বুধবার, ২২-সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:৫৭ অপরাহ্ন
  • স্বাস্থ্য
  • »
  • ঢাকার বাইরে যাতায়াতই করোনা বিস্তারের প্রাথমিক কারণ: গবেষণা

ঢাকার বাইরে যাতায়াতই করোনা বিস্তারের প্রাথমিক কারণ: গবেষণা

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৫:৪৯ অপরাহ্ন

শীর্ষনিউজ, ঢাকা: করোনা ভাইরাস সনাক্ত হওয়ার পর দেশে সংক্রমণের বিস্তার প্রতিরোধে গত বছরের ২৬ মার্চ সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এ ঘোষণার পর ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেশব্যাপী করোনা ভাইরাস বিস্তারের ‘প্রাথমিক কারণ’ বলে উঠে এসেছে এক যৌথ গবেষণায়।

একটি জিনোমিক কনসোর্টিয়ামের আওতায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর), আইসিডিডিআর-বি এবং আইদেশি-সহ দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান যৌথ গবেষণা সম্পন্ন করে। মঙ্গলবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গবেষণার বিস্তারিত জানায় আইসিডিডিআর-বি।

বাংলাদেশে প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয় ৮ মার্চ ২০২০ সালে। বিস্তার প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার গত বছরের ২৩ মার্চ ঘোষণা করে, ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি থাকবে। 

গবেষক দল বলেছেন, ২৩ মার্চ থেকে ২৬ মার্চের মধ্যে জনসাধারণের ঢাকা ত্যাগ করার প্রাপ্ত ডাটার সাথে সার্স-কোভ-২ জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে দেখতে পেয়েছেন, ২৩ মার্চ থেকে ২৬ মার্চের মধ্যে ঢাকা বহির্মুখী যাতায়াতই মূলত দেশব্যাপী করোনা ভাইরাস বিস্তারের প্রাথমিক কারণ।

আইইডিসিআর, আইসিডিডিআরবি, আইদেশি, বাংলাদেশ সরকারের এটুআই প্রোগ্রাম, যুক্তরাজ্য ভিত্তিক স্যাঙ্গার জিনোমিক ইনস্টিটিউট, হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ, এবং ইউনিভার্সিটি অব বাথ-এর বিজ্ঞানীদের যৌথ উদ্যোগে ২০২০ সালের মার্চ মাসে এই গবেষণাটি শুরু হয়। 

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস-এর প্রবেশ, দেশব্যাপী বিস্তৃতি এবং করোনা ভাইরাস বিস্তার প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে লকডাউন এবং জনসাধারণের গতিবিধির ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। 

প্রাথমিকভাবে মার্চ-জুলাই ২০২০ অন্তর্বর্তীকালে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত ৩৯১টি করোনা ভাইরাসের জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়। 

বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রথম করোনা ভাইরাসের সম্ভাব্য উদ্ভব হয় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে। পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের মাধ্যমে আরও ভাইরাসের অনুপ্রবেশ ঘটে।

গবেষণাপত্রটি  গত ৪ সেপ্টেম্বর ‘জিনোমিকস, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যান্ড মোবাইল ফোন ডেটা অ্যানাবল ম্যাপিং অব সার্স-কোভ-২ লিনেজেস টু ইনফর্ম হেলথ পলিসি ইন বাংলাদেশ’-শিরোনামে স্বনামধন্য নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। 

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে,২০২১ সালের এপ্রিলে কনসোর্টিয়াম ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে সংগৃহীত আরও ৮৫টি সার্স-কোভ-২ নমুনা সংগ্রহ করে। 

এর মধ্যে ৩০টি ছিল লিনিয়েজ বি.১.১.২৫ (৩৫%), ১৩ টি ছিল আলফা ভ্যারিয়েন্ট (বি.১.১.৭, ১৫%), ৪০ টি ছিল বিটা ভ্যারিয়েন্ট (বি.১.৩৫১,৪৭%), ১ টি ছিল লিনিয়েজ বি.১.১.৩১৫, এবং ১ টি ছিল লিনিয়েজ বি.১.৫২৫। 

আইইডিসিআর-এর পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন বলেন, আমাদের এই কনসোর্টিয়াম বিভিন্ন সময়ে নীতিনির্ধারকদেরকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে সহায়তা করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্তবর্তী এলাকাতে জনসাধারণের চলাচল নিষিদ্ধ করা, পরিবহন এবং যানবাহন চলাচলে সীমাবদ্ধতা আনা, বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন এবং যেসব দেশে উদ্বেগজনক ভেরিয়েন্ট ছিল সেখান থেকে আগত ভ্রমণকারীদের সাধারন মানুষদের থেকে আলাদা রাখা, সময়মতো লকডাউন সিদ্ধান্ত বা প্রয়োজনবোধে আন্তর্জাতিক চলাচল সীমাবদ্ধ করা।

তিনি জানান, এই কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের জন্য কোভিড-১৯ এর বিস্তার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় প্রমাণভিত্তিক তথ্য সরবরাহ করতে পারবেন তারা।

এই গবেষণাপত্রটির মূল-লেখকদের একজন ডক্টর লরেন কাউলি বলেন, জিনোমিক এবং মোবিলিটির বিভিন্ন ডাটা স্ট্রিম একত্রিত করে আমরা কিভাবে করোনা ভাইরাস বাংলাদেশের ছড়িয়ে পড়েছিল তা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়েছি। এই গবেষণাটিতে মহামারী প্রতিরোধে জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কার্যকারিতা দেখানো হয়েছে যা ভবিষ্যতে অন্যান্য মহামারীর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।

হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর অধ্যাপক ক্যারোলিন বাকি বলেন, মোবিলিটি ডাটা, প্রথাগত চলমান সার্ভেলেন্স সিস্টেমের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এই গবেষণায় দেখানো হয়েছে, এধরনের একটি মিলিত বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা মূল্যবান ভূমিকা রাখতে পারে, যা অন্য কোনো উপায়ে অর্জন করা কঠিন। এই ধরণের গবেষণা শুধুমাত্র চলমান করোনাভাইরাস মহামারীর ক্ষেত্রেই নয়, ভবিষ্যতের যেকোনো মহামারী প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

আইসিডিডিআর,বি-র জেষ্ঠ্য বিজ্ঞানী এবং এই গবেষণাদলের নেতাদের একজন ড.ফেরদৌসী কাদরী বলেন, পুরো পৃথিবী জুড়েই বিভিন্ন দেশে কয়েক মাস পর মিউটেশনের মাধ্যমে নতুন ভেরিয়েন্ট তৈরি হচ্ছে এবং এর মধ্যে কিছু ভেরিয়েন্ট ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার চেষ্টা করছে দেশের সব মানুষকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার। এই টিকাগুলোর কার্যকারিতা বোঝার জন্য আমাদেরকে এধরনের কাজ অব্যাহত রেখে সরকারকে সময়মতো সঠিক তথ্য দিয়ে প্রযয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে হবে।

এই গবেষণায় ফেসবুক ডেটা ফর গুড, গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি আজিয়াটা লিমিটেড জনসংখ্যা মোবিলিটি তথ্য সরবরাহ করেছে। বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সার্স-কোভ -২ নমুনার সিকোয়েন্সিংয়ে সহায়তা করেছে।

শীর্ষনিউজ/এসএফ