সোমবার, ১২-এপ্রিল ২০২১, ০৬:৫০ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • আদালতকে পাশ কাটিয়ে বিসিআইসিতে প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের অবৈধ পদোন্নতি 

আদালতকে পাশ কাটিয়ে বিসিআইসিতে প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের অবৈধ পদোন্নতি 

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল, ২০২১ ১০:৫০ পূর্বাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: সাধারণ মানুষ, নাগরিক সমাজ, সরকার ও বিরোধী দল চায় বাংলাদেশ দুর্নীতিমুক্ত হোক। সরকার প্রধানও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু সরকারি দফতরের কোনো কর্মচারী একই দফতরের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে যখন চাকরি হারান তখন রাষ্ট্র তার পাশে নেই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে চাকরি হারান চতুর্থ শ্রেণির (এমএলএসএস) কর্মচারী। আর যেসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য ও সরকারি মালামাল বিক্রি করে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এর। এমন কাণ্ডকীর্তির খবরে বিসিআইসিতে চলছে তোলপাড়। ক্ষোভে ফুঁসছেন অনিয়ম ও দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। 
জানা গেছে, ২০১০ সালের ১ জুন এমএলএসএস নিয়োগের জন্য দেশের জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দেয় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। ওই বিজ্ঞপ্তি দেখে চাকরির জন্য আবেদনকারীদের ২৯ জুলাই মৌখিক পরীক্ষা নেয় বিসিআইসি এবং একইদিন চূড়ান্ত ফলাফলও ঘোষণা করা হয়। মৌখিক পরীক্ষায় কৃতকার্য হন মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা এ হামিদ এর সন্তান মো. মিরাজ। একই বছরের ২৩ নভেম্বর চাকরিতে প্রবেশ করেন মো. মিরাজ। পরবর্তীতে ২০১১ সালের ১১ আগস্ট তার চাকরি স্থায়ী করা হয়। চাকরি স্থায়ী হওয়ার পর যুব শ্রমিক লীগের সিবিএ সংগঠনের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়ে সংস্থার কল্যাণমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। একই সময়ে বিসিআইসির বড় কর্তাদের বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন মিরাজ। নিয়মিত সভা-সেমিনারে দুর্নীতিমুক্ত বিসিআইসি গঠনে ভূমিকা রাখেন এই মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। আর এতে বড় কর্তাদের চোখের কাঁটা হয়ে উঠেন তিনি। 
অভিযোগে জানা গেছে, মিরাজের মুখ বন্ধ করতে নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে বিসিআইসির এমআইএস বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মমতাজ বেগম, বিসিআইসির তৎকালীন চেয়ারম্যান (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ ইকবাল, কর্মচারী বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাকির হোসেন, আইন শাখার উপ-মহাব্যবস্থাপক আহসান কুদ্দুস কুন্তল, বিপণন শাখার ব্যবস্থাপক মো. নুর নবী। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোনো চাপের কাছে নতিস্বীকার করছিলেন না। কারণ, এই কর্মকর্তারা শুধু নিয়োগ বাণিজ্যই নয় বরং পদোন্নতি বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, ভূয়া এম. আর. আর ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার সার লোপাটসহ বিভিন্ন অনিয়ম, বিধিলঙ্ঘন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে আসছিলেন। আর মিরাজ এদের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করতে সমর্থ হওয়ায় তারা দিশেহারা হইয়া মিরাজকে চাকরিচ্যুতি করার সিদ্ধান্ত নেয়।
মো. মিরাজ চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানতে পেরে ওই কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে তারা ১০,০০০০০/- (দশ লাখ) টাকা দাবি করেন। দাবিকৃত টাকা দিতে না পারলে চাকরি হারানোরও ভয় দেখান তারা। পরবর্তীতে অসহায় এমএলএসএস চাকরি বাঁচাতে বাধ্য হয়ে ধারদেনা করে মমতাজ, ইকবাল, জাকির হোসেনদের দশ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু তারা টাকা গ্রহণ করলেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার মিরাজের মুখ চিরতরে বন্ধ করতে প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে পেশাগত কোন প্রকার কারণ দর্শনোর নোটিশ ছাড়াই তাকে চাকরিচ্যুত করেন। 
প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের এরকমের অবৈধ কর্মকাণ্ড ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে চাকরিচ্যুত করার কারণে চাকরিচ্যুতির আদেশ অবৈধ, বাতিল ও অকার্যকর করার লক্ষ্যে ২০১৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ৪র্থ সিনিয়র সহকারী জজ ঢাকা, এর আদালতে দেওয়ানী মোকদ্দমা নং ২০/২০১৮ দায়ের করেন। এতে বিবাদী করা হয়- বিসিআইসির এমআইএস বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মমতাজ বেগম, বিসিআইসির তৎকালীন চেয়ারম্যান (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ ইকবাল, কর্মচারী বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাকির হোসেন, আইন শাখার উপ-মহাব্যবস্থাপক আহসান কুদ্দুস কুন্তল ও বিপণন শাখার ব্যবস্থাপক মো. নুর নবীকে। 
আদালত থেকে সমন দেয়া হলে বিসিআইসির এই প্রভাবশালী কর্মকর্তারা তার ওপর ক্ষিপ্ত হন। এরা ২০১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মিরাজের বাসায় গিয়ে তাকে ৩ দিনের মধ্যে মামলা তুলে নিতে চাপ দেন। এরপর ভাড়াটিয়া গুণ্ডা কাজে লাগিয়েও তাকে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেয়া হয়। এক পর্যায়ে মিরাজকে প্রাণনাশের হুমকিও দেয়। মিরাজ নিরাপত্তা চেয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে শাহআলী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন, ডায়েরি নং ৩৮১। এরপরও প্রাণনাশের হুমকি অব্যাহত থাকায় তিনি প্রাণের ভয়ে বাসা ছেড়ে মোহাম্মদপুরস্থ চাচার বাসা, মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারে আত্মগোপন করেন। এক পর্যায়ে তাকে খুঁজে চাচার বাসায় গিয়েও হুমকি দিয়ে আসে। 
মিরাজের দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট মিরাজের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. তারেক রহমান বিসিআইসির চেয়ারম্যান বরাবর একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। ওই নোটিশে তিনি আইনের ধারা উল্লেখ করে তার অধীনে কর্মরত বিসিআইসির এমআইএস বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মমতাজ বেগম, কর্মচারী বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাকির হোসেন, আইন শাখার উপ-মহাব্যবস্থাপক আহসান কুদ্দুস কুন্তল, বিপণন শাখার ব্যবস্থাপক মো. নুর নবীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানান। নোটিশে বলা হয়- ২০১৮ সালের ১৭ জুলাই তারিখে চারজন আসামির বিরুদ্ধে দ-বিধি ধারা ৪০৬, ৪২০, ৪২২, ৫০৬ ও ১০৯ অনুযায়ী আদালত চার্জ গঠনের নির্দেশ দিয়ে ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পরবর্তী শুনানির তারিখ ধার্য করেছেন। এ অবস্থায় বিসিআইসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৮৮ এর বিধি ৪৪ এর উপ-বিধি (৫) অনুযায়ী উপরোক্তদের সাময়িক বরখাস্ত বলে গণ্য হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রবিধানমালার অধীন সূচিত কার্যধারা পরিসমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা যথারীতি খোরাকী ভাতা পাবেন।
মিরাজের আইনজীবীর ওই নোটিশে আরও বলা হয়, কোনো সরকারি কর্মচারী ফৌজদারী মোকদ্দমায় হাজিরা দিতে হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি প্রয়োজন। কিন্তু এক্ষেত্রে মিরাজের মামলার আসামিগণ যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতির তোয়াক্কা না করে দাপ্তরিক উপস্থিতি দেখিয়ে একই সাথে আদালতেও হাজির দেখাচ্ছেন যা চাকরি শৃঙ্খলাবিধির পরিপন্থী এবং বিধিবিধান উপেক্ষা করার ধৃষ্টতা প্রদর্শনের শামিল। এ অবস্থায় উপরোক্ত চারজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। কিন্তু সেই নোটিশ আমলে নেয়নি বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত-১৬, ঢাকা এর ফৌজদারি মামলা নং ৪১৪/২০১৮ এর বিবাদীরা সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ঈৎরসরহধষ গরংপ ৪০২৫৮/২০১৮ দায়ের করেন। মামলাটি ৩১-১২-২০২০ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট এর হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক নিষ্পত্তি হয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় ২ মার্চ ২০২১ তারিখে জারি হয়। হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত রায়ের শেষ বক্তব্যটি হলো: “ইবভড়ৎব ঢ়ধৎঃরহম রিঃয ঃযব পধংব, বি রিংয ঃড় ড়নংবৎাব ঃযধঃ রভ ঃযবৎব রং ধহু ধষষবমধঃরড়হ ড়ভ ঃধশরহম নৎরনব নু ধহু ড়ভ ঃযব ঢ়বঃরঃরড়হবৎং, রঃ সধু নব ফবধষঃ রিঃয বরঃযবৎ নু ঃযব পড়হপবৎহবফ অঁঃযড়ৎরঃু, হধসবষু ইঈওঈ ড়ৎ নু ঃযব অহঃর-ঈড়ৎৎঁঢ়ঃরড়হ ঈড়সসরংংরড়হ, রহ ধপপড়ৎফধহপব রিঃয ষধ”ি। মানে- মামলাটি বিভাজনের আগে আদালত পর্যবেক্ষণ করতে ইচ্ছুক যে আবেদনকারীদের (বিবাদীদের) কারও দ্বারা ঘুষ নেওয়ার কোনও অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট আইন কর্তৃক বিসিআইসি বা দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক আইন অনুযায়ী আইন প্রয়োগ করবে। মিরাজের আইনজীবী তারেক রহমান বলছেন, আদালতও এই মামলা সম্পূর্ণ শেষের পক্ষে নয়। কিছু দুষ্টু কর্মকর্তা এগুলো উহ্য (রসঢ়ষরপরঃ) রেখে কর্তৃপক্ষকে অসত্য তথ্য প্রদান করে বিব্রত করে যাচ্ছেন মাত্র। মিরাজের আইনজীবীর প্রশ্ন, বিজ্ঞ মূখ্য মহানগর হাকিম আদালত-১৬, ঢাকা এর ফৌজদারি মামলা নং ৪১৪/২০১৮ এর আসামি মোট ০৫ (পাঁচ) জন। একজনের নাম কিন্তু হাইকোর্ট প্রদত্ত রায়ে নেই। সুতরাং মামলা নিষ্পত্তি কিভাবে হয়? 
জানা গেছে, ২ মার্চ উচ্চ আদালতের দেওয়া রায় এর বিরুদ্ধে মিরাজ ৭ মার্চ লিভ টু আপিল করেন। অর্থাৎ ঈৎরসরহধষ গরংপ ৪০২৫৮/২০১৮ মামলার পরবর্তী কার্যক্রম হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ-এ আপিল নং ৪১৭/২০২১ দায়ের করা হয়েছে। এ বিষয়ে এখনো শুনানি বা নিষ্পত্তি বা কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। কিন্তু আইনি বিষয়টি সুরাহা না হওয়ার আগেই মামলায় উল্লেখিত বিবাদীদের বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী যা করা যায় না। উল্লিখিত কর্মকর্তাদের-কে গোপনে বে আইনি কোনো সুবিধা প্রদান আইনত অবৈধ এবং আদালত অবমাননার শামিল বলেও মনে করছেন আইনজীবীরা। আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের পরও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নিলেও অতিউৎসাহী হয়ে তাদের পদোন্নতি দেওয়ায় সংস্থটির অভ্যন্তরে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। 
ভুক্তভোগী মো. মিরাজ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিসিআইসি’র সাথে আমার কোন বিরোধ নেই। ব্যক্তিগণের অপরাধ ঢেকে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠান কাজ করলে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বিসিআইসিতে কর্মরত সরকারি আমলাগণ নিশ্চয়ই সরকারের বিরুদ্ধাচারণ করবে না, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিবে না। তিনি বলেন, নিজেদের দুর্নীতি ঢাকতে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে আমাকে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই বরখাস্ত করা হয়েছে। আমি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী একজন বীর মুক্তযোদ্ধার সন্তান। কর্মজীবনে আমার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ধরণের অনিয়মের অভিযোগ নেই। আমি শুধু দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলাম। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে এটাকে আমি আমার নৈতিক দায়িত্ব মনে করি বিধায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিলাম আপোষহীন। কিন্তু স্বাধীন দেশে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের এই যদি হয় পরিণতি তাহলে বলার আর কিইবা থাকে?’ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ ও তাকে স্বপদে বহাল করতে অনুরোধ জানান মো. মিরাজ।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে‘১৫ মার্চ ২০২১প্রকাশিত)