সোমবার, ১২-এপ্রিল ২০২১, ০৯:৪৮ অপরাহ্ন
  • জাতীয়
  • »
  • কারাবন্দি অবস্থায় লেখক মুশতাক নিজের নিরাপত্তা নিয়ে যে আশঙ্কা করেছিলেন

কারাবন্দি অবস্থায় লেখক মুশতাক নিজের নিরাপত্তা নিয়ে যে আশঙ্কা করেছিলেন

shershanews24.com

প্রকাশ : ০২ মার্চ, ২০২১ ০৯:২৬ পূর্বাহ্ন

শীর্ষনিউজ, ঢাকা: লেখক মুশতাক আহমেদ কারাবন্দি অবস্থায় একের পর এক ঘটনায় উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন । এই উদ্বেগের কথা তার এক স্বজনকে তিনি জানিয়েও ছিলেন। নিজে কারাগারে যাওয়ার পর মুশতাক তার বৃদ্ধ বাবা-মা ও স্ত্রীর জন্য সব সময় উদ্বেগে থাকতেন। শেষতক তার উদ্বেগ বেড়েছিল কারাসঙ্গী কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে নিয়ে। কারাগার থেকে আদালতে আসার সময় চাচাতো ভাই ডা. নাফিস রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি এই উদ্বেগ প্রকাশ করে কিশোরের জন্য ওষুধ চেয়েছিলেন। কিশোরের শারীরিক নানা সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন মুশতাক। কারাসঙ্গীকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা মুশতাক নিজেই যে এভাবে চলে যাবেন- এটা ভাবতে পারছেন না তার স্বজনরা। লেখালেখি, ভ্রমণ, ছবি আঁকার মতো কিছু বিষয়ই বেশি টানতো মুশতাককে।
তাই উচ্চ শিক্ষা শেষ করেও চাকরি জীবনে বেশিদিন থিতু হতে পারেননি কোথাও। নিজের শখ আর নেশা থেকে লেখালেখি করতেন।

সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমের- এর সঙ্গে কথা হয় মুশতাকের চাচাতো ভাই ডা. নাফিস রহমানের। ডা. নাফিস বলেন, ছোটবেলা থেকেই মুশতাক ছিলেন খুবই হাস্য-রসাত্মক প্রকৃতির। সকলের সঙ্গে গল্প করতে পছন্দ করতেন। খুব সহজেই মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি করে ফেলতেন। লালমাটিয়ার বাসায় মুশতাকের একটি আলাদা ওয়ার্কিং রুম ছিল। সেখানে খুব সখ করে অনেক টাকা খরচ করে একটি অ্যাপলের কম্পিউটার এবং ক্যামেরা কিনেছিলেন। যেগুলো ছিল ওর সবচেয়ে প্রিয়। মুশতাক যেহেতু ক্যাডেট কলেজের ছাত্র তাই যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার মতো একটি চর্চা তার ছোটবেলা থেকেই ছিল। একা থাকায় সে আগে থেকেই অভ্যস্ত। যে কারণে জেলখানার কারাবন্দি দিনগুলো তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে পারেনি। তবে বয়স্ক বাবা-মা এবং স্ত্রী লিপাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিলই। লিপার মানসিক হাসপাতালে ভর্তির বিষয়টি তাকে আহত করে।

এছাড়া পরপর ৬ বার জামিন আবেদন বাতিল হওয়ার বিষয়টি তাকে মানসিকভাবে খুব আঘাত করে। সর্বশেষ শুনানি নিয়ে মুশতাকের খুব প্রত্যাশা ছিল এবার নিশ্চয় জামিন হবে। প্রতি সপ্তাহে জেলখানা থেকে একবার বয়স্কা বাবা-মা এবং স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেতেন তিনি। দ্বিতীয়বার লিপাকে হাসপাতালে ভর্তির কথা শুনে সবচেয়ে বেশি আঘাত পান। তিনি বলেন, আদালতে তোলা হলে আমি ওকে জড়িয়ে ধরি। তখন মুশতাক ছিলেন কাঠগড়ায় আর আমি বাইরে। ১০ মাস পর পরিবারের কোনো এক সদস্যের সঙ্গে দেখা হওয়ায় যেমনি খুশি হয়েছিলেন তেমনি জামিন না পাওয়ায় হতাশ হয়েছিলেন।

নাফিস বলেন, এ সময় তিনি আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন। জানতে চান ‘বাবু তুই কেমন আছিস’? মুশতাক জানান, কিশোরের (কার্টুনিস্ট) খুবই খারাপ অবস্থা। ওর কোনো চিকিৎসা হচ্ছে না। তার ওপর প্রচণ্ড নির্যাতন করা হয়েছে। চোখে ভালোভাবে দেখতে পায় না। পায়ে সমস্যা। কান দিয়ে পুঁজ পড়ে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই। ওর ওষুধ লাগবে। কিশোরকে নিয়ে মুশতাক বেশি উদ্বিগ্ন ছিল। জেলে সাধারণত পত্রিকা পড়ে, টিভি দেখে এবং বই পড়ে সময় কাটতো তার। এবার জামিন না হওয়ায় ও খুবই হতাশ হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, মুশতাকের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন তার পুরো পরিবার। লালমাটিয়ার বাসায় বাবা-মা এবং স্ত্রী লিপাকে নিয়ে তাদের চার সদস্যের পরিবার ছিল। মুশতাককে জেলে নিয়ে যাওয়ার পর অতিরিক্ত মানসিক চাপে প্রথম দফায় মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয় লিপাকে। দ্বিতীয় দফায় পুনরায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। মুশতাক মারা যাওয়ার পর হাসপাতাল থেকে লাশ দেখতে বাসায় আনা হয় লিপাকে। ডা. নাফিস বলেন, লিপা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। বান্ধবীর মাধ্যমে মুশতাকের সঙ্গে পরিচয় হয় লিপার। পরবর্তীতে পারিবারিকভাবে তারা বিয়ে করেন। এক যুগেরও বেশি সময়ের দাম্পত্য জীবনে তাদের কোনো সন্তান নেই। লিপা একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে ল্যাবরেটরিতে চাকরি করতেন। তিনি বলেন, মুশতাকের সখের জায়গা ছিল ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি করা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি করা। মুশতাকের লেখা ‘কুমির চাষির ডায়েরি’র ইংলিশ ভার্সনে লেখার কাজ শুরু করেছিল। চা বাগান নিয়ে একটি বইয়ের স্ক্রিপ্ট তৈরির কাজ হাতে নেয়। সেই সুবাদে ফেসবুকের মাধ্যমে কিশোরের সঙ্গে পরিচয়। তারা রাত-দিন একসঙ্গে কাজ করতেন।
আক্ষেপ করে ডা. নাফিস বলেন, মুশতাকের মৃত্যুর কারণ হার্টঅ্যাটাক। তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। এটা নিয়ে আমাদের সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু মানসিক টর্চার কোনোদিন ময়নাতদন্ত করে বের করা যায় না। বারবার তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করায় মানসিকভাবে প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়েন। এক্ষেত্রে আমাদের অনেকগুলো প্রশ্ন থেকেই যায়। কারাগারে ওইদিন সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে কথা বলতে বলতে পড়ে গেলে কারা হাসপাতালে নিলে তার প্রেসার পাওয়া যায় ৪০/২০। পরবর্তীতে শহীদ তাজউদ্দিন হাসপাতালে নিয়ে যায় ৮টা ২০ মিনিটে। আমরা ধরে নিবো ৭টা ৪০ থেকে ৮টা ২০ এই ৪০ মিনিটের কোনো একটি সময়ে অ্যাম্বুলেন্সেই মুশতাক মারা যান। এক্ষেত্রে আমরা কারাগারের হাসপাতালের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করবো।

মুশতাক আহমেদ এর ডাক নাম ছিল বাবু। পরিবারের সদস্যরা বাবু নামেই ডাকতেন। ১৯৬৭ সালের ৫ই ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গার দর্শনাতে তার জন্ম। বাবার চাকরিসূত্রে দর্শনাতে কেটেছে শৈশব। তিন ভাই বোনের মধ্যে মুশতাক দ্বিতীয়। দুই বোন ইশরাত আরা ও ফরহাদ আরা পেশায় অর্থনীতিবিদ।

মুশতাকের বাবা আব্দুর রাজ্জাক দর্শনার সুগার মিলের (কেরু অ্যান্ড কোম্পানি) কেরুজ চিনিকলে দীর্ঘদিন চাকরি করার পর চট্টগ্রামে চলে যান। এ সময় বাবার সঙ্গে মুশতাকও সেখানে চলে যান। মা জেবুন্নেসা রাজ্জাক ছিলেন শিক্ষিকা। মুশতাক আহমেদ ১৯৮০ সালে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হন। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি চার্টার্ড একাউন্টেন্ট (সিএ) কোর্সে ভর্তি হন। সিএ পড়াকালীন ১৯৮৯ সালে চাকরিজীবন শুরু করেন। টি টেস্টিং কোর্স শেষে সোনারুপা চা-বাগানের এসিস্ট্যান্ট-ম্যানেজার (এইচ-আর) হিসেবে যোগদান করেন। এরপর বৃত্তি নিয়ে তিন মাসের একটি ম্যানেজমেন্ট কোর্স করতে ইংল্যান্ডে যান। চা-বাগানের চাকরিটা ছেড়ে দেয়ার পর কক্সবাজারে চলে যান। তখন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসা শুরু করলে স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থায় চুক্তিভিক্তিক কাজে যোগ দেন। আড়াই বছর চাকরি শেষে ঢাকায় চলে আসেন। ততদিনে মুশতাকের বাবা-মাও ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৯৬ সালে সিদ্ধান্ত নেন উদ্যোক্তা হবেন। ছোট ছোট কিছু ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। একটি অ্যাড ফার্মের সঙ্গে যুক্ত হন এ সময়। কর্ডলেস ফোনের ব্যবসাও শুরু করেছিলেন। সুন্দরবনে ট্যুরগাইড হিসেবে কাজ করেছেন। ২০০৪ সালে গড়ে তোলেন কুমিরের খামার। দেশ থেকে প্রথমবারের মতো কুমির রপ্তানি তার হাত ধরেই শুরু হয়। ‘কুমির চাষের ডায়েরি’- নামে একটি বই আছে তার।