সোমবার, ১২-এপ্রিল ২০২১, ০৫:৫৪ অপরাহ্ন

দুদক কী এবার দুর্নীতির ‘দায়মুক্তি পাবে? 

shershanews24.com

প্রকাশ : ৩০ মার্চ, ২০২১ ০১:৫২ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: বিগত সময়ে দেশে দুর্নীতি বিরোধী সভা-সেমিনার হয়েছে অনেক। দুর্নীতিবাজদের ধরতে একের পর এক চালানো হয়েছে অভিযানও। কিন্তু দুর্নীতি কী কমেছে? কমেনি। উল্টো দুর্নীতি দমনের জন্য প্রতিষ্ঠিত সংস্থা স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনের বিরুদ্ধেই একের পর এক অভিযোগের আঙ্গুল উঠেছে। খোদ প্রতিষ্ঠানটি নিজেরাই জড়িয়ে পড়ছে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি আর বিতর্কিত সব কর্মকা-ে। সদ্য বিদায়ী দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ দুদকের দায়িত্ব নেওয়ার সময় দুর্নীতি দমনে তার নানা পরিকল্পনার কথা জানালেও তিনি বিদায় নিয়েছেন ব্যর্থতার গ্লানী নিয়ে। শুধু তাই নয়, তার নেতৃত্বাধীন কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ভয়ঙ্কর সব অভিযোগ উঠেছে তার আমলেই। কোনো কোনো অভিযোগের বিষয়ে মামলা হয়েছে, তদন্ত হয়েছে এবং এখনো চলছে। দুদকের বিরুদ্ধে ওঠা বহু অভিযোগ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে ইতোমধ্যে প্রমাণিতও হয়েছে। দুদকের একজন পরিচালক ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। একজন দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীকে ২০ কোটি টাকার বিনিময়ে দায়মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দুদকের বিরুদ্ধে। তাছাড়া সরকারি টাকা আত্মসাতকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়ার মামলার বড় আসামিদের টাকার বিনিময়ে চার্জশিট থেকে নাম বাদ দিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটাচ্ছে দুদক। ক্রমেই দুদকের ছোট বড় সব কর্মকর্তারাই জড়িয়ে যাচ্ছেন ঘুষ ও দুর্নীতিতে। কোনো পরিচালক ঘুষ নেওয়ার দায়ে জেলে, কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত হচ্ছে, তাছাড়া কোনো কোনো অভিযোগের তীর দুদক কমিশনার ও চেয়ারম্যানের দিকেও বর্তায়। বিশেষ করে শত শত দুর্নীতিবাজদের ‘পাপমোচন’ বা দায় মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ সরাসরি দুদকের বিদায়ী চেয়ারম্যানের ওপর বর্তায় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কেননা প্রশ্ন উঠছে, চেয়ারম্যানের নলেজের বাইরে কাউকে দায়মুক্তি দেওয়ার সুযোগ আদৌ আছে কি? নিরীহদের সঙ্গে বড় বড় দুর্নীতিবাজদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া ঘটনায় সমালোচনার শীর্ষ রয়েছেন ইকবাল মাহমুদ। এই দায় মুক্তিতে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলেও খবর বেরোচ্ছে। এ নিয়ে উচ্চ আদালতও দুদকের ব্যাখ্যা তলব করেছে। আর এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভুল তদন্তে নির্দোষ ব্যক্তির জেলখাটা। দুদকের ভুল তদন্তে জাহালম ও কামরুলরা জেলখাটছেন, অহেতুক হয়রানির শিকারও হচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞজনরা বলছেন, তদন্ত কর্মকর্তারা হয় অযোগ্য না হয় অবৈধ সুবিধা নিয়ে ইচ্ছাকৃত ভুল করছেন। ‘আর যা সরল বিশ্বাসে ভুল’ বলে চালিয়ে দিচ্ছে দুদক। 
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে দুর্নীতি কমাতে কাজ করবে দুদক এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ তো করছেই না বরং উল্টো নিজেরা দুর্নীতি করছে, ঘুষ নিয়ে দুর্নীতিবাজদের দায়মুক্তি দিয়ে দিচ্ছে। সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে বিশ্লেষকরা বলছেন- সদ্য বিদায়ী দুদক চেয়ারম্যান এর দায়িত্বের আমলে দুর্নীতি কমেনি, বরং বেড়েছে। বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে ইকবাল মাহমুদের দেওয়া বক্তব্যে নানাভাবে বিশ্লেষণ করেছেন অভিজ্ঞরা। দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে তিনি যে আপোস করেছিলেন এটি তার কথাই উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় নাকি এ আপোস করেছিলেন। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে দেশের ভাবমূর্তি কিভাবে ক্ষুণœ হয় এমন প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। শুধু দুদক চেয়ারম্যানের বক্তবই নয়, অব্যাহত দুর্নীতি বৃদ্ধির প্রবণতার প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে তীব্র সমালোচনা। অসংখ্য সমালোচকের একজন বলছিলেন, বাংলাদেশে যে পরিমাণে দুর্নীতি হচ্ছে তাতে দেশটি দুর্নীতিবাজ দেশের তালিকায় এক নম্বরে থাকার কথা ছিল, কিন্তু তালিকা দেখে মনে হচ্ছে তালিকা তৈরির কাজেও দুর্নীতি হচ্ছে। 
বিগত সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থেকেছে দুর্নীতি দমনে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনের দুর্নীতি। দুর্নীতি এবং নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে খোদ সরকারের উচ্চ আদালতই অসংখ্যবার তিরষ্কার, এমনকি কখনো কখনো নাজেহালও করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনকে। ইতিমধ্যে দুদকের শীর্ষ দু’টি পদে পরিবর্তন হয়েছে। যার কর্মকাণ্ড নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক আর অভিযোগ ছিল সেই চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বিদায় নিয়েছেন। দুদকের যখন নাজুক অবস্থা এমন পরিস্থিতিতে এসেছেন নতুন চেয়ারম্যান। তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেকেরই প্রশ্ন, স্বাধীন দুনীতি দমন কমিশন- দুদক কি এবার নিজের দুর্নীতির দায়মুক্তি পাবে? সাধারণ সচেতন মানুষ কি দুদকের কমর্কাণ্ডে সামনের দিনগুলোতে আস্থা রাখতে পারবে? 
ঘুষ দিলেই ‘পাপ মোচন’
এক সময় সরকারের একটি সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দুর্নীতি দমন ব্যুরো। যা পরে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনে রূপ নেয়। দুর্নীতি দমনে কার্যকর ভূমিকা পালনের লক্ষ্যেই দাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শে ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর এই স্বাধীন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই কমিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। বিভিন্ন সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তাদের ঘুষ-দুর্নীতির খবর জানাজানি হয়েছে। বিদায়ী কমিশনের কার্যকালে দুদকের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ৩২টি মামলায় পাটকল শ্রমিক নিরীহ জাহালমের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে ৩ বছর কারাবাস করানোসহ বেশ কিছু ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হয় দুদকের। এরই মধ্যে একজন জেলা রেজিস্ট্রারকে অব্যাহতি প্রদানের কথা বলে সহকারী পরিচালক মো. আলমগীর হোসেনের ঘুষ দাবির ঘটনায় গত ২ মার্চ হাইকোর্ট অডিও-ভিডিও রেকর্ড তলব করেছে। এছাড়া গত পাঁচ বছরে ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুট, হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া এবং বেসিক ব্যাংকসহ বৃহৎ দুর্নীতি-লুটপাটে চিহ্নিতদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার ঘটনায়ও ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন এখন উচ্চ আদালতের কাঠগড়ায়। তাছাড়া তদন্ত প্রতিবেদন পাল্টে দেওয়ার জন্য দুদকের একজন পরিচালক যখন ঘুষ নেন, আর এই ঘুষ দাতা যখন স্বয়ং পুলিশের একজন ডিআইজি তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে দুদকের সচ্ছতা নিয়ে যে প্রশ্ন পূর্বে থেকে ছিল তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। ২০১৯ সালের মাঝামাঝিতে পুলিশের সাবেক একজন ডিআইজি অভিযোগ তুলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন পরিচালক তার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তখন দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন উঠে, দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ? কমিশনের তদন্ত কর্মকর্তা চাইলেই কি তাঁর ইচ্ছেমতো ঘুষের বিনিময়ে কাউকে রেহাই কিংবা কাউকে ফাঁসিয়ে দিচ্ছে? ঘুষের ঘটনা ফাঁস করতে গিয়ে ডিআইজি নিজেও এখন জেলে আছেন। তিনি নিজেও হয়তো বুঝতে পারেননি, ঘটনা ফাঁস করলে তাকেও জেলে যেতে হবে। কিন্তু দুদক কর্মকর্তাদের এমন অনেক ঘুষ লেনদেনের নজির মানুষের মুখে মুখে রয়েছে, যেগুলো প্রমাণসহ ফাঁস হচ্ছে না। কারণ, ফাঁস করতে গেলে যিনি ফাঁস করবেন তাকেও বিপাকে পড়তে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কোন ব্যক্তির কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে তাকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে রেহাই দেওয়া, কিংবা কেউ ঘুষ না দিলে তাকে দুর্নীতির অভিযোগ ফাঁসিয়ে দেওয়ার যথেষ্ট ক্ষমতা দুর্নীতির দমন কমিশনের তদন্ত কর্মকর্তার হাতে রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত কর্মকর্তারা যেভাবে তদন্ত করে চার্জশীট আদালতে জমা দেন, সেটির উপর ভিত্তি করে মামলার কার্যক্রম চলে। আর এই সুযোগটিই দুদক কর্মকর্তারা ব্যবহার করছেন। 
অতি সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক মো. আলমগীর হোসেন ঘুষ চেয়েছেন  পিরোজপুর জেলা রেজিস্ট্রার (ডিআর) আবদুল কুদ্দুস হাওলাদার এর কাছে। এ বিষয়ে একটি রিটও দায়ের করা হয় আদালতে। আবদুল কুদ্দুস হাওলাদার এই রিট আবেদন করেন। এই জেলা রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এক মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের ওই সহকারী পরিচালক মো. আলমগীর হোসেন। জেলা রেজিস্ট্রার তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার তদন্ত কর্মকর্তার (দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আলমগীর হোসেন) পরিবর্তন চেয়ে হাইকোর্টে ওই রিট আবেদন। সেই রিটের শুনানি হয়েছে গত ২ মার্চ। রিটের ওপর শুনানিতে আদালত জানতে চান, কেন তিনি (জেলা রেজিস্ট্রার) তদন্ত কর্মকর্তার পরিবর্তন চাচ্ছেন। জবাবে জেলা রেজিস্ট্রারের পক্ষের আইনজীবী আদালতকে বলেন, ওই তদন্ত কর্মকর্তা জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে ঘুষ চেয়েছেন। তখন আদালত জানতে চান কোনো প্রমাণ আছে? জবাবে আইনজীবী বলেন, তাদের কাছে অডিও এবং ভিডিও রেকর্ড আছে। তখন আদালত ওই অডিও-ভিডিও দাখিল করতে বলেন। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের আওতাধীন ২২টি খেয়াঘাটের রাজস্ব আদায় করে তা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এই মামলার জামিন শুনানিতে ঊর্ধ্বতনদের বাদ দিয়ে অধস্তনদের আসামি করা হয়েছে। এ নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন ওঠায় দুদক খুলনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক নাজমুল হাসানসহ চারজনকে তলব করেছেন হাইকোর্ট। 
অপরদিকে আরেক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদফতরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ও বর্তমানে হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ডিজি মো. আশরাফুল আলম এবং তার স্ত্রী সাবিহা আলমের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের নেপথ্যের গল্প নিয়ে। তার বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির সীমাহীন অভিযোগ থাকা অবস্থায় তিনি প্রমোশন নিয়ে রংপুর থেকে গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী পদে আসীন হন। তখন এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। লোকমুখে আলোচনা হয় ওই সময় এ প্রমোশন নিতে তিনি নাকি কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করেছিলেন। কোটি কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে তিনি প্রধান প্রকৌশলীর পদ নেওয়া পর এ নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ব্যাপক লেখালেখি হয়। শুধু গণপূর্তই নয়, সরকারি অনেক দফতরেই তাকে নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেউ। দুদকের অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আশরাফ দম্পতির সম্পদ বিবরণী চাওয়া হয়। সম্পদ বিবরণী দাখিল করলে সেটি যাচাই শেষে অনুসন্ধান কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক মো. সাইদুজ্জামান তাদের বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদ খুঁজে পান। এ প্রেক্ষাপটে উভয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর ২৬ (২) এবং ২৭(১) ধারায় মামলা রুজুর সুপারিশ করেন তিনি। পরবর্তীতে ‘উপরের নির্দেশে’ ওই প্রতিবেদনটি প্রত্যাহার করেন তিনি। প্রতিবেদন পরিবর্তন করে উভয়কেই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এ ঘটনার নেপথ্যে লেনদেন হয় অন্তত : ২০ কোটি টাকা। এ টাকা দুদকের একজন মহাপরিচালক, পরিচালকসহ শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা, কমিশনের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের মধ্যে ভাগাভাগি হয় বলে খবরে প্রকাশ পায়। প্রকৌশলী আশরাফুল আলম এবং তার স্ত্রীকে দায়মুক্তি দেয়ার নেপথ্যে ২০ কোটি টাকা লেনদেনের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায় থেকে নি¤œতম যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জড়িত ছিলেন তাদের মাঝে ভয় বিরাজ করছে। এ ইস্যুতে কখন কে জড়িয়ে পড়বেন এ আশঙ্কায় আশরাফুলের কাছে থেকে সুবিধাভোগীদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে। এমন এক সময় আশরাফুলের বিষয়টি সামনে এসেছে যখন দুদকের বিগত পাঁচ বছরের কীর্তিকলাপ নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠছে। প্রতিষ্ঠানটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। প্রশ্নগুলোও তখনই উঠছে- যখন অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে ইকবাল মাহমুদ বিদায় নিচ্ছিলেন। 
রাঘব বোয়ালদের দায়মুক্তি, তালিকা চাইলেন হাইকোর্ট 
বর্তমান সরকারের গত মেয়াদে একটি মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী ছিলেন, এখন তিনি আর উপমন্ত্রী নন, তবে এখনো সংসদ সদস্য। তার নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষ ও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা জানেন, অতিমাত্রায় দুর্নীতির কারণে তাকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নই দিতে চাননি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজে ওই এমপিকে এতো বেশি ‘পারসেন্টেনজ’ দিতে হয়, যা অন্য কাউতে দিতে হয় না। বরাদ্দের ২০ শতাংশ দিতে হয় এমপিকে। এর ব্যতিক্রম ঘটলে ঠিকাদারদের কাজের সাইট বুঝিয়ে দেন না উপজেলার প্রকৌশলীরা। এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে ওই এমপির বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেন ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা। আওয়ামী লীগ সরকারের ওই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সীমাহীন অভিযোগ থাকার পরও তিনি রয়েছেন বহালতবিয়তে। তার কোনো দণ্ড হয়নি, উল্টো দুর্নীতির একটি অভিযোগ থেকে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দায়মুক্তির সার্টিফিকেট পেয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের ওয়েবসাইটে এ দায়মুক্তির খবর প্রকাশও করা হয়েছে। এভাবে শত শত রাজনীতিক, আমলা ও প্রতিষ্ঠান দায় মুক্তি পেয়েছেন। 
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ শত শত দুর্নীতিবাজকে দায়মুক্তি দেওয়ার খবরটি। যা নিয়ে অভিজ্ঞ মহলে তীব্র সমালোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, বিদায়ের আগে দুর্নীতির বহু রাঘব বোয়ালকে ছেড়ে দেন ইকবাল মাহমুদ। তাদের দায়মুক্তি জায়েজ করতে ইকবাল মাহমুদ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন কিছু নিরীহ ব্যক্তিকে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, বিদায় নেওয়ার আগের ৫ মাসে অন্তত ২ শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি (দায়মুক্তি) দেন তিনি। ইকবাল মাহমুদ যাদের দায়মুক্তি দিয়েছেন তাদের মধ্যে সোনা ও হীরা চোরাচালানের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা সম্পদ অর্জন এবং ভারতে অর্থ পাচারের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দিলীপ কুমার আগরওয়ালও রয়েছেন। তিনি ‘ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড’ এবং ‘সফার্স’র মালিক। এছাড়া বহুল আলোচিত কাস্টমস কমিশনার নূরুল ইসলাম, সিভিল এভিয়েশনের প্রধান প্রকৌশলী শুধেন্দু গোস্বামী, পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ও পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস লি: এর তৎকালীন পরিচালক ও চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন মোয়াজ্জেম হোসেন, বাপেক্স’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (তিতাসের সাবেক এমডি) নওশাদুল ইসলাম, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নূরুল হুদা, এলজিইডি’র সাবেক প্রধান প্রকৌশলী খলিলুর রহমান, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. কফিলউদ্দিন, প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশন,’ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে এলজিইডি’র প্রকল্প, দুদক উপ-পরিচালক আব্দুছ ছাত্তার সরকার, জনস্বাস্থ্যের নির্বাহী প্রকৌশলী নূরুল কবীর ভুইয়া, সওজ’র নির্বাহী প্রকৌশলী সেলিম আজাদ খান, রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী ছাইদুর রহমান, একই প্রতিষ্ঠানের মো. সিরাজুল ইসলাম, সওজ’র নির্বাহী প্রকৌশলী শাহরিয়ার শরীফ খান, ঢাকা ওয়াসার প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম, সাউথ-ইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হারুনুর রশীদ, ডি বিল্ডার্স অ্যান্ড প্রপার্টিজ লি:’র মালিক মো. সরোয়ার খালেদ, প্রাণি সম্পদ অধিদফতরের প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. বেলাল হোসেন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক কাজী মোস্তফা সারোয়ার, কাস্টমস কমিশনার (রাজস্ব) ড. মো. সহিদুল ইসলাম, উপ-প্রধান বন সংরক্ষক মো. শফিউল আলম চৌধুরী, বিডিবিএল’র এমডি মঞ্জুর আহমেদ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, গোয়াইনঘাটের সাব-রেজিস্ট্রার স্বপ্না বেগম, স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের ক্যাশিয়ার মো. দেলোয়ার হোসেন, বিয়ানী বাজারের উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান খান, গণপূর্তের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা একেএম মজিবুর রহমান, যুগ্ম-সচিব মো. আবুল হাসনাত হুমায়ুন কবীর, পুলিশ ইন্সপেক্টর মাহবুবুল আলম ভুইয়া, পুলিশ ইন্সপেক্টর সাইদুর রহমান, সিটি ব্যাংকের ডিএমডি মো. ওয়াদুদ, আশুলিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার গাজী মো. আবদুল করিম, চট্টগ্রাম সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডকীপার বাবু ভজন বৈদ্য, বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড’র ম্যানেজার (নাম জানা যায়নি), বিআরটিএ, ঢাকার সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মো. শামসুল কবির, একই অফিসের মোটরযান পরিদর্শক মো. রিয়াজুল ইসলাম ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম দুদকের দায়মুক্তি পেয়েছেন এই সময়ে। এই ‘দায়মুক্তি ব্যবসা’র কৃতিত্ব সদ্য বিদায় নেওয়া দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের। 
জানা গেছে, এসব অভিযোগ ‘পরিসমাপ্তি’র চিঠির অধিকাংশগুলোতেই স্বাক্ষর করেন দুদক মহাপরিচালক (বিশেষ অনু:-তদন্ত) সাঈদ মাহবুব খান। কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ থেকে ইকবাল মাহমুদ বিদায় নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ পরই দুদকে ‘অনুসন্ধান-বাণিজ্য’ ও পাঁচ মাসে দায়মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকা চাইলেন হাইকোর্ট। গত ১৬ মার্চ বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার এবং বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীমের ডিভিশন বেঞ্চ এ তালিকা চান। এ তথ্য জানান দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বিগত ৫ মাসে দুর্নীতির অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কতজনকে অব্যাহতি দিয়েছেন সেই তালিকা চেয়েছেন হাইকোর্ট। আদেশের বিষয়ে ওই বেঞ্চের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক জানান, গত ৫ মাসে কতজনকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন তার একটি তালিকা বিদায়ী চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের কাছে চেয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী ১১ এপ্রিলের মধ্যে এ তালিকা দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ‘সোর্স ও তথ্য-প্রমাণ’ সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদককে দাখিলেরও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
দুদকের ভুল কী ইচ্ছাকৃত?
মামলায় নামের ভুল বা ঠিকানা ভুল থাকার কারণে নিরাপরাধ ব্যক্তির বছরের পর বছর গ্রেপ্তার থাকার বেশ কয়েকটি ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। দুদকের কারণে কোনো ধরণের দোষ না করেও জেল খাটতে হয়েছে পাটকল শ্রমিক জাহালমকে। বিনাদোষে তার জেলখাটার খবর বহুল আলোচিত একটি ঘটনা। দুদকের একই ধরনের ‘সরল বিশ্বাসে’র তদন্তের জেরে এর আগে ১ হাজার ৯২ দিন জেল খেটে মুক্তি পান নিরাপরাধ জাহালম। ২০১৯ সালে জাহালমের সাজা খাটার বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। উচ্চ আদালত জাহালমকে মুক্তির আদেশ দেওয়ার সময় দায়িত্বহীনতার জন্য দুদককে তিরস্কার করেছিল। কিন্তু শুধু কি জাহালম একা এমন দুর্বিসহ ঘটনার শিকার? না তা নয়- এবার দুদকের ভুল তদন্তের শিকার নোয়াখালীর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতের সহকারী, নিরপরাধ মো. কামরুল ইসলাম। ঠিকানার ভুলে সনদ জালিয়াতি মামলায় ১৫ বছরের সাজা হলো নোয়াখালীর নির্দোষ কামরুলের। ভুল স্বীকার করে হাইকোর্টে ক্ষমা চেয়েছে দুদক। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী রিট করেছেন আদালতে। রায়ও তার পক্ষে এসেছে। তার সাজা বাতিল হয়েছে। এসএসসির সনদ জালিয়াতি করে ২০০০ সালে নোয়াখালীর মাইজদী কলেজে ভর্তি হন কামরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। এ ঘটনায় ২০০৩ সালে তার বিরুদ্ধে মামলা করে তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো। ১০ বছর পর চার্জশিট দেয় দুদক। ১৫ বছরের সাজা হয় কামরুলের। এ পর্যন্ত সব স্বাভাবিক মনে হলেও দুদকের ভুলে শাস্তির খড়গ গিয়ে পড়ে নির্দোষ আরেক কামরুলের ওপর। ঘটনার শুরু আসামির ঠিকানা নিয়ে। প্রকৃত আসামি পশ্চিম রাজারামপুরে হলেও দুদক লেখে পূর্ব রাজারামপুর। যা বহাল রাখা হয় চার্জশিটেও। এতেই ফেঁসে যান পূর্ব রাজারামপুরের নির্দোষ কামরুল। প্রকৃত আসামি কামরুলের জন্ম ১৯৭৭ সালে আর নির্দোষ কামরুলের জন্ম ১৯৯০ সালে। দুদকের হিসাবে ৮ বছর বয়সে এসএসসি পাশ করেছেন নির্দোষ কামরুল। 
ভুল তদন্তের ব্যাপারে দুদকের আইনজীবীর বক্তব্য ছিল, তদন্তকারী কর্মকর্তা ‘সরল বিশ্বাসে’ ভুল করেছেন। মানবাধিকার কর্মীরা বলেছেন, সংশ্লিষ্ট আইনে থাকা ‘সরল বিশ্বাসে ভুলের’ কথা তুলে ধরে এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটিয়ে তদন্তকারীরা অনেকে ইচ্ছাকৃত অপকর্ম করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন। ‘সরল বিশ্বাস’ কীভাবে প্রমাণ করা সম্ভব- এই প্রশ্নও রয়েছে মানবাধিকার কর্মীদের। এর আগেও দুদকের মামলায় বিনা দোষে নরসিংদীর একজন পাটকল শ্রমিক জাহালমের তিন বছর জেলে থাকার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছিল। ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের একটি মামলায় অভিযুক্তের নামের সাথে না মিললেও জাহালমকে সাজা দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে খবর আসার প্রেক্ষাপটে হাইকোর্টের নির্দেশে তিন বছর জেল খাটার পর জাহালম মুক্তি পান ২০১৯ সালে। তখন দুর্নীতি দমন কমিশন ঘটনা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু আজও সেই তদন্তের ফলাফল প্রকাশ হয়নি। এখন মোহাম্মদ কামরুল ইসলামের ঘটনায় তদন্তের ভুলের জন্য হাইকোর্ট তদন্তকারী কর্মকর্তারা বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে। বলেছে, ভুল অনিচ্ছাকৃত কিনা- তা খতিয়ে দেখা হবে।  দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক আবারো নির্দোষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল ও সাজার ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রতিষ্ঠানটির পেশাদারিত্ব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এ ঘটনা উদ্ঘাটনের পর দুদকের ‘সরল বিশ্বাসের’ ব্যাখ্যাকে দায় এড়ানোর অর্থহীন প্রয়াস আখ্যা দিয়ে সংশ্লিষ্টদের কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিতের মাধ্যমে দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।  জাহালমের ঘটনার প্রেক্ষিতে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে একদিকে যেমন এ জাতীয় অগ্রহণযোগ্য ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হতো, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদকের দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাও পুনরায় প্রশ্নবিদ্ধ হতো না বলেও মনে করছে সংস্থাটি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, “ভুল তদন্তের মাধ্যমে জালিয়াতি মামলায় মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল ও সাজার ঘটনায় দুদক কর্তৃক উচ্চ আদালতে ভুল স্বীকার এবং মামলার এজাহার থেকে তদন্ত সকল পর্যায়ে ভুল হয়েছে মর্মে দুদকের আইনজীবীর স্বীকারোক্তিই প্রমাণ করে, প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদকের পেশাদারিত্ব কতটা দুর্বল ও অদক্ষতায় ভরা।” তিনি বলছেন, “জাহালমের ঘটনা থেকে দুদক শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। একটি ঘটনার তদন্ত কাজ ১০ বছর ধরে চলেছে এবং বারবার তদন্ত কর্মকর্তার পরিবর্তন হওয়া সত্ত্বেও একজন নির্দোষ মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিলের ঘটনা ‘সরল বিশ্বাসে’ ঘটেছে বলে আদালতে দুদকের বয়ান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরং পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহির চূড়ান্ত ঘাটতির ফলে জাহালমের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।”
দুদক কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব চাইলেন আদালত  
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির কোনো অভিযোগ আসলে এবং এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত হলে শুরুতেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পদের বিবরণী জানতে চায় দুদক। এতে পান থেকে চুন খসলেই নাজেহাল হতে হয় অনেককে। অথচ সেই দুদকেরই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণী নেই। বিষয়টি নজরে এসেছে উচ্চ আদালতের। আদালত এবার দুদক কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব চেয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অব্যাহত দুর্নীতি ও ঘুষগ্রহণের অভিযোগ আসার পর এবার উচ্চ আদালত খোদ কমিশনের কর্মকর্তাদের সম্পত্তির বিবরণ প্রকাশের কথা বলেছেন। গত ২৮ জানুয়ারি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের কাছ থেকে এমন নির্দেশনা আসে। বিচারপতি বলেন, আমরা তো চাই কমিশন সবাইকে নোটিস দিক। সবারই সম্পত্তির হিসাব দেওয়া উচিৎ। আর এতে দুদকের গ্রহণযোগ্যতাই বাড়বে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “যদি কমিশনের কমিশনাররাসহ সমস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী জনসমক্ষে হিসাব বিবরণী প্রচার করে কাজ করেন, তাহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা মানুষের কাছে আরও বেশি বেশি বাড়বে।”
পিকে হালদারকে বিদেশ পাঠিয়েছে দুদক
আলোচিত পিকে হালদার প্রসঙ্গে হাইকোর্ট বলেছেন, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত চিঠি ১৩ ঘণ্টা পর ইমিগ্রেশনে পাঠিয়ে পিকে হালদারকে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে স্বয়ং দুদকই। পিকে হালদার কাণ্ডে জড়িত আনান কেমিক্যাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের আবেদনের শুনানির সময় গত ১১ মার্চ বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন। এ সময় আদালত ইন্টারনেটের যুগে এসেও একটি চিঠি পাঠাতে এত সময় লাগানোর কারণে কড়া সমালোচনা করেন। আদালতে দুদকের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মো. খুরশীদ আলম খান। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সরোয়ার হোসেন বাপ্পী। এর আগে গত ১ মার্চ ইমিগ্রেশন পুলিশ হাইকোর্টকে জানায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নয়, যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সড়ক পথে দেশত্যাগ করেছেন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদার। ইমিগ্রেশন পুলিশ আদালতকে আরও জানান, ২০১৯ সালের ২২ অক্টোবর দুদক ইমিগ্রেশন পুলিশকে জানানোর জন্য বিশেষ শাখার (এসবি) সদর দফতরকে চিঠি দেয় যেন পি কে হালদার দেশ ত্যাগ না করতে পারেন। এসবি সদর দফতর দুদকের ওই চিঠি হাতে পায় ২৩ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টায়। ওইদিন বিকাল ৫টা ৪৭ মিনিটে ইমিগ্রেশন পুলিশের সব শাখায় চিঠির কপি পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে ইমিগ্রেশন পুলিশ চিঠি পাওয়ার দুই ঘণ্টা ৯ মিনিট আগেই (২৩ অক্টোবর, বিকাল ৩টা ৩৮ মিনিটে) পি কে হালদার বেনাপোল দিয়ে দেশত্যাগ করেন। অর্থাৎ পিকে হালদারের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির চিঠি পাওয়ার আগেই তিনি দেশ ত্যাগ করেন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদারের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও কীভাবে দেশত্যাগ করলেন তা জানতে চান পৃথক হাইকোর্ট বেঞ্চ। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মহিউদ্দিন শামীমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। একইসঙ্গে পিকে হালদার যেদিন দেশত্যাগ করেছিলেন, সেদিন বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনের দায়িত্বরতদের এবং দুদকের দায়িত্বে কে কে ছিলেন, তারও তালিকা দাখিল করতে বলেন আদালত।
পানামায় নাম আসারাও অন্তরালে 
বাংলাদেশের টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে অহরহ। এসব টাকার বেশিরভাগই অর্জিত হয়েছে ঘুষ-দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে। বিভিন্ন সময় এসব অর্থপাচারের খবর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে পানামা পেপার্স ও প্যারাডাইস পেপারসে প্রকাশিত অর্থপাচারের তালিকায় বাংলাদেশের অনেকেরই নাম এসেছে। এরা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন এবং কেউ কেউ ব্যবসায়ী। ২০১৬ সালে পানামার ল’ ফার্ম মোসাক ফনসেকার ১১.৫ মিলিয়ন নথি এবং ২ দশমিক ৬ টেরাবাইট তথ্য যা ই-মেইল, আর্থিক বিবরণী, পাসপোর্ট এবং কর্পোরেট নথি আকারে ছিল। আইনবিষয়ক সংস্থা মোসাক ফনসেকার কাছ থেকে প্রকাশ হয়ে যাওয়া তথ্যে অনেক কাগুজে প্রতিষ্ঠানের খদ্দেরদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ১৯৭৭ থেকে ২০১৬ অবধি নিজেদের আয়ের সঠিক তথ্য গোপন করেছেন। গোপনে অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে ‘কর-স্বর্গ’ হিসেবে পরিচিত ইউরোপের দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে প্রভাবশালী নানা ব্যক্তিদের অর্থ রাখার তথ্য প্রকাশিত হয় এতে। এসব তথ্য প্রকাশের পর বিশ্বে তোলপাড় হয়। বিভিন্ন দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ পদত্যাগ করেন। পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফ সরকারের পতন হয়। ‘পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারি’তে ৫৬ বাংলাদেশি ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের তথ্যও প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে রয়েছেন, শাসক দল আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলির সদস্য জাফরুল্লাহ, তার স্ত্রী নীলুফার জাফরুল্লাহ, মোবাইল ফোন কোম্পানি সিটিসেল’র প্রধান নির্বাহী মেহবুব চৌধুরী, আইজিডব্লিউ অপারেটর সেল টেলিকমের কফিল এইচএস মুয়ীদ, এক্সেসটেলের মালিক জাইন ওমর, কিউবির অংশীদার আফজালুর রহমান, টেকনোমিডিয়ার সরকার জীবন কুমার, বাংলাট্রাকের আমিনুল হক ও তার ছেলে নাজিম আসাদুল হক এবং তারিক একরামুল হক, সিটিসেলের সাবেক চেয়ারম্যান আজমাত মঈন, মোনেম কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লি:-এর পরিচালক এএসএম মহিউদ্দিন মোনেম এবং আসমা মোনেম। এছাড়া দিলীপ কুমার মোদী, মল্লিক সুধীর, কাজী রায়হান জাফর, মো. ইউসুফ রায়হান রেজা, মাহতাবউদ্দিন চৌধুরী, বেনজির আহমেদ, ইশরাক আহমেদ, নভেরা চৌধুরী, সৈয়দা সামিনা মির্জা, উম্মে রুবানা, বিলকিস ফাতিমা, সালমা হক, ফরহাদ গনি মোহাম্মদ, মো. আবুল বাশার, নিজাম এম সেলিম, মোহাম্মদ মোকসেদুল ইসলাম, স্বাস্থ্য খাতের ঠিকাদার মো. মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু, মো. মোতাজ্জারুল ইসলাম, মো. সেলিমুজ্জামান, সৈয়দ সেরাজুল হক, এফএম জুবাইদুল হক। ক্যাপ্টেন এমএম জাউল, মোহাম্মদ শহীদ মাসুদ, খাজা শাহাদত উল্লাহ, মোহাম্মদ ফয়সাল করিম খান, মোহাম্মদ শহীদ মাসুদ, জুলফিকার হায়দার, মির্জা এম ইয়াহিয়া, নজরুল ইসলাম, জাহিদুল ইসলাম, এফএম জুবাইদুল হক, এএফএম রহমাতুল বারী ও খাজা শাহাদাত উল্লাহ। 
প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, বাংলাদেশ বিমান ইনকর্পোরেশন, ইসলামিক সলিডারিটি শিপিং কোম্পানি বাংলাদেশ ইনকর্পোরেশন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল এজেন্সিস লিমিটেড, এসার বাংলাদেশ হোল্ডিং প্রাইভেট লিমিডেট ও টেলিকম ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড। বাংলাদেশ ডাটাবেজে ৫৬ ব্যক্তির নাম ছাড়ও দু’টি অফশোর প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। একটি সোয়েন ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, অপরটি সেভেন সিজ অ্যাসেটস লিমিটেড। দু’টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই গুলশান-২-এর একই ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটিতে সংশ্লিষ্ট দু’জন হলেন- স্টেফান পিরকার ও রুখসানা পিরকার। এদের মধ্যে আজমাত মঈনসহ ১৩ জনকে জিজ্ঞাসা করে দুদক টিম। কিন্তু বছর তিন পর রহস্যজনক কারণে অনুসন্ধানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুদকও অনুসন্ধান সংক্রান্ত সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেয়নি। যে ১৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল তারা কী বলেছেন তাও জানায়নি দুদক। তাছাড়া এদের বিরুদ্ধে আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা তাও জানাচ্ছে না সংস্থাটি। ফলে পানামায় তোলপাড় হলেও তালিকায় নাম আসা ব্যক্তিরা রয়েছেন বহাল-তবিয়তে। তবে গত ১ ফেব্রুয়ারি অ্যাডভোকেট আব্দুল কাইয়ুম খান ও সুবীর নন্দী দাস এ বিষয়ে একটি রিট করেন। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না- এই মর্মে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার এবং বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীমের ডিভিশন বেঞ্চ সম্প্রতি এ রুল জারি করেন। রিটকারী সুবীর নন্দী দাস রুল সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংক, বিশেষ করে সুইস ব্যাংকে&