শনিবার, ১৭-এপ্রিল ২০২১, ১২:১৮ পূর্বাহ্ন

গণতন্ত্রের ঘোমটা’ ছেড়ে কোন পথে মিয়ানমার!

shershanews24.com

প্রকাশ : ০১ মার্চ, ২০২১ ১০:২৬ পূর্বাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: গত ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর প্রায় এক মাস হতে চলল সেখান থেকে যেসব খবরাখবর আসছে তাতে করে দেশটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তবে মিয়ানমার যে এখনো আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে আছে, তার বড় প্রমাণ ২২ ফেব্রুয়ারির বিবিসি ইংরেজির প্রধান সংবাদ ছিল মিয়ানমারকে নিয়ে। সেখানে সামরিক জান্তাবিরোধী বিক্ষোভ শক্তিশালী হচ্ছে এবং তা ছড়িয়ে যাচ্ছে বড় শহরগুলোতে। ইতিমধ্যে বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন দুজন- এর মাঝে একজন ছিলেন  মায়া তাহবেহ খাইং। মায়া এখন মিয়ানমারে ‘প্রতিবাদের প্রতীকে’ পরিণত হয়েছেন। তিনি সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতিবাদ করে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালালে মায়া নিহত হন। গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানী নেপিদোতে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যে লোক জমায়েত হয়েছে, তা স্মরণকালের একটি বড় ঘটনা। এ ধরনের সহিংস ঘটনায়ইউরোপীয় ইউনিয়ন তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। মিয়ানমারে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা এ ঘটনায় ‘গভীরভাবে বিক্ষুব্ধ’। এর আগে জাতিসংঘ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি করেছিলেন। মিয়ানমারের শীর্ষ জেনারেলদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল অনেক আগেই। কিন্তু যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী জনমত যেভাবে শক্তিশালী হচ্ছে তা কি দ্বিতীয় আরেকটি জাফরান বিপ্লব বা স্যাফরন রেভ্যুলেশন (২০০৭)-এর জন্ম দেবে? সেই সঙ্গে এ প্রশ্নটিও কোনো কোনো মহল থেকে উচ্চারিত হয়েছে- তা হচ্ছে এই গণবিক্ষোভ কি ১৯৮৭-৮৮ সালের মতো পরিস্থিতির জন্ম দেবে? পার্শ্ববর্তী ভারত ও চীনের ভূমিকাই বা কী হবে এখন? 
কোন পথে মিয়ানমার!
মিডিয়াপাড়ায় হা-হুতাশ চলছে মিয়ানমারের গণতন্ত্র ‘গেল গেল’ বলে। এই বাস্তবতায় আমরা খতিয়ে দেখতে চাই, সেখানে গণতন্ত্র আদৌ ছিল কি? অং সান সু চিকে সামনে রেখে যে বেসামরিক নেতৃত্ব প্রদর্শিত হচ্ছিল গত এক দশক ধরে, তা মূলত সামরিক বাহিনীর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন গণতন্ত্রেরই একটি ছায়া। দশ বছর এমন একটি ‘গণতন্ত্রের প্রদর্শনী’ করে আসল রূপে ফিরে গেল মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনেই দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সামরিক বাহিনী। মিয়ানমারের ‘গণতন্ত্রের প্রতীক’ খ্যাত নেত্রী অং সান সু চি, প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টসহ তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির প্রায় সব শীর্ষ নেতাকে আটক করে এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। ফলে দেশের সকল নির্বাহী ক্ষমতা সামরিক বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ অং লাইয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।এটা নতুন কিছু না, মিয়ানমারের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের মধ্যকার টানাপড়েন বহু পুরনো ব্যাপার। দেশটি ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে বিগত ৭১ বছরের মধ্যে প্রায় ৪৯ বছর সরাসরি সামরিক শাসনের অধীনে ছিল। তা ছাড়া স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৬২ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নেওয়ার আগ পর্যন্ত সময়কালে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন কমিউনিস্ট গ্রুপের সঙ্গে গৃহযুদ্ধ চলেছে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিগ্রহের ফলে দেশটিতে শুরু থেকেই প্রভাবশালী অবস্থানে ছিল সামরিক বাহিনী। ফলে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকতে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী এতটাই অভ্যস্ত হয়েছে যে, তাদের অনায়াশে ‘পাওয়ার হ্যাপি’ বাহিনী বলা যায়।  অনেকেই বলে থাকেন, ২০০৮ সালের গণভোট এবং ২০১০ সালের নির্বাচন পরবর্তীকাল থেকে এনএলডির বিজয়ী হওয়ার মাধ্যমে হয়তো গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হচ্ছিল মিয়ানমার। বলা হয়, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী গত ১০ বছর ধরেই বেসামরিক সরকারের হাতে ক্রমেই ক্ষমতা ছেড়ে দিচ্ছিল; কিন্তু এই সময়ের নানা ঘটনা প্রমাণ করে যে, আসলে দেশের সকল ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতেই ছিল। ২০০৮ সালে যে সংবিধান পাস করা হয়, সেখানে দেশটির আইনসভার ২৫ শতাংশ আসন এবং প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তসংক্রান্ত মন্ত্রণালয় সামরিক বাহিনীর হাতে রাখা হয়। ওই সংবিধান অনুযায়ী কোনো দল সংবিধান পরিবর্তন করতে চাইলে তাদের ৭৫ শতাংশ আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হবে। অর্থাৎ সামরিক বাহিনীর ২৫ শতাংশ বাদ দিলে বেসামরিক সব আসনের নিয়ন্ত্রণ না পেলে কোনো দলের পক্ষে সংবিধান পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এর মানে হচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গত ১০ বছরে গণতন্ত্রের নামে দেশটিতে রাজনীতির কোনো মৌলিক উন্নয়নের সুযোগ দেয়নি। অন্যদিকে, মিয়ানমারে কথিত এই গণতন্ত্রের সময়কালেই বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সংকটের সৃষ্টি করা হয়েছে। রাখাইন প্রদেশের এক মিলিয়ন মানুষকে গণহত্যা ও গৃহছাড়া করে একুশ শতকের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরের মানবেতর জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয় বিনাশের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তাকে সংকটাপন্ন করেছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রমাণ জাতিসংঘসহ সব মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে রয়েছে। মিয়ানমারের কথিত ‘গণতন্ত্রের প্রতীক’ আর ‘ক্ষমতাহীনকে ক্ষমতাসীন করার আপসহীন’ নেত্রী অং সান সু চিও এই ভয়াবহতম মানবাধিকার লঙ্ঘনের অংশীদার হয়েছেন নিরবে। আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জেনারেলরা কথিত ‘গণতান্ত্রিক’ ব্যবস্থায়ই পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পেয়ে আসছেন। এসবই প্রমাণ করে যে, মিয়ানমার আসলে গত এক দশকে গণতন্ত্রায়নের পথে মোটেও এগোয়নি। 
লক্ষণীয় বিষয় হলো- যদি ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের দিকে দেশকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করার মতো বোধোদয় সামরিক বাহিনীর মধ্যে হতোই, তাহলে সে জন্য ১০ বছর কম সময় নয়। বাস্তবে দেখা গেছে, এ সময়েই উল্টো পথে হেঁটেছে সেনাবাহিনী। এটি আরও বোধগম্য হবে যদি আমরা খেয়াল করি, ক্ষমতা দখলের আগের কয়েক দিনের গতিপ্রকৃতি। 
সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, গত নভেম্বরের নির্বাচনে সামরিক বাহিনী ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএডিপি) নামের একটি দলকে সমর্থন দেয়; কিন্তু ভোটে অং সান সু চির দল এনএলডি ৮০ শতাংশেরও বেশি ভোট পায়। ভোটের পর পরই জালিয়াতির অভিযোগ তোলে সামরিক বাহিনী। এই অভিযোগকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপ-পরিচালক ফিল রবার্টসনের ভাষায় গণমাধ্যম বলছে, ‘ট্রাম্পসুলভ- প্রমাণ বিহীন অভিযোগ’। লক্ষণীয়, নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলছে সামরিক বাহিনী। এরমধ্য দিয়েই পরিষ্কার হয়, দেশটিতে সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক তৎপরতা কতটা খোলামেলা। বিশ্লেষকরা বলছেন, সমর্থন দেওয়া দল নির্বাচনে না জেতায় সামরিক বাহিনীর জন্য ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একারণেই প্রেস্টিজ ইসু তেই অভ্যুত্থানের মতো ঘটনা ঘটিয়েছেন। যেমনটি বিবিসিকে মিন থান্ট নামে এক বিশ্লেষক বলছিলেন, আন্তর্জাতিক মিডিয়া অং সান সু চিকে দেশের ‘মা’ হিসেবে দেখায়। অন্যদিকে সামরিক বাহিনী মনে করে তারাই এ দেশের ‘পিতা’। এই অভ্যুত্থানের পেছনের কারণ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ এরই মধ্যে হয়েছে। এই প্রসঙ্গে আরও একটি প্রসঙ্গ সামনে রাখা প্রয়োজন। ভারত মহাসাগরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে বৈশ্বিক মেরুকরণ চলছে, সেখানে স্পষ্টতই মিয়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর সেখানে এক দশক আগের চেয়ে বর্তমানে চীনের অবস্থান যথেষ্ট অগ্রসর মনে হয়, যা ট্রাম্প-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ। এটি বাইডেন প্রশাসনের বাড়তি মনোযোগের বিষয়ও বটে। এই বাস্তবতায় পশ্চিমাদের কাছে অপেক্ষাকৃত আস্থাভাজন অং সান সু চির চেয়ে চীনের জন্য সরাসরি সামরিক জেনারেলদের ওপর নির্ভর করা সুবিধাজনক হওয়া অসম্ভব নয়। সেদিক থেকে দেখলে মিয়ানমারের এই ‘গণতন্ত্রের ঘোমটা’ নামিয়ে ফেলাকে বৈশ্বিক মেরুকরণে আরও বেশি চীনমুখী হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।  বলা বাহুল্য, একটি দেশের সামরিক বাহিনী যদি আইনসভার চারআনি দখলে রাখে, নির্বাচনে প্রকাশ্যে একটি রাজনৈতিক দলকে অন্যদলের বিপরীতে সমর্থন দেয়, তাহলে তেমন একটি বাহিনীর উপস্থিতিতে কোনো দেশ ‘গণতন্ত্রের’ পথে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব। গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের শাসন; সহজ-সরল, সাধারণের শাসন। রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্র বা ‘ডিপ স্টেট’ চালায় যারা, তারা গভীর জলের মানুষ। তারা যখন কোনো দেশে সম্প্রসারিত হয়, তখন গণতন্ত্র মারা যায়। 
সু চি আর সেনাবাহিনীর মধ্যে পার্থক্য কী
মিয়ানমারে ‘গণতান্ত্রিক’ একটি সরকারকে সরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে অনেকেই এখন এ নিয়ে হাপিত্যেশ করতে শুরু করেছেন। অভ্যুত্থানে মিয়ানমারে সেনা শাসন কায়েম হয়েছে ঠিকই কিন্তু গণতন্ত্র গেল বলে যাঁরা হা-হুতাশ করছেন, তাঁরা কি একবারও ভেবে দেখেছেন অং সান সু চির সরকার ঠিক কতটা গণতান্ত্রিক ছিল? একজন ‘গণতান্ত্রিক’ সরকারে অনেক দায়িত্ব থাকে। সু চি সরকার কি সেটা করতে পেরেছেন। বরং করেছেন তার ঠিক উল্টোটা।সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর যখন সামরিক বাহিনী ধর্ষণ-নিপীড়ন চালায় তখন চুপ ছিল তিনি। তিনি যেভাবে পেরেছেন সেভাবেই অসহায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন। এমন কি বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ে অবমাননাকর উক্তি করতেও তিনি পিছপা হননি, হত্যা-ধর্ষণের পক্ষে সাফাই গাওয়া থেকেও বিরত থাকেননি। আর এর মধ্য দিয়ে সংখ্যাগুরু বর্মিদের হাততালি তিনি পেয়েছেন। সারা বিশ্ব যখন তার সেই অবস্থানকে ধিক্কার দিয়েছে, সে অবস্থায়ও হেগে নিজেদের সেই ঘৃণিত কর্মকা-ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। ফলে কারও পক্ষেই তাকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা সম্ভব হয়নি। সারা বিশ্বের মানুষের যত ভালোবাসা আগে তিনি পেয়েছিলেন, এক লহমায় তার সবটাই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানে চিন্তিত নয় দিল্লি
মিয়ানমারে ক্ষমতার পালাবদল হলেও সে দেশে রাখাইন প্রদেশের মধ্যে দিয়ে ভারতের অর্থায়নে যে কালাদান মাল্টিমোডাল প্রকল্পের কাজ চলছে, তা কোনওভাবেই ব্যাহত হবে না বলে দিল্লি স্পষ্ট করে দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর জানিয়েছেন কালাদান প্রকল্পে এখন শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে এবং মিয়ানমারে যাই ঘটুক না কেন এবং যেই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে তার কোনও প্রভাব পড়বে না বলেই ভারতের বিশ্বাস। দিল্লিতে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করতে ভারতের যে কোনও অস্বস্তি নেই এটা তারই প্রমাণ। পাশাপাশি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমুদ্র-সংযোগের জন্য বাংলাদেশ রুট ছাড়াও যে অন্য বিকল্প আছে, কালাদান প্রকল্প দ্রুত শেষ করে দিল্লি সেই বার্তাও দিতে চায় বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। প্রসঙ্গত, মিয়ানমারে এমাসের গোড়ায় সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ভারত কিন্তু একবারের জন্যও ‘ক্যু’ বা অভ্যুত্থান শব্দটা ব্যবহার করেনি।
নিষেধাজ্ঞায় কি দমবে মিয়ানমারের জান্তা
মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র শাসিয়ে দিয়েছিল। দেশটিতে গণতন্ত্র পুনর্বহাল না করলে, রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তি না দিলে সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সরাসরি হুমকি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। মাস পেরিয়ে গেলেও দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সেই হুমকি গায়ে লাগাচ্ছে না মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। উল্টো তারা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শক্তিপ্রয়োগের নীতি বেছে নেয়। গণতন্ত্রের দাবিতে বিক্ষোভরত ব্যক্তিদের ওপর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সরাসরি গুলি চালানো হয়। গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনে রাজনীতিক-বিক্ষোভকারীদের বাড়িতে বাড়িতে হানা দিচ্ছে দেশটির সামরিক জান্তা। চলছে গ্রেফতার। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার এমন বেপরোয়া আচরণের প্রেক্ষাপটে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার হুমকিকে কাজে রূপ দেন। তিনি প্রথম দফার নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। ময়ানমারের ১০ জন বর্তমান-সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার নিশানা করা হয়েছে। মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের জন্য এই ১০ কর্মকর্তা দায়ী বলে গণ্য করছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের মধ্যে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং আছেন। ১০ কর্মকর্তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যরাও নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে পারেন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রিত তিনটি কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মিয়ানমারের ১০০ কোটি ডলারের সরকারি তহবিল দেশটির সেনাবাহিনী যাতে ব্যবহার করতে না পারে, সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়ে দিয়েছে ওয়াশিংটন। তা ছাড়া কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণবিধিও আরোপ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে মিয়ানমারের সেনাশাসকদের বিরুদ্ধে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাইডেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক অংশীদার ও মিত্রদের যুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করা হবে বলে উল্লেখ করেছেন বাইডেন। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, এসব নিষেধাজ্ঞায় মিয়ানমারের জান্তারা কি দমে যাবে? তারা কি শিগগিরই ক্ষমতা ছেড়ে গণতন্ত্র পুনর্বহাল করবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একটু অতীতে যেতে হবে। 
ইতিহাস বলে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার জন্য নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয়। সামরিক শাসন, রাজনৈতিক নেতাদের বন্দী কিংবা রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের মতো অপকর্মের জন্য তারা আগেও একাধিকবার নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংসহ চারজন সামরিক কমান্ডারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। নিষেধাজ্ঞায় থাকা মিয়ানমারের সেই সেনাপ্রধানই ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে দেশটির ক্ষমতা দখল করেন। নির্বাচিত সরকারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি, প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টসহ শীর্ষ নেতাদের বন্দী করে এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে সামরিক জান্তা জানান দিচ্ছে, তারা এবারও সহজে যাচ্ছে না। কারণ মিয়ানমারের জেনারেলরা আগেই প্রমাণ করেছেন, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তারা টিকে থাকতে পারেন।
অতীতে যে উদ্দেশ্য নিয়ে মিয়ানমারের জেনারেলদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তারপর দেখা গেছে অনেকাংশেই তারা অধরা থাকতে সক্ষম হয়েছেন। তাই অতীতের ধারাবাহিকতায় এবারও মিয়ানমারের জেনারেলদের ওপর নিষেধাজ্ঞা অর্থহীন হবে বলেই মনে হচ্ছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের ওপর ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে তাতে দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষের চেয়ে বরং সাধারণ জনগণই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আগে তেমনটাই দেখা গেছে। তাছাড়া মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞার আরও একটা নেতিবাচক দিকও আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিষেধাজ্ঞার মুখে দেশটি আরও চীনমুখী হতে পারে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে  ১ মার্চ ২০২১ প্রকাশিত)