shershanews24.com
ভারতে নতুন স্ট্রেইনের বিস্তৃতি: আমরাও কি সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছি?
মঙ্গলবার, ২৭ এপ্রিল ২০২১ ০৮:০০ অপরাহ্ন
shershanews24.com

shershanews24.com

মোঃ মামুন হাসান বিদ্যুৎ: বিশ্বজুড়ে ৩১ লাখের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া করোনাভাইরাস মহামারির সর্বশেষ ‘হটস্পট’ হয়ে উঠেছে প্রায় ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারত। হাসপাতালে শয্যার সংকট, অক্সিজেন সংকটসহ নানা সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। আইসিইউর শয্যা পাওয়া তো রীতিমতো স্বর্গ হাতে পাওয়ার মতোই। রোগীকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন স্বজনরা। মানুষ অসহায়ের মতো মারা যাচ্ছে। অনেকের হাসপাতালে জায়গা হয়নি তারা রাস্তায় পড়ে পড়ে মরছে। জ্বালানো হচ্ছে গণচিতা। জায়গা মিলছে না হাসপাতালের মর্গে। 

বিজ্ঞানীরা দেশটিতে সংক্রমণের এমন তীব্রতার জন্য দায়ী করছেন ডাবল ও ট্রিপল মিউট্যান্ট করোনাভাইরাসকে। ভারতের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারন করা শুরু হয় এপ্রিলের একেবারে শুরু থেকেই। প্রতিদিন আক্রান্তের হার সেখানে বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করে লাখ ছাড়িয়েছে বহু আগেই। 

২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনে প্রথম কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এরপরে এক বছরের বেশি সময়ে বিশ্বে ১৪ কোটি ৭২ লাখের বেশি মানুষ এতে আক্রান্ত হয়েছেন। আর প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ লাখের বেশি। ভারতে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো তিন লাখের বেশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। করোনায় এক মাসের মধ্যে মৃতের সংখ্যায় বিশ্বে এখন দ্বিতীয় ভারত। 

করোনা ভাইরাস মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিপর্যস্ত ভারতের পরিস্থিতি দেখে বাকি বিশ্বকে শিক্ষা নিতে আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান ডা. টেড্রোস অ্যাডহানম গেব্রিয়েসুস।

বাংলাদেশের তিনদিকে রয়েছে  ভারতের সীমানা। উদ্বেগের বিষয় হলো, ভারতের ডাবল ও ট্রিপল মিউট্যান্ট করোনাভাইরাস  বাংলাদেশে প্রবেশ করলে এ দেশেও করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

ভারতে করোনা প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় ভারতের সঙ্গে সব স্থলসীমান্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। গত রোববার (২৫ এপ্রিল) এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও সময়োপযোগী  বলেই মনে করছি। 

প্রতিবেশী দুইদেশের মধ্যে আকাশপথে যোগাযোগ আগে থেকেই বন্ধ রয়েছে। এখন স্থলসীমান্ত বন্ধ করার সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে কার্যকর করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষগুলোকে বিশেষভাবে তৎপর হতে হবে। কঠোরভাবে সীমান্তে বিধিনিষেধ প্রতিপালন করতে হবে। সেখান থেকে আসা রোগীদের পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে আলাদা করে। পাশাপাশি পণ্যবাহী যানবাহনগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঢুকতে দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ড্রাইভার ও হেলপারদের করোনা প্রটোকল মেনে চলতে হবে। বিকল্প পথে অনুপ্রবেশও রোধ করতে হবে।  সীমান্ত বন্ধের পাশাপাশি আমাদেরকে যেকোন কঠিন পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রতিবেশি ভারত থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে।

এখন থেকে কভিডের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার চিন্তা শুরু করতে হবে। আমাদের আইসিইউ শয্যার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। অক্সিজেন আমদানির বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। স্বাস্থ্য সামগ্রীর পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশে  যে আইন রয়েছে, তার যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকার ঘোষিত ‘সর্বাত্মক লকডাউন’  কার্যকারিতা নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। সামাজিক দূরত্ব মানতে ও মাস্ক পড়তে  বাধ্য করার পাশাপাশি জনগণের সচেতন করে তুলতে হবে। দেশে এখনও এক-পঞ্চমাংশ (২১ শতাংশ) মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সাহায্য-সহযোগিতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুহারের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা কঠিনতর হবে।

ভারতের মতো বাংলাদেশেও অ্যান্টিজেন টেস্ট করার সংখ্যা অনেক বাড়ানো উচিত। পাশাপাশি ঈদের সময় আবারও সব ধরনের জনসমাগম সম্পূর্ণ নিষেধ করে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে।কেউ বিধিনিষেধ অমান্য করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ভারতের অবস্থা দেখে বাংলাদেশের মানুষ চিন্তিত, কিছুটা ভীতও বলা চলে। এই অবস্হায় সরকারের সঠিক অবস্হান,  প্রস্তুতি ও সম্ভাব্য পদক্ষেপ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জনগনকে অবহিত করতে হবে। জন প্রতিনিধিদের জণগণের দোরগোড়ায় গিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও আশস্ত এবং সরকারি প্রণোদনা সুষম বন্টন নিশ্চিত করতে হবে। যেন কেউ করোনাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন ও গুজব ছড়াতে না পারে সেদিকে সুদৃষ্টি দিতে হবে।

প্রতিবেশী দেশের উচ্চ সংক্রমণের সূত্র ধরে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কোনও সময়ে বাংলাদেশে শুরু হয়ে যেতে পারে করোনার তৃতীয় ঢেউ। পরিকল্পনাহীনতা, অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা আর দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে সামনে ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য।

লেখক: মোঃ মামুন হাসান বিদ্যুৎ, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।