বুধবার, ১৬-জুন ২০২১, ০৪:৪৫ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • আফ্রিকায় রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের জন্য ছেলেদের প্রস্তুত করছেন প্রেসিডেন্টরা

আফ্রিকায় রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের জন্য ছেলেদের প্রস্তুত করছেন প্রেসিডেন্টরা

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৪ জুন, ২০২১ ১২:১৭ অপরাহ্ন

শীর্ষনিউজ ডেস্ক: কঙ্গো-ব্রাজাভিলের প্রেসিডেন্ট ডেনি সাসু-এনগোসো তার ছেলে ডেনি-ক্রিস্টেলকে তার মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিয়েছেন, আর এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে তিনি সে দেশে পরিবারতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রবল জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।

তবে ক্ষমতার এই হাতবদল রাতারাতি ঘটবে তা নয়। পাঁচ বছর বাদ দিয়ে ডেনি সাসু-এনগেসো গত ৪১ বছর ধরে কঙ্গো-ব্রাজাভিলের শাসন ক্ষমতায় রয়েছেন। তবুও ৭৭-বছর বয়সী মি. সাসু-এনগোসোর ক্ষমতালিপ্সা কমে গেছে এমন কোন লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না।

ডেনি-ক্রিস্টেল যদি শেষ পর্যন্ত বাবার আসনে অভিষিক্ত হন, তাহলে মধ্য আফ্রিকায় ক্ষমতা পরিবর্তনের একটি বিশেষ ধারার সাথে যুক্ত হবে কঙ্গো-ব্রাজাভিলের নাম।

প্রতিবেশী দেশ গ্যাবনের প্রেসিডেন্ট আলী বঙ্গো ওনডিম্বা হলেন ওমর বঙ্গোর ছেলে, যিনি ১৯৬৭ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সে দেশের ক্ষমতায় ছিলেন। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে জোসেফ কাবিলা ১৭ বছর ধরে দেশ শাসন করছেন। তার বাবা লরাঁ কাবিলা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ২০০১ সালে খুন হন।

একুয়েটরিয়াল গিনির প্রেসিডেন্ট টিওডোরো ওবিয়াঙ ১৯৭৯ সালে তার চাচা ও দেশের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান ফ্রানথিসকো মাথিয়াস এনগুয়েমাকে ক্ষমতাচ্যুত করে প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণ করেন। ফ্রানথিসকো মাথিয়াস ছিলেন স্বৈরাচারী। এখন টিওডোরো নিজের ছেলে টিওডোরো এগুয়েমা ওবিয়াঙ মাংগুয়েকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে বসিয়েছেন, যাতে তিনি দেশে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হতে পারেন।

চাদের প্রেসিডেন্ট ইদ্রিস ডেবি বিদ্রোহীদের সাথে গোলাগুলিতে আহত হয়ে গত মাসে মৃত্যুবরণ করলে অন্তর্বর্তীকালীন শাসক সামরিক কাউন্সিলের নেতা হিসেবে দ্রুত উত্থান ঘটে তারই ছেলে চার-তারকা বিশিষ্ট জেনারেল মুহামাতের।

এখন ক্যামেরুনেও পারিবারিক উত্তরাধিকারের কথা শোনা যাচ্ছে। সে দেশের একটি গোপন 'নাগরিক আন্দোলন' ফ্র্যাংক বিয়াকে নিয়ে নানা ধরনের প্রচারকার্য চালাচ্ছে। তিনি হলেন ৮৮-বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট পল বিয়া'র ছেলে। পল বিয়া এখনও তার সাত-বছরের মেয়াদের অর্ধেক অতিক্রম করেননি।

ফ্র্যাংক বিয়া এখন পর্যন্ত রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। তিনি একজন ব্যবসায়ী। এমনকি সরকারি কাজের ঠিকাদারিতেও তিনি অংশ নেন না। তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, এসব প্রচারের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। অবশ্য তিনি একথাও কখনই বলেননি যে তিনি ভবিষ্যতে তার বাবার পদে আসীন হবেন না। কিংবা এসব প্রচার বন্ধ করার কোন কথাও তিনি বলেননি।

তবে পরিবারতন্ত্র কি শুধু আফ্রিকাতেই - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বুশ পরিবার অথবা কেনেডি পরিবার তাহলে কী?

এখন উগান্ডায় ২০২৬ সালের নির্বাচনে শাসক দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সোশাল মিডিয়াতে জেনারেল মুহুজি কাইনেরুগাবাকে নিয়ে প্রচুর মাতামাতি হচ্ছে। তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইউয়েরি মুসেভেনির ছেলে। এই ব্যাপারটা বেশি লক্ষণীয় পশ্চিম-মধ্য আফ্রিকার পেট্রো-অর্থনীতির দেশগুলিতে। তেল থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে এসব দেশে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের পথকে মসৃণ করা হয়। শাসক পরিবার এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের জটিল নেটওয়ার্কের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর অসন্তোষ তৈরির কাজেও এই অর্থ ব্যয় হয়।

যেমন, একুয়েটরিয়াল গিনির ওবিয়াঙ পরিবারের মধ্যে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র চলছে বলে গুজব রয়েছে। ঐ পরিবারের কোন কোন সদস্য চাইছেন প্রেসিডেন্টের ভিন্ন এক ছেলেকে ক্ষমতায় বসাতে। তিনি হলেন তেল-মন্ত্রী গ্যাব্রিয়েল এমবেগা ওবিয়াঙ লিমা।

গ্যাবনের ফার্স্ট ফ্যামিলিতে গণ্ডগোল

শুধু যে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্যই ক্ষমতাসীন পরিবারে ভেতরে রেষারেষি চলে তা নয়। ২০১৬ সালে গ্যাবনের নির্বাচনে আলী বঙ্গো লড়েছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনের প্রধান জ্যঁ পিং-এর বিরুদ্ধে। মি. পিং আবার প্রেসিডেন্টের সাবেক ভগ্নীপতি। বোন পাসকালিনের স্বামী। সেই সূত্রের প্রেসিডেন্ট বঙ্গো হলেন তাদের সন্তানদের মামা।

তবে মি. পিং ঐ নির্বাচনে পুরোপুরিভাবে রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে লড়েছিলেন। তিনি হয়েছিলেন বিরোধীদলের মনোনীত এক নেতা যিনি দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র আনতে চান এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার চালাতে চান।

সেই নির্বাচনের পরাজয় জ্যঁ পিং এখনও মেনে নেননি। তার কারণ হলো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল তীব্র এবং ভোট গণনার চূড়ান্ত ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল। গণনায় সামান্য ব্যবধানে আলী বঙ্গোকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। তবে ঐ ফলাফল নিয়ে মি. বঙ্গো মোটেও মাথা ঘামাচ্ছেন না। কারণ, দৃশ্যত তিনি পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য তৈরি হচ্ছেন। তিনি ২০১৯ সালে তার ছেলে নুরুদ্দিন বঙ্গো ভ্যালেন্টিনকে পরবর্তী নির্বাচনের জন্য "প্রেসিডেন্ট বিষয়ক প্রধান সমন্বয়কারী" পদে বহাল করেছেন।

এর আগের বছর সৌদি আরবে এক সফরের সময় মি. বঙ্গোর স্ট্রোক হয়। তার দীর্ঘ চিকিৎসার সময়টিতে সে সময় তার স্টাফ প্রধান ব্রাইস লাক্রুশ আলীহাংগা খুবই ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট তার নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে সমর্থ হন। তিনি মি. লক্রেুশকে প্রথমে তার পদ থেকে নামিয়ে দেন, পরে বরখাস্ত করেন এবং দুর্নীতির অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করেন। মি. লাক্রুশ অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ইতোমধ্যে নুরুদ্দিনকে একটি নতুন পদে বসানো হয়। তার প্রধান কাজ ছিল প্রতিদিন প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করা, এবং তার নির্দেশাবলী সরকারের বিভিন্ন শাখাকে জানিয়ে দেয়া। রাষ্ট্রের যে কোনো বিষয়ে স্বাধীনভাবে হস্তক্ষেপের ক্ষমতাও তার রয়েছে।

মি. বঙ্গোর স্বাস্থ্যের অবস্থা অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে বাবার দায়িত্বভার হাতে নেয়ার জন্য এখন তাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। নুরুদ্দিন যুক্তরাজ্যের খ্যাতিমান এটন কলেজ, লন্ডন বিজনেস স্কুল এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের সোয়াস-এ পড়াশুনা করেছেন। আধুনিক তারুণ্যের প্রতীক হিসেবে তাকে গড়ে তোলা হচ্ছে।

ফ্রান্সে দুর্নীতির তদন্ত

শাসক দলের সহকর্মীদের সাথে নিয়ে তার প্রধান কাজ হবে সামরিক বাহিনী এবং গোত্রগুলোতে তাদের যেসব মিত্র রয়েছে তাদের পাশে রাখা। কিন্তু রাজনৈতিক সংলাপ এবং অর্থবহ গণতন্ত্রায়ণ প্রশ্নে দেশের ভেতর ও বাইরে থেকেও তার ওপর যথেষ্ট চাপ রয়েছে। তবে একুয়েটারিয়াল গিনিতে ভিন্ন আরেকটি সমস্যা তৈরি হয়েছে। সেটা হলো শাসক পরিবারের দুর্নীতির অর্থ ফ্রান্সে পাচার করে তা দিয়ে সম্পত্তি কেনা হয়েছে, এবং এনিয়ে ফরাসি বিচারবিভাগের এক তদন্ত শুরু হয়েছে।

বঙ্গো এবং সাসু-এনগেসো - দুটি পরিবারই এই তদন্তের লক্ষ্য। মোট ১৩ জনের বিরুদ্ধে তদন্তের মধ্যে রয়েছেন একজন আইনজীবী যিনি প্রেসিডেন্ট ওমর বঙ্গোর হয়ে একসময় কাজ করেছেন। রয়েছেন বেশ কয়েকজন ফরাসি নাগরিক। ফরাসি বিচারকরা ২০১৫ সালে প্যারিসের কাছে দুটো সম্পত্তি আটক করার আদেশ দেন, মি. সাসু-এনগেসোর এক ভাতিজা উইলফ্রিড এনগেসো যার প্রকৃত মালিক বলে সন্দেহ করা হয়। বিচারকরা একই সাথে ১৫টি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করারও আদেশ দেন, এবং উইলফ্রিড এনগেসোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়।

দু‌'হাজার ষোল সালে মি. সাসু-এনগেসো তার বিরুদ্ধে আনা মামলা খারিজ করার লক্ষ্যে আইনি পদক্ষেপ নেন। সে সময় একজন সরকারি মুখপাত্র দুর্নীতির অভিযোগকে প্রেসিডেন্টের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার প্রয়াসে "এক বিশাল ষড়যন্ত্র" বলে বর্ণনা করেন। কিন্তু বিচারকরা তা মানেননি, এবং ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে তারা প্রেসিডেন্টের মেয়ে জুলিয়েন ও তার স্বামী গাই জনসন, প্রেসিডেন্টের এক ভাগ্নে এডগার এবং সাবেক ভাবী ক্যাথরিন ইগনানগার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করার আদেশ দেন।

তাদের সন্দেহ ২০০৮-০৯ সালের মধ্যে দুই কোটি ২৪ লক্ষ ডলার সমপরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যাকে নিয়ে কথা হয়েছে তিনি হলেন একুয়েটরিয়াল গিনির ভাইস প্রেসিডেন্ট টিওডোরো এগুয়েমা ওবিয়াঙ মাংগুয়ে। ফরাসি পুলিশ সেই ২০১২ সালেই প্যারিসে তার এক বিলাসবহুল ম্যানসনে হানা দেয় এবং দুটি বুগাটি ভেয়েরন্স এবং একটি রোলস রয়েস ফ্যান্টমসহ বেশ কয়েকটি গাড়ি আটক করে।

মামলায় টিওডোরোর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত তিন কোটি ইউরো জরিমানার রায় হয়। তার সরকার তখন আন্তর্জাতিক আদালতে ঐ রায়ের বিরুদ্ধে মামলা করে। তারা যুক্তি দেখায় যে ১৭ কোটি ইউরো মূল্যের ম্যানসনটি আসলে প্যারিসে একুয়েটারিয়াল গিনির দূতাবাস। সেজন্য কূটনৈতিক রীতি অনুযায়ী সেটা বাজেয়াপ্ত করা যায় না।

তবে গত ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক আদালত ঐ যুক্তি খারিজ করে দেয়। ফরাসি পার্লামেন্টে এখন একটি আইন তৈরি হচ্ছে যা দিয়ে উদ্ধার করা অর্থ গচ্ছিত রাখা হবে, এবং যে দেশ থেকে অর্থ পাচার করা হয়েছে সেই দেশের উন্নয়নকাজে সেই অর্থ ব্যয় করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

কিন্তু এসব পদক্ষেপও নিতে গেলে তারা কাঠামো ঠিক করে নিতে হয়। সুইটজারল্যান্ডের সরকার টিওডোরো এবং আরও দু'জনের বিরুদ্ধে কথিত অর্থ পাচার এবং সরকারি অর্থ তছরুপের অভিযোগ করলেও ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মামলাটি আদালতের বাইরে আপোষ নিষ্পত্তি করা হয়। এরপর বাজেয়াপ্ত করা ২৫টি বিলাসবহুল গাড়ি নিলামে তোলা হয়।

একটি ল্যাম্বোরগিনি ভেনেনো রোডস্টার ৯১ লক্ষ ডলারে বিক্রি করা হয়। একটি কালো ও নীল রঙের কানিগসেগ গাড়ি বিক্রি হয় ৪৬ লক্ষ সুইস ফ্রাঁ-তে। সাতটি ফেরারি, দুটো ল্যাম্বোরগিনি, পাঁচটি বেন্টলি, একটি ম্যাসেরাটি, একটি অ্যাশটন মার্টিন এবং একটি ম্যাকলারেন গাড়ি বিক্রি করে মোট দুই কোটি ৩৪ লক্ষ ফ্রাঁ আয় হয়।

এসব গাড়ির অর্ধেক কিনে নিয়েছিলেন একজন জার্মান গাড়ির ডিলার, যিনি একজন বেনামি ক্রেতার হয়ে কাজ করছিলেন। এর পাঁচ মাস পরে টিওডোরোর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ছবি পোস্ট করা হয় যাতে দেখা যাচ্ছে একুয়েটরিয়াল গিনির রাজধানী মালাবোর রাস্তা দিয়ে তিনি সেই কানিগসেগ গাড়ি চালাচ্ছেন। কিন্তু আফ্রিকার কোন কোন দেশে পরিবারতন্ত্রের এই ধারা দেখা গেলেও আফ্রিকা জুড়ে এখন তরুণ সম্প্রদায়ের আকার বাড়ছে, বাড়ছে নাগরিক আশা আকাঙ্ক্ষা।

এরই মাঝে পরিবারতন্ত্রের এসব ধারক-বাহকরা কতখানি কতখানি টেকসই নেতৃত্ব দিতে পারবেন তা এখনও ঠিক পরিষ্কার না।

শীর্ষনিউজ/এসএফ