সোমবার, ১৭-মে ২০২১, ০৬:০১ পূর্বাহ্ন

তরমুজের নামে আমরা কি খাচ্ছি!

shershanews24.com

প্রকাশ : ২২ এপ্রিল, ২০২১ ১০:৫৪ অপরাহ্ন

শীর্ষনিউজ, ঢাকা : গ্রীষ্মের রসালো ফল তরমুজ। সুস্বাদু এ ফলটি গরমে মানুষের যেমন তৃষ্ণা মেটায় তেমনি আনে স্বস্তি। শহরবাসী অথবা গ্রামের মানুষ সবাই কমবেশি তরমুজ খেতে পছন্দ করেন। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পানি। তরমুজে শতকরা ৬ ভাগ চিনি এবং ৯২ ভাগ পানিসহ অন্যান্য ভিটামিন জাতীয় উপকরণ রয়েছে। এছাড়া এতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন এ, বি৬, সি, পটাশিয়াম, লাইকোপেন ও সিট্রুলিনের মতো উপাদান। যাঁরা ওজন কমাতে চান, তাঁদের জন্য তরমুজ আদর্শ খাবার হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলটির পুষ্টিগুণ যেমন তেমনি দেশী ফলের ভেতরে দামও তুলনামূলক কম থাকায় গরমে স্বস্তি পেতে তরমুজের জুড়ি নেই। কিন্তু তরমুজের মতো সহজলভ্য, সুস্বাদু ও জনপ্রিয় এ ফলটিতেও এখন দেদারসে মেশানো হচ্ছে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক উপাদান। এমনকি ওজন বাড়াতে পুশ করা হচ্ছে দুষিত পানি। ক্ষতিকারক কেমিক্যাল ও দুষিত পানি মেশানো এসব তরমুজ খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন মানুষ। সারা দেশে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ অসুস্থ হওয়ার বেশ কিছু ঘটনা সম্প্রতি খবরে আসছে। 

বাজার ঘুরে খুচরা ও পাইকারী ব্যাবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে ভয়াবহ তথ্য। তরমুজের নামে আমরা খাচ্ছি ফরমালিন, স্যাকারিন, দুষিত পানিসহ নানান ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল। তরমুজে এসব কেমিক্যাল মেশাতে ব্যাবসায়ীরা আশ্রয় নিচ্ছে নানান ধরণের কৌশল। তরমুজকে পাকা এবং লাল দেখানোর জন্য মেশানো হচ্ছে বিপজ্জনক লাল রঙ ও মিষ্টি স্যাকারিন। ইনজেকশনের সিরিঞ্জের মাধ্যমে তরমুজের বোঁটা দিয়ে এসব দ্রব্য পুশ করে তরমুজ পাকা ও লাল টকটকে বলে বিক্রি করা হচ্ছে।

এছাড়া কিছু কিছু খুচরা বিক্রেতাকে তরমুজের বোটা দিয়ে সিরিঞ্জের মাধ্যমে পানি পুশ করতে দেখা যায়। কারণ জানতে চাইলে বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে তরমুজ বিক্রি হত ‘পিস’ হিসেবে কিন্তু এখন তা বিক্রি হয় কেজিতে। তাই কিছু অসাধু ব্যাবসায়ী তরমুজের বোঁটা দিয়ে সিরিঞ্জের সাহায্যে পানি ঢুকিয়ে ওজন বাড়ায়। ওজন বাড়াতে তারা যে পানি তরমুজে পুশ করছে তাও আবার দুষিত ও নোংরা পানি। এসব খেয়ে ডায়রিয়া, বমি, পেটব্যাথাসহ নানান ধরণের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।

শহরের ফলের আড়তগুলোতে ভোরবেলায় ব্যবহৃত পুরনো ইনজেকশনের সিরিঞ্জের মাধ্যমে বিষাক্ত লাল রঙ ও মিষ্টি স্যাকারিন পানি পুশ করা হচ্ছে। আর এ তরমুজগুলোই দোকানে ছুরি দিয়ে কেটে পাকা দেখিয়ে বেশি দাম আদায় করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে তরমুজ যেন তাড়াতাড়ি নষ্ট না হয় সে জন্য মেশানো হচ্ছে কেমিক্যাল। এসব বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশানো তরমুজ খেয়ে মানুষ হামেশাই অসুস্থ হচ্ছেন। সবচেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে শিশুরা।

এ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শামীম আহমেদ। তিনি বলেন, অনেকেই তরমুজ কেনার সময় খানিকটা অংশ কেটে পরখ করে নেন, তরমুজটি লাল কি না, তাও দেখে নেন। তবে একদম টকটকে লাল তরমুজ খাওয়া ঠিক নয়। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করার মাধ্যমে তরমুজের রং লাল করা হয়। তাই কেনার সময় স্বাভাবিক রঙের তরমুজ কিনুন।

তরমুজ নিয়ে ব্যাবসায়ীদের এমন কারসাজিতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। বাজারে তরমুজ কিনতে এসে বিক্রেতাদের কাছে নানাভাবে জানতে চাচ্ছেন এতে কিছু মিশানো হয়েছে কি না। অনেকের আবার কোন মাথাব্যাথা নেই এসবে। মৌসুমী ফল যেমনি হোক খেতে পারলেই খুশি তাঁরা। কিছু ক্রেতা আবার তাদের পুরনো অভিজ্ঞতা শুনিয়ে সতর্ক করছেন অন্যদের। মাঝে মাঝে তারা তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। পাঠকরাও নিজেদের মতামত জানিয়ে মন্তব্য করছেন। 

রুমানা বৈশাখী নামের একজন লিখেছেন, “সন্ধ্যায় আমি ও আমার বর পাড়ার মোড়ের ফলের দোকান থেকে একটা তরমুজ কিনি। ছোট্ট সবুজ রঙের তরমুজ, ১৪০ টাকা দাম। সবসময়েই লোকটাকে তরমুজ নিয়ে বসতে দেখি, মানুষজন কিনে নিয়ে যায়, আমাদের কখনো খাওয়া হয়ে ওঠেনি। দোকানদার বারবার বলল যে "থাই তরমুজ", অনেক অনেক মজা, এখন এটাই চলছে। 

তরমুজটা রাতে আর খাওয়া হয়নি। ডাইনিং টেবিলের ওপরে রেখে দিয়েছি। যে পলিথিনে দিয়েছে, সেটার মুখটা খুলে রেখেছি। সকালে যখন চা বানাচ্ছি, দেখি তরমুজ থেকে ফেনা বের হচ্ছে! কোথা থেকে ফেনা বের হচ্ছে বুঝতে পারলাম না। ভালো করে তাকিয়ে দেখি পলিথিনটার ভেতরে ডিমের লালার মত দেখতে একটা জিনিস জমে গেছে। প্রচুর দুর্গন্ধ। জিনিসটা ধরতে পানির মত, দেখতে ডিমের লালার মত। আর তরমুজের গায়ে ফেনাটা সাবানের ফেনার মত দেখতে!

সাথে সাথে ছবি তুলে ফেললাম। তারপর রান্নাঘরে নিয়ে গেলাম কাটার জন্য। আমি ভেবেছিলাম ভেতরে মনে হয় পচে-গলে শেষ, এই জন্য এমন দুর্গন্ধ ওয়ালা পানি বের হচ্ছে। কিন্তু তরমুজ দুইভাগ করতেই আবারও অবাক হবার পালা। তরমুজ ভেতরে টকটকে লাল! 

হ্যাঁ, তরমুজটা ভেতরে টকটকে লাল এবং রিতীমত কচকচে, টাটকা তরমুজের মত। পচে যাবার কোন রকমের লক্ষণ নেই! নাকের কাছে নিলে একটা চাপা ভ্যাপসা দুর্গন্ধ ভক করে নাকে এসে লাগে। কিন্তু বাইরে থেকে দেখে কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই। এমনই সুন্দর ও টাটকা দেখতে! 

এটা নিঃসন্দেহ যে এই তরমুজের মাঝে রাসায়নিক দেওয়া। রাসায়নিক দিয়ে জিনিসটা পচনের হাত থেকে দীর্ঘদিন যাবত বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে, এই জন্যই এই অবস্থা। জিনিসটা থাই তরমুজ হোক বা বাংলাদেশি, প্রশ্ন একটাই- এই জিনিস বাজারে বিক্রি হয় কীভাবে! জানি এই প্রশ্নের কোন উত্তর নেই। প্রতিদিন আপনার-আমার মত অসংখ্য মানুষ নিজের হাতেই এসব বিষ খাওয়াচ্ছি আমাদের পরিবার ও আপনজনদের। আমি অসহায় বোধ করি। তীব্র অসহায়।”

অসাধু ব্যাবসায়ীদের এসব কর্মকান্ডের লাগাম টানতে বাজার মনিটরিং এবং এতে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি সাধারণ মানুষের। এছাড়া মনিটরিং শেল গঠনের পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণকারি কর্তৃপক্ষের সচেতন হওয়া এবং অসাধু ব্যাবসায়িদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।  

শীর্ষনিউজ/আরএইচ