শনিবার, ২৪-জুলাই ২০২১, ১১:১৪ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা জোনে অর্থ আত্মসাত ও লুটপাটে তোলপাড়
ভুয়া বিলে এক প্রকল্পেই উত্তোলন পৌনে সাত কোটি টাকা : খতিয়ে দেখছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় 

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা জোনে অর্থ আত্মসাত ও লুটপাটে তোলপাড়

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৭ জুলাই, ২০২১ ১১:১৯ পূর্বাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: বরাদ্দ না থাকলেও ভুয়া বিল দাখিল করে একটি প্রকল্প থেকে উত্তোলন করা হয়েছে প্রায় পৌনে সাত কোটি টাকা। এই ঘটনা ঘটেছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো জোনে। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ শিক্ষা ভবনে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানতে পেরেছে, অর্থ বরাদ্দ না থাকা সত্ত্বেও ভুয়া বিল দাখিল করে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে একটি প্রকল্পের নামে এই জোনের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নিয়েছেন। এছাড়া শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের আরো কয়েকটি প্রকল্পে একইভাবে ঢাকা মেট্রো জোনে ভুয়া বিলের মাধ্যমে বরাদ্দের অতিরিক্ত কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানতে পেরেছে। আর এসব দুর্নীতি ও অনিয়ম চাপা দিতে অধিকাংশ সময়ই ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কাটাচ্ছেন ঢাকা জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী। বিগত মাসগুলোতে নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম মো. আক্তারুজ্জামান তার বেইলি রোডস্থ অফিসে এসেছেন কদাচিত। অধিকাংশ দিনই তিনি অফিসে আসেননি। অফিসে আসলেও বেশিরভাগ সময় রাতে এসেছেন, সামান্য কিছুক্ষণ থেকে চলে গেছেন। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের ঢাকা মেট্রো জোনের আওতাধীন রাজধানীর একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ স্থবির হয়ে পড়েছে। 

সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, গত বছর অক্টোবর মাসের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আসা একটি অভিযোগের পর সরকারের দায়িত্বশীল উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা বিষয়টির অনুসন্ধান শুরু করেন। ইতোমধ্যে তারা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি বরাদ্দ না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর ঢাকা জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম মো. আক্তারুজ্জামান ও কয়েকটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগসাজশে ব্যাপকহারে ভুয়া বিল দাখিল করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার (সিএও) অফিসের একটি অসাধু চক্রের সহযোগিতায় সরকারের প্রায় পৌনে সাত কোটি টাকা অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করেছে’। এর বাইরে এই জোনে আরো কয়েকটি প্রকল্পে তারা একই ধরণের দুর্নীতির আশঙ্কা করছেন বলেও ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। 

‘তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নির্বাচিত বেসরকারি কলেজ সমূহের উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পে দুর্নীতির ব্যাপারে তারা জানতে পেরেছেন, এই প্রকল্পে ঢাকা জোনের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু সিএও অফিস থেকে চেক প্রদান করা হয়েছে ৪৬ কোটি টাকার। অতিরিক্ত ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা ঢাকা মেট্রো জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম মো. আক্তারুজ্জামান, সংশিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এবং সিএও অফিসের অসাধু চক্রটির মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা হয়েছে বলে অনুসন্ধানকারীরা জানতে পেরেছেন। বাস্তবে কোনো রকমের কাজ না করিয়েই এসব ভুয়া বিল তুলে নেয়া হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের এই ঢাকা মেট্রো জোন অহরহই লঙ্ঘন করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা। তাদের একাধিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, উন্নয়ন কাজ সঠিক সময়ে সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের স্বার্থে একই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে বার বার কাজ প্রদান না করা বা সময়মতো কাজ শেষ করতে পারেনি- এমন প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় কাজ না দেওয়া। কিন্তু এ নির্দেশ মানেন নি ঢাকা মেট্রো জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম মো. আক্তারুজ্জামান। ফলে খোদ রাজধানীর বুকেই বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামো উন্নয়নের একাধিক অসমাপ্ত কাজ বছরের পর বছর পড়ে রয়েছে। 

ঢাকা মেট্রো জোনে ই-জিপি টেন্ডারে পছন্দের ঠিকাদারকে গোপনে দর বলে দেয়াসহ নানা রকমের কারসাজির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম আক্তারুজ্জামানের বিরুদ্ধে। এমনকি এই জোনে উন্নয়ন কাজের দরপত্র মূল্যায়ন নিয়েও অভিনব কূটকৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ এসেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। ই-জিপি দরপত্র খোলার নির্ধারিত দিনে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের দাখিলকৃত দর প্রকাশ (ডিক্লেয়ার) করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম আক্তারুজ্জামান অনেক ক্ষেত্রেই এই নিয়ম মানেন না। তিনি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কালক্ষেপণ করেন এবং পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে সময় বাড়িয়ে নেন। এর ফলে দরপত্রে অংশগ্রহণকারী অনেক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অধৈর্য্য হয়ে দাখিলকৃত তাঁদের ‘টেন্ডার সিকিউরিটি’র অর্থ উত্তোলন করে নেয়। এসময় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয় এই বলে যে, ওই কাজে তাঁদের আর কোনো দাবি থাকবে না। এভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী কমিয়ে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। 

টেন্ডারে দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এই কালক্ষেপণের কারণে অধিকাংশ উন্নয়ন কাজই সময় মতো শেষ হচ্ছে না। ঢাকা কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজ ও সরকারি ইডেন মহিলা কলেজের একাডেমিক ভবন, সরকারি তিতুমীর কলেজের বিজ্ঞান ভবন ও একাডেমিক ভবন, সিদ্বেশ্বরী কলেজের একাডেমিক ভবন, শের-ই-বাংলা স্কুল ও কলেজ সূত্রাপুরের একাডেমিক ভবন, শের-ই-বাংলা নগরে অবস্থিত মহিলা কলেজের হোস্টেল নির্মাণ কাজ নির্ধারিত মেয়াদের দীর্ঘ সময় পরেও সম্পন্ন হয়নি। মিরপুর বাংলা কলেজ, ধানমন্ডি মহিলা কলেজ, ভিকারুন্নিসানূন কলেজসহ ঢাকা মেট্রো জোনের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজ দীর্ঘ দিন যাবৎ পড়ে আছে। তবে তার দুর্নীতি প্রবণতা, অতিরিক্তি কমিশন দাবি এবং ঠিকাদারদের ওপর ব্যাপকহারে চাঁদাবাজিও উন্নয়নকাজে স্থবিরতার অন্যতম কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, প্রায় সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের ঢাকা মেট্রো জোনে কর্মরত রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম আক্তারুজ্জামান। এই সময়ে তিনি নামে বেনামে বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে সরকারের কোনো নিয়ম-নীতিই এখন আর তোয়াক্কা করেন না। গত জানুয়ারিতে সিঙ্গাপুর সফরকালে তিনি স্ত্রী-সন্তানদের বিদেশ ভ্রমণের সময়ে সরকারি অনুমতি নেননি, যদিও সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এ বিষয়ে অনুমতি নেয়াটা বাধ্যতামূলক।   

ভুয়া বিলে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করে নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর, ঢাকা মেট্রো জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, একটা ভুল হয়েছিল। আমরা অতিরিক্ত বিল জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু যে অর্থ বরাদ্দ ছিল তাই প্রদান করা হয়েছে। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আপনারা অতিরিক্ত ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পেশ হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে তদন্তও হচ্ছে, আপনারা পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছেন? এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। 

একেএম আক্তারুজ্জামানের কাছে জানতে চাওয়া হয়, আপনার ঢাকা জোনের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজ স্থবির হয়ে আছে কেন? জবাবে তিনি বলেন, এখানে একটা গ্যাপ আছে। আসলে আমাদের কাজগুলো দুই ফেজে হচ্ছে। প্রথম ফেজে পাঁচ তলা করার অনুমোদন ছিল। এখন তা দশ তলা করা হচ্ছে। এ কারণে এ অবস্থার তৈরি হয়। তবে বর্তমানে কাজগুলো এগুচ্ছে। তাঁর সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সিঙ্গাপুর ভ্রমণে সরকারের অনুমতি ছিল বলে দাবি করেন, যদিও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে তিনি সক্ষম হয়নি।
অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের ব্যাপারে জানতে চাইলে ‘তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নির্বাচিত বেসরকারি কলেজ সমূহের উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মো. আশফাকুস সালেহীন বলেন, এ ধরনের ঘটনার কোনো তথ্য তিনি জানেন না।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২১ জুন ২০২১ প্রকাশিত)