্ত করে তাহলে যে কোনও শর্ত দিয়ে অথবা শর্তহীনভাবে যেকোনও মানুষের দণ্ড হ্রাস, স্থগিত বা মওকুফ করতে পারেন। এই নির্দেশনাটি যে আদালতে তাদের দণ্ড হয়েছিল সেই আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে যে গ্রেফতারি পরোয়ানা সেই গ্রেফতারি পরোয়ানা ফেরত নেয়া হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হলো- এতোকিছু করা হলেও পুলিশের খাতা থেকে তাদের নাম কেন প্রত্যাহার করা হয় নি এবং ইন্টারপোলকেও কেন এই বিষয়টি অবহিত করা হয় নি। এটি নিয়ে লুকোচুরি কেন সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। 
যা বললেন সেনাপ্রধান
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আর্মি অ্যাভিয়েশন গ্রুপে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। তখন আল-জাজিরার একটি প্রতিবেদন নিয়ে সাংবাদিকদের কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। এ সময় সেনাবাহিনী প্রধান বলেন “সেনাপ্রধানকে হেয় করা মানে প্রধানমন্ত্রীকে হেয় করা” তিনি আরও বলেছেন, ‘কেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধানকে টার্গেট করা হচ্ছে। এ প্রশ্নের জবাব আমি আপনাদের ওপর ছেড়ে দিলাম। বুঝে নেন, খুঁজে নেন। কেন, কারণ এ সেনাপ্রধানকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন, সেনাপ্রধানকে হেয় করা মানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে হেয় করা।’
সেনাপ্রধান বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মতো একটি প্রতিষ্ঠান, যেটা জাতির গর্ব, দেশের গর্ব, এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার চলছে। সেনাবাহিনী একটি প্রশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল বাহিনী, আগের চেয়ে অনেক বেশি সুসংহত। সেনাবাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’ অত্যন্ত কার্যকরী এবং সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্য ঘৃণাভরে এ ধরনের অপচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদন প্রসঙ্গে সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমাদের চেইন অব কমান্ডে যারা আছেন, তাদের সবাই এ ব্যাপারে সতর্ক আছি। সেনাবাহিনীতে এ ধরনের অপপ্রচার বিন্দুমাত্র আচ আনতে পারবে না। সেনাবাহিনী দেশের সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সংবিধানকে সমুন্নত রাখার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ, বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অনুগত। বর্তমান সরকারের যে কোনো আদেশ, নির্দেশ পালনে সদা প্রস্তুত। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ, বহির্বিশ্বে যেকোনো সমস্যা মোকাবিলার জন্য সাংবিধানিকভাবে আমরা শপথবদ্ধ।’ তিনি বলেন, ‘আমার কারণে আমার প্রতিষ্ঠান, আমার অরগানাইজেশন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং আমাদের সরকার যেন কোনোভাবে বিব্রত না হয়, বিতর্কিত না হয়, সে বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ সচেতন আছি।’
আল জাজিরার প্রতিবেদন নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, ‘আপনার বিরুদ্ধে মামলা আছে, সাজা আছে, কিন্তু গতকাল যদি আপনার বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা না থাকে, তাহলে আপনাকে কি আজ ফিউজিটিভ (পলাতক) বলা যাবে? আপনাকে কি সাজাপ্রাপ্ত বলা যাবে? যখনই আপনি অব্যাহতি পেয়ে যান কোনো একটা চার্জ থেকে, তার পরের দিন থেকে আপনি যেকোনো মুক্ত নাগরিকের মতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার ভাইদের সম্পর্কে যে অপপ্রচার হয়েছে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। খুব শিগগির আমার পরিবারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে একটি সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হবে। সেনাপ্রধান হিসেবে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি, আমার অবস্থান, দায়িত্ব সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ সচেতন।’ মালয়েশিয়াতে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করা প্রসঙ্গে সেনাপ্রধান বলেন, ‘
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১মার্চ ২০২১ প্রকাশিত)