বুধবার, ১৬-জুন ২০২১, ০৪:৫৫ অপরাহ্ন
  • আন্তর্জাতিক
  • »
  • গাজায় কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেয়ার বর্ণনা দিলেন এপি সাংবাদিক

গাজায় কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেয়ার বর্ণনা দিলেন এপি সাংবাদিক

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৬ মে, ২০২১ ১১:৩৯ অপরাহ্ন

শীর্ষনিউজ ডেস্ক : গত শনিবার ইসরাইলি বাহিনী গাজায় এসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও আল-জাজিরার কার্যালয় যে ভবনে ছিল সেটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। দেশটি জানিয়েছে, ওই ভবনে ঘাঁটি গড়ে হামাস সদস্যরা তৎপরতা চালিয়ে আসছিল। হামলার সময় সেখানে এপি'র ১২ কর্মী ও ফ্রিল্যান্সার ভবনে ছিলেন। ওই ভবনে থাকা সবাইকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য এক ঘন্টা সময় দেয় ইসরাইল। 

এপির সাংবাদিক ফারেজ আকরাম সেদিনকার এই বর্ননা দিয়েছেন- আমার সহকর্মীরা আমাকে ডেকে তুললেন। আতঙ্ক নিয়ে আমি ভাবতে থাকলাম, কী এমন হয়েছে? কেউ কি গাজার রাস্তায় আহত হয়েছে? নাকি আরো খারাপ কিছু! তখন বাজে দুপুর ১ টা ৫৫। ২০০৬ সাল থেকে গাজায় এপির যে কার্যালয় রয়েছে সেখানে আমি ঘুমাচ্ছিলাম। সংঘাত শুরু হওয়ার পর আমাকে দিনে এখানে ঘুমাতে হতো আর রাতভর কাজ করতে হতো।

আমি নিচে নামতেই আমার সহকর্মীরা সবাই হেলমেট ও ভেস্ট পরছে। তারা সবাইকে ভবন ছেড়ে বেড়িয়ে যাওয়ার কথা বলে চিৎকার করছিল। আমি পরে জানলাম যে, ইসরাইলি সেনারা এই ভবনটিকে ধ্বংস করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং আমাদেরকে এক ঘন্টা সময় দিয়েছে ভবন থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য।এ সপ্তাহে তারা আরো তিনটি ভবন গুঁড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিবারই তারা হামলার আগে বাসিন্দাদের সতর্ক করছে এবং ভবন ছেড়ে বেড়িয়ে যাওয়ার আগে কিছু সময় দিচ্ছে। আমাকে যদিও বলা হয়েছিল, আমার হাতে ১০ মিনিট সময় আছে।

আমার যা যা দরকার ছিল আমি সব নিলাম। ল্যাপটপসহ যেসব ইলেক্ট্রনিক্স আমার প্রয়োজন ছিল। আমি যা সঙ্গে নিয়েছিলাম তারমধ্যে আছে, একটি কফি মগ যা আমার মেয়ে আমাকে উপহার দিয়েছিল। সে এখন তার মা ও বোনের সঙ্গে কানাডায় আছে। আর একটি সার্টিফিকেট যাতে এপির হয়ে ৫ বছর কাজ করার  প্রমাণ রয়েছে। আমি বেড়িয়ে যাওয়ার আগে চারদিকে একবার তাকিয়ে দেখলাম। এটি ছিল গত কয়েক বছর ধরে আমার আরেকটি বাসার মতো। আমি বুঝতে পারলাম, আমি শেষবারের মতো এটি দেখছি। ২ টার সময় আমি বেড়িয়ে আসলাম। আমিই ছিলাম সেখানে থাকা শেষ ব্যক্তি। আমি আমার হেলমেট পড়লাম এবং দৌড়ালাম।

গাজায় নিরাপদ বলে কোনো স্থান নেই
আমি এখন আমার বাড়িতে। কিন্তু এখানেও আমি নিরাপদ নই। কারণ গাজায় নিরাপদ কোনো স্থান নেই। গত শুক্রবার একটি বিমান হামলায় আমার পরিবারের একটি ফার্ম ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর গুঁড়িয়ে দেয়া হলো আমার কর্মস্থলও। আমার ধারণা ছিল এখানে এপি ও আল-জাজিরার কার্যালয় থাকায় এটি কখনো ইসরাইলের টার্গেট হবে না।
অনেক গাজাবাসীকেই খারাপ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। অন্তত ১৮০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ইসরাইলেও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আমি যখন এপির কার্যালয় থেকে বের হলাম, আবিষ্কার করলাম আমার গাড়িটি ছাড়া বাকিসব এরইমধ্যে ওই স্থান ছেড়েছে। আমি দ্রুত আমার সব গাড়ির পেছনে রেখে বেড়িয়ে এলাম।

নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে আমি দাড়ালাম। আমি দেখতে চাচ্ছিলাম ভবনটির সাথে কী হয়। আমার সহকর্মীরাও পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ভবনটির মালিক। তিনি ইসরাইলি এক কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। এসময় তিনি আরেকটু বেশি সময়ের জন্য অনুরোধ জানাতে থাকেন। কিন্তু এক ঘন্টার বেশি আর সময় দেয়া হয়নি। তাকে বলা হয়, আপনি বরং আবার ভবনে গিয়ে নিশ্চিত হোন সেখানে আর কেউ নেই। কিংবা থাকলে দ্রুত তাদের নিয়ে আসুন। আমি তখনো আশা করে ছিলাম, হয়তো ভবনটি ধ্বংস করা হবে না। আমি ভাবছিলাম সেসব পরিবারের কথা যারা ভবনটিতে বাস করতেন। তারা এখন কোথায় যাবে?

নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর ইসরাইল প্রথমে ড্রোন দিয়ে কিছু ছোট বিস্ফোরণ ঘটায়। এরপর এফ-১৬ বিমান দিয়ে শক্তিশালী হামলা চালিয়ে ভবনটি গুঁড়িয়ে দেয়। মুহুর্তেই ভবনটি ধুলায় পরিণত হয়। আমার পকেটে এখনো একটি রুমের চাবি রয়েছে যেই রুমটিই আর নেই।

ওই ঘটনায় একজনও আহত বা নিহত হননি। ঘটনা দ্রুত আগাতে থাকে। গাজায় যা ঘটছে তার আপডেট দিতে শুরু করি আমরা। সাংবাদিক হিসেবে আমাদের মনে রাখতে হয় যে, আমরা নিজেরা কোনো সংবাদ নই। আমাদেরকে অন্যদের প্রাধান্য দিতে হয়। আমি তাই আরো কিছুক্ষণ সেই ভবনের ধ্বংসস্তুপের দিকে তাকিয়ে থাকি এবং আমার কাজে ফিরে যাই।
শীর্ষনিউজ/এসএসআই