বুধবার, ২১-এপ্রিল ২০২১, ০১:৫২ পূর্বাহ্ন
  • অন্যান্য
  • »
  • অধ্যাপক মতিউর রহমানের ইন্তেকালে কালচারাল একাডেমির শোক

অধ্যাপক মতিউর রহমানের ইন্তেকালে কালচারাল একাডেমির শোক

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল, ২০২১ ০৭:৫৯ অপরাহ্ন

শীর্ষনিউজ, ঢাকা : অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান আজ ৪ এপ্রিল বেলা সোয়া ১২টায় সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তঁরা ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ সাহিত্য একাডেমির চেয়ারম্যান শরীফ বায়জীদ মাহমুদ ও সেক্রেটারি ইবরাহীম বাহারী। শোকবাণীতে তারা বলেন, আমরা মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। মহান রব যেন তাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করেন এবং তার শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদেরকে সবরে জামিল দান করেন।

প্রসঙ্গত, মুহম্মদ মতিউর রহমান ১৯৩৭ সনের ১৮ ডিসেম্বর (বাংলা ১৩৪৪, ৩ পৌষ ) সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানার চরনরিনা গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আবু মুহাম্মদ গোলাম রববানী, মাতার নাম মোসাম্মৎ আসুদা খাতুন। মুহম্মদ মতিউর রহমানের পূর্ব পুরুষ এলাকায় শিক্ষাদানের ব্যাপারে সুখ্যাতি অর্জন করেন। সে সুবাদে তাদের বাড়িটি ‘পন্ডিত বাড়ি’ হিসাবে পরিচিত। মতিউর রহমান পিতা-মাতার তিন পুত্র ও নয় কন্যার মধ্যে ষষ্ঠ সন্তান। তার স্ত্রীর নাম বেগম খালেদা রহমান। তাদের দুই পুত্র ও দুই কন্যা রয়েছে।

মতিউর রহমান গ্রামের স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ১৯৫০ সনে নরিনা মধ্য ইংরাজি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। সেখানে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে ১৯৫৪ সনে স্থানীয় পোতাজিয়া হাইস্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে ১৯৫৬ সনে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মতিউর রহমান ১৯৫৬ সনে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে ১৯৫৮ সনে আই. এ ও ১৯৬০ সনে বি.এ পাশ করেন। এরপর ১৯৬০ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে ১৯৬২ সনে বাংলায় এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন।

১৯৬২ সনের নভেম্বরে মতিউর রহমান ঢাকা সিদ্ধেশ্বরী নৈশ কলেজে অধ্যাপনার কাজে নিয়োজিত হন। এখানে ১৯৭৭ সন পর্যন্ত যথাক্রমে অধ্যাপক, ভাইস-প্রিন্সিপাল এবং ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। মাঝখানে তিনি ১৯৬৫ সনে চার মাসের জন্য করটিয়া সা'দত কলেজে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। সিদ্ধেশ্বরী কলেজে থাকাকালীন সময়ে ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত প্রায় ৭ বছর ঢাকাস্থ আমেরিকান প্রকাশনা সংস্থা ‘ফ্রাংকলিন বুক্স প্রোগ্রামস’ এ সহকারী সম্পাদক ও প্রথম বাংলা বিশ্বকোষ প্রকল্পে অন্যতম সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৭০ সনের জানুয়ারিতে দৈনিক সংগ্রাম প্রকাশিত হলে মতিউর রহমান সেখানে সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে যোগ দেন। ১৯৭৭ সনের ১২ ফেব্রুয়ারিমতিউর রহমান সংযুক্ত আরব-আমিরাতে চলে যান এবং সেখানে ১৯৯৬ সনের ডিসেম্বর পর্যন্ত দুবাই চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রকাশনা বিভাগে সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পাশাপাশি সমাজ, শিক্ষা, সাহিত্য ও  সংস্কৃতি বিষয়ে লেখালেখি ও সাংগঠনিক কাজে বিশেষভাবে আত্মনিয়োগ করেন। এ সময় মতিউর রহমান একনিষ্ঠভাবে চিন্তা-চেতনায় ও কর্মে স্বদেশ, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের ভাবনাগুলি সংহত করে প্রকাশ করার বিশেষ উদ্যোগ নেন।

মতিউর রহমান ১৯৯৭ সনের জানুয়ারিতে দেশে ফিরে ঢাকাস্থ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এ ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত বাংলা বিভাগে প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান হিসাবে কর্মরত থেকে তাঁর চিন্তা ও কর্মের সমন্বিত রূপ প্রকাশে সচেষ্ট হন। মতিউর রহমান মূলত একজন সাহিত্যিক। দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত থেকেও তার সাহিত্য-কর্ম সর্বদা অব্যাহত থেকেছে। তিনি মৃত্যু পর্যন্ত সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে নিরলসভাবে গবেষণা ও লেখালেখি করেছেন। 

তাঁর লেখা প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে- সাহিত্য কথা (১৯৭০), ভাষা ও সাহিত্য (১৯৭০), সমাজ-সাহিত্য সংস্কৃতি (১৯৭১), মহৎ যাদের জীবন কথা (১৯৮৯), ইবাদতের মূলভিত্তি ও তার তাৎপর্য (১৯৯০), ফররুখ প্রতিভা (১৯৯১), বাংলা সাহিত্যের ধারা (১৯৯১), বাংলা ভাষা ও ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন (১৯৯২), আযান সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য প্রসঙ্গে (১৯৯২), ইবাদত (১৯৯৩) মহানবী (সা.) (১৯৯৪), ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি (১৯৯৫), মহানবীর (স) আদর্শ সমাজ (১৯৯৭), ছোটদের গল্প (১৯৯৭), Freedom of Writer (১৯৯৭), বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য (২০০২), মানবাধিকার ও ইসলাম (২০০২), ইসলামে নারীর মর্যাদা (২০০৪), রবীন্দ্রনাথ (২০০৪), স্মৃতির সৈকতে (২০০৪), মানবতার সর্বোত্তম আদর্শ মহানবী (সা.) (২০০৫), মাতা-পিতা ও সন্তানের হক (২০০৬), ফররুখ প্রতিভা (পরিবর্তিত দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০০৮), ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার (২০০৮), সংস্কৃতি (২০০৮), বাংলাদেশের সাহিত্য (২০০৮), সাহিত্য চিন্তা (২০১০), জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (২০১০), হাজার বছরের বাংলা কবিতা (২০১০), ইউরোপ আমেরিকার পথে জনপদে (২০১০), কিশোর গল্প (২০১০)। সমকালীন বাংলা সাহিত্য, আরব উপসাগরের তীরে, বাঙালি মুসলমানের নবজাগরণে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভূমিকা, নানা প্রসঙ্গ, মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্য-রত্ন, আশির দশকের কবি ও কবিতা ইত্যাদি।

অনুবাদ : ইরান (১৯৬৯), ইরাক (১৯৬৯), আমার সাক্ষ্য (১৯৭১)।

সম্পাদনা : পাবনা থেকে প্রকাশিত ‘আমাদের দেশ’ মাসিক পত্রিকা (১৯৫৮-৬০)।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফজলুল হক মুসলিম হল বার্ষিকী’ (১৯৬১-৬২)। ‘Trade & Industry Magazine, Dubai (১৯৭৮-৯৬), ‘প্রবাসী কবিকণ্ঠ’ (১৯৯৩), ‘প্রবাসকণ্ঠ’ (১৯৯৪), স্বদেশ সংস্কৃতি (১৯৯৮) ফররুখ একাডেমী পত্রিকা (১৯৯৮-), ভাষা সৈনিক সংবর্ধনা স্মারক (২০০০), ব্যারিস্টার কোরবান আলী স্মারক পত্রিকা (২০০৭)।

সংস্কৃতি-শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য মুহম্মদ মতিউর রহমানকে ১৯৯৬ সনে ‘বাংলাদেশ ইসলামিক ইংলিশ স্কুল’ দুবাই-এর পক্ষ থেকে  স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। ১৯৯৭ সনে মতিউর রহমান ফররুখ একাডেমী (২০০৬ সনে রেজিস্ট্রিকৃত নাম: ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত উক্ত প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও ‘ফররুখ একাডেমী পত্রিকা'র সম্পাদক এর দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশ কালকারাল একাডেমি’র  প্রচার সম্পাদক হারুন ইবনে শাহাদাত স্বাক্ষরিত এক বার্তায় এসব তথ্য জানানো হয়। 
শীর্ষনিউজ/বিবৃতি/এসএসআই